আমরা নতুন একটি বছরে প্রবেশ করলাম এবং সুস্পষ্টভাবে এটিও উপলব্ধি করতে পারছি যে কভিড-১৯ রাতারাতি গায়েব হয়ে যাচ্ছে না, যেমনটা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার করে বলেছেন, কভিড কিছুই না, এসব এমনিই চলে যাবে। যদিও সংক্রমণ শুরুর পর প্রাথমিকভাবে লকডাউন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো থমকে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে বর্তমানে খানিকটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে জিডিপি ও বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের ওপর যে পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, তা ১০০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো সবচেয়ে খারাপ মন্দা পরিস্থিতি তৈরির জন্য যথেষ্ট। এমনকি কার্যকর ভ্যাকসিন চলে আসার মতো ইতিবাচক পরিস্থিতিতেও এ-বিষয়ক উদ্বিগ্নতা কাটছে না।
তাছাড়া সম্পূর্ণভাবে আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনেকটা সময় লাগবে। তাই প্রশ্ন তৈরি হয় যে তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন হবে? এর উত্তর মূলত নির্ভর করছে বড় অর্থনীতির দেশগুলো কী ধরনের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে তার ওপর। এরই মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের যথেষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পারিবারিক ও ব্যবসায়িক ব্যালান্সশিট আগের মতো হতে সময় লাগবে। কারণ মহামারীর কারণে যে ব্যবসাগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে, ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু সেগুলো পুনরুদ্ধার হচ্ছে না।
তাই যথাযথভাবে প্রভাব মোকাবেলার ক্ষেত্রে সিকি পরিমাণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আজ ব্যয়বহুল চিকিৎসার চেয়ে মূল্যবান। স্বল্পমেয়াদে কী ঘটতে পারে, এ মুুহূর্তে তা উপলব্ধি করাটাও যথেষ্ট কঠিন।
চীন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮-এর সংকটের পর ২০১০ সালের মধ্যে বার্ষিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এবারের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। চীনের করোনা সংকট-পরবর্তী প্রবৃদ্ধির হার স্থবির। আর তাদের বাণিজ্যের বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আগের মতো এবার তারা আর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবে না। আরো খোলাসা করে বললে জিডিপির ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো ব্যাপক আর্থিক ঘাটতি মোকাবেলায় সক্ষম হলেও উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির সরকারেরা তাদের কাছাকাছি পর্যায়েও সহযোগিতা করতে সমর্থ হবে না।
তাছাড়া কভিড-পরবর্তী সময়ে তরঙ্গের প্রভাব ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ছাড়াও—বিশেষ করে ২০২০ সালের শেষে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের সংক্রমণ পরিস্থিতি—২০২১ সালের সামনে দুটি বড় প্রশ্ন হাজির করবে। বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি শুরু করবে? এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো কি একত্রিত হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবে?
২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচন কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান করেনি। প্রত্যাশার তুলনায় সিনেট ও হাউজে ডেমোক্র্যাটদের কম সমর্থন, কংগ্রেসে বড় অংকের প্রণোদনা প্যাকেজ বরাদ্দের জন্য বাইডেন প্রশাসনের হাতে প্রয়োজনীয় সমর্থন নাও থাকতে পারে। নির্বাচনের আগে বাজেট সম্পর্কে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তেমন কোনো ধারণাই রাখতেন না, সেই তিনি পর্যন্ত প্রণোদনা প্যাকেজের সম্ভাবনা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছিলেন রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ সদস্য মিচ ম্যাককনেলকে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে। তাই দ্বিপক্ষীয় কমিটিকে একত্র করতে বাইডেনের প্রচেষ্টা সফল হবে কিনা তাও দেখার বিষয়।
