ব্যুরো শব্দের আদি অর্থ ড্রয়ারযুক্ত লেখার টেবিল। অর্থাৎ ব্যুরো শব্দটার মূল ধারণার সঙ্গে লেখা ও অফিস যুক্ত। লিখিত নথি ব্যতীত অফিস অকল্পনীয়। আসলে এই লিখিত রূপকে কেন্দ্র করে ব্যুরো গড়ে ওঠার মূল কারণ হলো রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নৈর্ব্যক্তিকতা রক্ষা করা। ভাষার লিখিত রূপ অধিকতর নির্ভরযোগ্য স্মৃতি হিসেবে কাজ করে বলেই সরকারি অফিস মানে নথির স্তূপ। সরকারি কাজে নৈর্ব্যক্তিকতা রক্ষার চেষ্টা অনেক কৃষিভিত্তিক সমাজেও ছিল। তখন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এমন ব্যক্তিকে নেয়া হতো, যার বিয়ে করার অনুমতি থাকত না বা নিয়োগ দেয়া হতো এতিম কাউকে। এছাড়া ক্রীতদাস নিয়োগ করারও চল ছিল কোথাও কোথাও। ব্যুরো হলো এই নৈর্ব্যক্তিকতা রক্ষার আধুনিক পদ্ধতি। আমলাতন্ত্র তাই কঠিনভাবে নিয়ম দিয়ে বাঁধা। নিয়মের গুরুত্ব হলো, নিয়ম না থাকলে প্রতিটা ক্ষেত্রেই আপনাকে নতুন ব্যবস্থা নিতে হবে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব, অন্তত রাষ্ট্র দেখভালের মতো বিশাল ক্ষেত্রে। অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের কর্মপদ্ধতির সুবিধার্থে একে সাজানো হয় হায়ারারকিকাল অর্ডারে। এই হায়ারারকিকাল অর্ডারের সুবিধা হলো, কাজের উচ্চ-নিচু প্রবাহ, একক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা এবং সর্বোচ্চ ব্যক্তি ছাড়া সবারই দেখভাল বা সাহায্যের জন্য একজন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থাকা।
নির্ভরযোগ্য স্মৃতি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ব্যক্তিনিরপেক্ষতা, নিয়মনিষ্ঠতা ও হায়ারারকিভিত্তিক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা আমলাতন্ত্রকে একটি অতিশক্তিশালী ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার কারণে দুনিয়াব্যাপী আমলাতন্ত্রের ব্যাপক বিস্তার।
আমলাতন্ত্র আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কেবল সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীর অংশ নয়; আমলাতন্ত্র সরকার ব্যবস্থার ইউনিট। সরকার ও আমলাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমলারা সরকারের নীতিনির্ধারণীতেও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন বা সরকার ব্যবস্থা তাদের এই সুযোগ দেয়। সেক্ষেত্রে যা সরকারের ব্যর্থতা, তা আমলাদেরও ব্যর্থতা।
চার্লস গুডসেল সরকার ব্যবস্থাপনাকে দুই রকমের কর্মপদ্ধতি দ্বারা চিহ্নিত করেছেন। একটি ‘শাসন’ (Rule) ও অন্যটি ‘সাড়া’ (Response)। সহজ করে বললে, শাসন মূলত গঠনতান্ত্রিক আর সাড়া হলো বাহ্যিক বিষয়ের প্রভাবে মূল গঠনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে আসা। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ধরেন, মহামারী কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, যদি তা সরকারের সাংগঠনিক ব্যবস্থায় উল্লেখ না থাকে তাহলে এটা হবে সরকারের বাহ্যিক বিষয়। এই বাহ্যিক বিষয় মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার যে খাপটা খাওয়ায়, তাই হলো সাড়া। কিন্তু পরেরবার যদি মহামারী মোকাবেলার প্রয়োজনীয় সংগঠন সরকার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে এটা শাসনের অংশ হয়ে উঠবে। সরকার যাতে শাসনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাড়া দিতে পারে, তারই সর্বোত্তম ব্যবস্থা হলো গণতন্ত্র। যেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষায় সাড়া দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর সরকারে থাকা ব্যক্তি বা দল পরিবর্তন হতে পারে।
গুডসেলের থেকে একটা উদাহরণ নেয়া যাক আমেরিকার আমলাতন্ত্রের শাসনের দিক সম্পর্কে।
১/১১-এর ঘটনায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যে নিউইয়র্কের ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্টের ডিরেক্টর ট্রেড সেন্টারের ২৩ তলায় একটি ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার স্থাপন করেন এবং জরুরি পরিস্থিতি হওয়ায় মেয়রের সঙ্গে কথা না বলেই ম্যানহাটনকে ঘিরে থাকা সব ক্যানেল রোড, টানেল ও ব্রিজ বন্ধ করে দেন। এর ঠিক পরপর বিমান হামলায় অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি অফিসটিকে ট্রেড সেন্টারের লবিতে নিয়ে যান। সেখান থেকেই তিনি কোস্টগার্ডকে নির্দেশ দেন নিউইয়র্ক পোতাশ্রয় বন্ধ করে ফেলার এবং ডিফেন্স বিভাগকে নির্দেশ দেন নিউইয়র্কের আকাশসীমা বন্ধ করে ফেলার জন্য।
এছাড়া আরো কয়েকজন অফিশিয়াল নিজেরাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন কোনো ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনা ছাড়াই। কারণ তারা জানতেন নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের ভূমিকা কী। এমন সক্ষমতার পরও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যুরোক্র্যাসির বিকল্প কী হতে পারে, তা আধুনিক বিশ্বের একটা বড় ভাবনার বিষয়।
অথচ বাংলাদেশে ৩ এপ্রিল সাধারণ ছুটির মধ্যে পরদিন গার্মেন্ট খুলবে এমন ঘোষণায় কয়েক লাখ শ্রমিক হেঁটে রওনা হন ঢাকার উদ্দেশে। গণমাধ্যম লাইভ করতে থাকে। তবু ন্যূনতম সিদ্ধান্ত আসতে আসতে শ্রমিকরা রোগ সংক্রমণের ষোলোয়ানা সম্ভাবনা পূর্ণ করে ঢাকা পৌঁছেন এবং পৌঁছানোর পর সিদ্ধান্ত পান কারখানা বন্ধ থাকবে। যাওয়া-আসার পথে তাদের কেউ থামায়নি, খাবার বা বাসের ব্যবস্থাও করেনি। কোনো জেলার একজন আমলাও একটিও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেননি। কিন্তু এটা নিশ্চয় বিশ্বাসযোগ্য নয় যে কোনো আমলাই বোঝেননি এ ঘটনার ফল কী ভয়াবহ হতে যাচ্ছে এবং ওই মুহূর্তে তাদের কী করা উচিত।
আমলাতন্ত্র আমাদের দেশে কী পরিমাণ ঔপনিবেশিক প্রভুত্বের ধারণা লালন করে, তা আমলাদের ভাষা খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন। যেমন ধরেন, একজন এসিল্যান্ড বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোনো অপারেশন সম্পর্কে ফেসবুকে পোস্ট করতে গেলে লিখবেন, ‘জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশে ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্যারের পরামর্শে বা নির্দেশনা মোতাবেক অমুক অপারেশনে গিয়েছিলাম।’ অর্থাৎ ব্যক্তিগত ওয়ালে পোস্ট করতে গিয়েও অনেক আমলার মূল বক্তব্য দীর্ঘায়িত হয় আমলাতন্ত্রের কারণে। সব আমলা হয়তো এসব ইচ্ছে করে লেখেন না, কিন্তু এমন দৈত্যাকার আমলাতন্ত্রের অংশ হলে এ রকম তৈলাক্ত ভাষায় লিখতে বাধ্য হন প্রায় সবাই। আমাদের দরখাস্তের ভাষাও আমলাতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত। কয়েকটা শব্দ বলছি, তা কানে কেমন অশ্লীল শোনায় খেয়াল করুন। যেমন ‘সদয় অবগতি’, ‘সহূদয় উপস্থিতি’, ‘বিনীত নিবেদন’, ‘আপনার মর্জি হয়’, ‘মাননীয় অমুক স্যার মহোদয়’ ইত্যাদি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও জনগণের একটা পরিপূরক সম্পর্ক থাকার কথা। আমলাদের ওপরে থাকেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ওপরে থাকে জনগণ। অর্থাৎ আমলারা সরকারের স্থায়ী অংশ হলেও তারা এই অস্থায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেনে চলতে বাধ্য হন বা এ পদ্ধতি কাজ করে, কারণ এই প্রতিনিধিদের পেছনে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। এই জনগণকে যদি কোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গৌণ করে তোলা যায় তাহলে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় সুবিধালোভী আমলাদের। কারণ তাতে জনগণকে হারিয়ে ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিবিদরা দুর্বল হয়ে পড়েন। ফলে আমলাদের সঙ্গে হায়ারারকির সম্পর্কের বদলে সৃষ্টি হয় চুক্তিভিত্তিক লেনদেনের সম্পর্ক। এমন সম্পর্ক তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া তখনই শুরু হয়, যখন সরকার ব্যবস্থায় ‘সাড়া’ দেয়ার কোনো প্রক্রিয়া থাকে না, অর্থাৎ জনগণের কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে না। জনগণের অংশগ্রহণ সুস্থ সরকার ব্যবস্থায় একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভালো সরকার ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্বাধীন গবেষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অংশের সরকারের কাজে অবদান রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকার কথা। চলমান করোনা সংকটের কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সরকারের সঙ্গে কোনো অংশগ্রহণ নেই, শুধু কিছু হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্তুত করা ছাড়া। যে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য ক্রমে পঙ্গু করা হয়েছে নিম্নমানের তাঁবেদার শিক্ষক নিয়োগ, ভালো শিক্ষকদের কোণঠাসাকরণ, উগ্র ছাত্ররাজনীতি ও অন্যান্য উপায়ে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার বদলে হ্যান্ড স্যানিটাইজারই সরকারের হাতে তুলে দেয়ার কথা। অন্যদিকে যে জনগণকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ১০০ টাকায় ভোট বিকোনোর মতো নির্বোধ করে তোলা হয়, সে একটা অদৃশ্য ভাইরাসের কারণে পেটে ভাত না থাকলে তো অবশ্যই, ভাত থাকলেও ঘরে থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক।
সরকার থেকে জনগণ বিচ্ছিন্ন হলে তৈরি হয় নয়া ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা। ঔপনিবেশিক আমলে ভারত ছিল আমলাদের অধীনে। ১৮৬৭ সালে ৩২ শতাংশ ব্রিটিশ জনগণ ভোটাধিকার পায়। ব্রিটিশ সরকারের দায়বদ্ধতা ছিল এদের প্রতি। ভারতীয়দের কাছে ভাইসরয়ই ছিল মর্ত্যের প্রভু। উপনিবেশকের প্রতি উপনিবেশিতের যেমন একদিকে ঘৃণা ও অন্যদিকে অনুকরণের প্রবণতা থাকে, তেমনি আমলাদের প্রতি এ সময়ের জনগণের আছে ভয় ও নৈকট্য লাভের বাসনা। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে ভয় পাই। এ ভয় থেকে আমি নিরাপদ বোধ করি, যদি আমার পরিচিত বা আমার ঘরে একজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকে বা আমি নিজেই একজন ম্যাজিস্ট্রেট হই। এই নৈকট্য লাভের বাসনা আসলে ভয় পাওয়া মানুষের বাসনা।
সফল সরকার ব্যবস্থার বাহ্যিক বিষয়ে সাড়া দিতে পারার কথা। কেবল অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সামাল দেয়া নয়, পরিস্থিতির সামাজিক ফল কী হতে পারে তা আঁচ করতে পারাও সাড়ার অংশ। দশতলা থেকে লাফ দিয়ে মরে যাওয়া প্রমাণ করার চেয়ে দশতলা থেকে লাফ দিলে মানুষ মরবে, এটা জেনে উদ্যোগ নিতে পারাও সাড়ার অংশ। এজন্য প্রয়োজন সব অর্থেই সরকারে জনগণের অংশগ্রহণ। অথচ এখানে হাত ধোয়ার কথা বলতে গিয়েও আমলারা বলে ফেলেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হাত ধোয়ার কথা। অনেক বড় বড় নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দেবেন, সঙ্গে হাত ধুতেও বলবেন—এটাই স্বাভাবিক। আমরাও এখন যে কেউ যে কাউকে হাত ধুতে বলতে পারি। এটা এতটাই সাধারণ নির্দেশনা। এই হাত ধুতে বা টেস্ট করতে বা রোগীর সেবা দিতেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ প্রয়োজন হওয়া সরকারের শাসন ও সাড়া দুই অংশেরই দুর্বলতার লক্ষণ। শাসন ও সাড়া দুই অংশই দুর্বল হলে সেই সরকার ব্যবস্থার সামনে একের পর এক অভূতপূর্ব ঘটনা উত্পাদন হতেই থাকবে বা তার ব্যবস্থাই অচিন্তনীয়ের জন্ম দেবে, কারণ ঘটনা অনুমানের ক্ষমতা তার কম এবং তার চেয়েও কম তার ব্যবস্থা গ্রহণের গতি।
করোনায় যদি বেঁচেও যাই, এরপর কোনো একদিন হয়তো এমন কঠিন একটা ভাইরাসের উত্পত্তিস্থল হতে পারে বাংলাদেশই। তখন কারা গবেষণা করে আপনাকে ওষুধ বা ভ্যাকসিন দেবে? কোন দেশের দিকে অধীর হয়ে তাকাবেন? কোন দেশ আপনার জন্য সীমান্ত খুলে দেবে? তখন এই বিশেষ আমলাতন্ত্র বা সরকারতন্ত্র আপনাকে কোন মন্ত্রে বাঁচাবে? উত্তরগুলো এখনই খোঁজার সময়।
সামজীর আহমেদ: শিক্ষক, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়










