করোনার সময় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এক্ষেত্রে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে সেলফোন। সম্প্রতি ১ এপ্রিল থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত সময়ে সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে ওপেন সিগনালের গবেষণার বরাত দিয়ে বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে করোনার সময়ে কয়েকটি খাতে সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান সম্পর্কে নির্দেশ করা হয়েছে। অপারেটরদের বিরুদ্ধে সেবার মানে গুরুত্ব না দেয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মোবাইলের ভয়েস কল ও ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, দুর্বল নেটওয়ার্ক কাভারেজ, নেটওয়ার্ক সমস্যা, ভয়েস কলের নিম্নমান, কলড্রপ, রিচার্জের মেয়াদ, জরুরি সেবার নম্বরে কল ধরায় অহেতুক বিলম্ব, অযথা প্রমোশনাল কল প্রভৃতি ক্ষেত্রে গ্রাহকের পকেট থেকে চার্জ কাটা অনেকটা যেন আবর্তনিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ফলে অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকের অসন্তুষ্টি বেড়েই চলেছে। গ্রাহকসেবার অসন্তুষ্টি দূর করতে বিটিআরসি মানসম্মত সেবা তথা কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। আশা করা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়ন হলে সেবার মানে লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হয়নি। সেটি নেটওয়ার্ক সমস্যা ও ডাটার সেবার মান উভয় দিক থেকে। অপারেটররা অবশ্য এজন্য মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং নিজেদের প্রস্তুতিহীনতাকে দায়ী করছেন। প্রথমোক্ত কারণের কিছুটা সত্যতা থাকলেও শেষোক্ত কারণ কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। চলমান সংকটটি বিশ্বব্যাপী তীব্রতর হয়েছে প্রায় পাঁচ মাস আগে। বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে এর আঁচ যে বাংলাদেশেও পড়বে, সেটা অননুমেয় কোনো বিষয় ছিল না। সংক্রমণ বাড়লে এখানেও মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়বে, এটা কোনো দূরের বাস্তবতা নয়। কাজেই অপারেটরগুলোর প্রয়োজন ছিল সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া। সেবার মান বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। দরকার ছিল বাড়তি চাপের মধ্যেও যাতে সেবার মান ধরে রাখা যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় তরঙ্গ কেনা। অথচ মূলত মুনাফার বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণে তরঙ্গ কেনার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেনি তারা। নেয়া হয়নি ন্যূনতম প্রস্তুতিও। সুতরাং নিম্নগামী ডাটা সেবা এবং গ্রাহকের অসন্তুষ্টির দায় তারা কোনোভাবে এড়াতে পারে না। একথাও সত্য, বিটিআরসিকেও ছাড় দিতে হতো। ডাটার মূল্য কমিয়ে অপারেটরদের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ আটকে রাখা যৌক্তিক হয়নি। ফলে বর্তমানে সেবার মান খারাপ হওয়ার দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসিও এড়াতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দ্রুতই সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডাটার গতি বাড়াতে স্বল্প মূল্যে অধিক তরঙ্গ বরাদ্দ প্রদান। একই সঙ্গে তদারকিও জোরদার করতে হবে, যাতে এর সুবিধা গ্রাহকরা পান।
ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়নের স্বার্থে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার এ খাতকে এগিয়ে নিতে নিঃসন্দেহে অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে, তবে আরো কিছু ক্ষেত্রে সরকার যদি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে তাহলে সেবার মান নিয়ে যেসব প্রশ্ন এখন রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এজন্য বেতার তরঙ্গ, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কসহ টেলিযোগাযোগ খাতের সেবার মানসংশ্লিষ্ট নীতিমালা সংস্কারের কোনো বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, ৫জি এবং নিত্যনতুন প্রযুক্তির বিষয়গুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ সংস্কারগুলো করতে হবে। সত্যিকার অর্থে যদি আমরা উন্নত মোবাইল সেবা চাই, সেই সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। নতুবা উন্নত সেবা শুধু কথার মধ্যে আটকে থাকবে। এটা পরিষ্কার যে অপেক্ষাকৃত ছোট অপারেটরদের জন্য তরঙ্গের বিপুল ব্যয় ভার বহন করে সেবার মান দিয়ে সব গ্রাহককে সবসময় খুশি করা কঠিন। এছাড়া আমাদের তরঙ্গছাড়ের নীতিমালা বা রোডম্যাপেও অনেক উন্নতির জায়গা রয়েছে। তরঙ্গের মূল্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
ওপেন সিগন্যালের এক পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেটের গতি কমে গেছে। ৪২টি দেশের ওপর চালানো পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশেই ডাউনলোডের গতি সবচেয়ে কম। এ পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর দিকে বরং সরকারকে অধিক মনোযোগী হওয়া দরকার। বিশ্বের অনেক দেশেই লকডাউনে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে মানুষকে ফ্রি ইন্টারনেট সার্ভিস দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে সরকার ঠিক বিপরীত ভূমিকা পালন করছে, যা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। করোনা কিন্তু এরই মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে যে চাল-ডাল-দুধ-ওষুধের মতো ইন্টারনেটও প্রকৃত অর্থে জরুরি পরিষেবা। ইন্টারনেট আছে বলে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য ও নির্দেশিকা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে, ঘরে বসেই ব্যাংকিং ও অন্যান্য পরিষেবা মিলছে, বিকাশের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ টাকা লেনদেন করছে। জিনিসপত্রের দাম পরিশোধ করা হচ্ছে। বহু শিক্ষার্থী অনলাইনে পড়াশোনাও করছে। নভেল করোনাভাইরাসের এ সময়ে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার বিশ্বের প্রচলিত অনেক ধারণাই পাল্টে দিচ্ছে। এমনকি এটি বদলে দিতে পারে ভবিষ্যৎ কাজের ধরনও। ঢাকা শহরে স্বাভাবিক সময়ে রাস্তার যে ভোগান্তি; যানজট ঠেলে আগে যেমন মানুষ অফিসে যেত, এখন অনলাইনে সেটি করছে। অবস্থা স্বাভাবিক হলেও অনলাইন অফিসের চর্চা থেকে যেতে পারে। অথচ নিম্নবিত্ত, গ্রামবাসী, কৃষক-শ্রমিকের কাছে এখনো এটা প্রায় অধরা।
ইন্টারনেটকে অত্যাবশ্যক হিসেবে গণ্য করা এ মুহূর্তে জরুরি। এ পরিষেবার সঙ্গে মোবাইল ফোন নির্মাতা, ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানকারী সংস্থা থেকে শুরু করে একটি বিরাট বাজার জড়িত এবং বাংলাদেশে ইন্টারনেট পরিষেবা এ মুহূর্তে প্রধানত বাজার পরিচালিত। করোনা মহামারীর জরুরি অবস্থায় ইন্টারনেটের অপরিহার্যতা বুঝিয়ে দিয়েছে, একে আর কেবল বাজারের লাভ-লোকসান দিয়ে ভাবলে চলবে না। সরকারকে অবিলম্বে নিম্নবিত্ত ও সংগতিহীনের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। অনেক পরিবারের জন্য মোবাইল ও তদুপরি ইন্টারনেট সংযোগ বিপুল খরচের ব্যাপার। অথচ শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগের জন্য এখন প্রতিটি পরিবারেই স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য। আপত্কালীন অবস্থায় আপাতত ভাবা যেতে পারে প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড স্তরে ‘ইন্টারনেট হাব’-এর কথা। সেখানে কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকবে, অবশ্যই থাকবেন পরিষেবা সহায়ক কর্মী। ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ‘তথ্য সেবাকেন্দ্র’গুলো এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। সেগুলোকে কার্যকর করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া দরকার।