ট্রাম্প আমলে উচ্চবিত্ত, শিল্পপতি আর করপোরেশন সংস্থাগুলো বিপুল করছাড় পেয়েছে। এ অবস্থায় ডেমোক্র্যাটদের বড় রকমের অর্জনকে প্রতিহত করতে রিপাবলিকানরা পুনরায় আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধনকেই সমর্থন করবে। আর সেই লক্ষ্যে রিপাবলিকানরা একটি ‘রুগ্ণ’ আর্থিক প্যাকেজের প্রস্তাব দেবে, যেখানে আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার ও বেকারদের সহযোগিতার জন্য যৎসামান্য বরাদ্দই থাকবে। তাছাড়া প্রাদেশিক সরকারগুলো যদি স্বল্প এ প্রণোদনা প্যাকেজকে সন্তোষজনক বলে বিবেচনা করে, তাহলে আমেরিকা থেকে শুরু করে গোটা বিশ্ব একটি কঠিন সময়ের সামনে পড়বে।
এদিকে মহামারীজনিত অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলার ক্ষেত্রে ইউরোপীয়রা তাদের অংশে রীতিমতো ঐতিহাসিক কায়দায় একত্রিত হয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭৫০ বিলিয়ন ইউরো (৮৮৬ বিলিয়ন ডলার) পুনরুদ্ধার তহবিল সংকট মোকাবেলার বিপরীতে মোটেও যথেষ্ট নয়, বিশেষ করে অঞ্চলটিতে যখন কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানছে। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে অগ্রসর হতে ইউরোপ কি আবারো যূথবদ্ধ হতে পারবে? যদি না হয়, তবে অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা দুরূহ হবে।
বিষয়টি আর আন্তর্জাতিক পরিসরের মধ্যে নেই, যেখানে ঐহিত্যগতভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অনেক বেশি ক্ষমতা উপভোগ করেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা আরো এক দফায় সম্পূরক আন্তর্জাতিক রিজার্ভ বা মজুদ সম্পদ এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস) বাবদ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ইস্যুর আহ্বান জানিয়েছেন; বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পুনরায় চালুর জন্য যা বড় ধরনের সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে তাদের প্রয়োজন অনুসারে প্রয়োজনীয় অনুদান বা বরাদ্দের ব্যাপারেও বেশির ভাগ ধনী দেশ তাদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছে। সংগত কোনো কারণ ছাড়াই একমাত্র ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা থেকেই বোধ করি নতুন এসডিআর ইস্যুর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একমাত্র আশা জো বাইডেন। প্রত্যাশা করা যায় যে মার্কিন এ নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন তিনি, শুধু এসডিআর ইস্যুর ক্ষেত্রে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংস্থাবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও।
একইভাবে ঋণ পুনর্গঠনবিষয়ক নেতৃত্বের জরুরি প্রয়োজন। কভিড-১৯জনিত মন্দা উন্নয়নশীল দেশ ও উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য অনিশ্চিত একটি আর্থিক অবস্থা তৈরি করেছে। তারল্য সমস্যাটি ক্রমশ সলভেন্সি সমস্যায় রূপ নিয়েছে। সহজ কথায় অনেক দেশের কাছেই বকেয়া ঋণ পরিশোধের মতো প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নেই।
জো বাইডেন—এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন—ঋণ প্রদানকারী দেশের নেতাদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন যে আরো একটি বৈশ্বিক ঋণ সংকট কারো জন্য শুভ হবে না।
বাইডেনের পাশাপাশি রিপাবলিকান কংগ্রেশনালদের সহযোগিতা এবং অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে নিয়ে কভিড-১৯-এর সংকটগুলো থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য পথ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ‘যেকোনো মূল্যে করতে হবে’—এ পর্যায়ে অগ্রসর হতে হবে এমন একটি প্রতিজ্ঞা নিয়ে। আর বিদ্যমান পরিস্থিতি ঠিক এমন একটি প্রতিশ্রুতিই দাবি করে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০২১ সালকে আমরা যদি আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় করতে না পারি, তবে যেন সবচেয়ে খারাপ একটি বছরে পরিণত না করি।
বাইডেনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ শুধু একটি স্লোগানই নয়, শব্দগুলো আরো বেশি অর্থবোধক ও ব্যঞ্জনাময় হতে পারে, হওয়া উচিতও। পরিশেষে বলতে চাই, মহামারী-পরবর্তী টেকসই, ন্যায্য, সহযোগী ও সক্ষম একটি বিশ্ব গড়ার পূর্ণ ক্ষমতা কিন্তু এখন আমাদের হাতেই রয়েছে, কভিড সংকট শুরুর আগে কিন্তু এটা ছিল না।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জোসেফ স্টিগলিৎজ: নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস










