বাংলাদেশে সম্প্রতি কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতির চাকা কভিড-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকার ক্রমান্বয়ে শিথিল করছে, যাতে জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনার পাশাপাশি দেশে যথাযোগ্য স্বাস্থ্যবিধি গ্রহণ করে নভেল করোনাভাইরাসকে সীমিত পর্যায়ে রাখার জন্য এ কারণে ঘটিত সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের গতিপ্রকৃতি জানাও খুবই জরুরি। নভেল করোনাভাইরাসের গতিবিধি নির্ণয়ের লক্ষ্যে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে ৩ এপ্রিল থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কভিড-১৯ সংক্রমণ হার ও কভিডজনিত কারণে মৃত্যুহারের তথ্য সংগ্রহ করে চিত্র এবং ইকোনমেট্রিকস বিশ্লেষণে এপ্রিল থেকে আগস্ট, ২০২০ পর্যন্ত সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের মাসিক ও পুরো সময়কালের গড় প্রবৃদ্ধি ধারা নির্ণয় করেছি। গত পাঁচ মাসের দৈনিক উপাত্ত থেকে কভিড-১৯ সংক্রমণ হারের পাঁচ দিনব্যাপী ‘চলমান গড়ের’ (সংক্রমণ ধারা আরো পরস্ফুিট করার জন্য) সময়চিত্রটি (চিত্র-১) লক্ষ করলে দেখা যায় যে এপ্রিল ও মে মাসে সংক্রমণ হার ‘সর্বোচ্চ হারে’ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মে, জুন ও জুলাই পর্যন্ত সময়কালে গড়ে সংক্রমণ হার মোটামুটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিরাজ করেছে। আগস্টের ‘শুরুতে’ সংক্রমণ হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৃদ্ধি পেলেও তা সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। চিত্রের বৃদ্ধি-হ্রাসের মাত্রা পরিসংখ্যানগতভাবে সংখ্যায় প্রকাশের লক্ষ্যে আমরা সাধারণ ‘লিস্ট স্কোয়ার রিগ্রেশন পদ্ধতি’ অনুসরণ করে পুরো সময়কাল এবং প্রতিটি মাসের জন্য সংক্রমণ হারের প্রবৃদ্ধি নির্ণয় করেছি। নির্ভরশীল চলক ‘সংক্রমণ হার, ন্যাচারাল লগে’ নেয়ার বিপরীতে স্বাধীন চলক হচ্ছে প্রতিদিন। এতে দেখা যায়, এপ্রিল ও মে মাসে কভিড-১৯ সংক্রমণ হারের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা পরিসংখ্যানগতভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী আগস্টে ওই গড় প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৬০ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে, যা চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জনমনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষের ভিড়ে সংক্রমণ হার হয়তো বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রকাশিত তথ্যানুসারে এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে আগস্টের মধ্যভাগ থেকে সংক্রমণ হারে যে নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে, সে অনুযায়ী বোধগম্য হয় যে বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সংঘটিত হয়নি।
অন্যদিকে আমরা যদি কভিড-১৯ সংঘটিত মৃত্যুহারের দিকে একটু নজর দিই, ভিন্ন ধরনের একটি চিত্র আমরা দেখতে পাই।
উপরের চিত্র (চিত্র-২) অনুযায়ী এপ্রিল, ২০২০-এর শুরুতেই কভিড-১৯-এর কারণে সংঘটিত মৃত্যুহার অনেক বেশি দিয়ে শুরু হলেও তা অল্প কিছুদিনের ভেতরেই হ্রাস পেয়ে মোটামুটি অপরিবর্তনীয় হারে অব্যাহত থাকে। তবে এক্ষেত্রে এপ্রিলের শুরুর উল্লম্ফনের একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন—এপ্রিলের শুরুর দিকে ল্যাব টেস্টের দৈনিক পরিমাণ খুবই কম ছিল, ফলে সংক্রমণের সংখ্যাও কম দেখা গেছে। এতে মৃত্যুহারের (সংক্রমণের বিপরীতে) একটি অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে, যা যদিও তাত্পর্যপূর্ণ নয়। পরবর্তী সময়ে ল্যাব টেস্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে মৃত্যুহারের দৈনিক ১ থেকে ১ দশমিক ৫০ শতাংশের ভেতর নেমে আসে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে মৃত্যুহার হ্রাস পেলেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে তা কিছুটা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সম্প্রতি আগস্টেও এ বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে একটা বিষয় স্বাস্থ্যবিদসহ সবার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো, সংক্রমণ হার হ্রাস পেলেও মৃত্যুহারের বৃদ্ধি প্রবণতা। এটি সম্প্রতি কভিড-১৯-এর কারণে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঘটেছে কিনা, তা আমাদের সবার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সংক্রমণ হারের মতো একই নিয়মে মৃত্যুহারের প্রবৃদ্ধির হার নির্ণয় করে দেখা গেছে যে এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুহার গড়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে, যা স্বস্তির বিষয়। যদিও চিত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে আগস্টে মৃত্যুহার কিছুটা বেড়েছে। দেখা গেছে যে ওই প্রবৃদ্ধির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং এটি পরিসংখ্যানগতভাবে ১০ শতাংশ তাত্পর্য স্তর বা ‘সিগনিফিকেন্স লেভেল’-এও তাত্পর্যপূর্ণ নয়। এটি স্বস্তির বিষয়। যেহেতু ওই ঊর্ধ্বগতি লম্বা সময়ের জন্য অবলোকন করা যায়নি এবং চিত্র-২ থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে আগস্টের মৃত্যুহারে কিছুটা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। তাই মৃত্যুহারের বৃদ্ধি পরিসংখ্যানগতভাবে তাত্পর্যপূর্ণ নয়। এছাড়া ল্যাব টেস্ট এবং সংক্রমিত রোগীর সংখ্যার মধ্যকার পিয়ারসন’স সংশ্লেষ সহগ (পিয়ারসন’স কো-রিলেশন কোফিসিয়েন্ট) থেকে দেখা যায় যে ওই সহগের মান শূন্য দশমিক ৯৭, যা প্রায় ১-এর কাছাকাছি (যা পরিসংখ্যানগতভাবে ১ শতাংশ তাত্পর্যপূর্ণ)। এ থেকে অনুমান করা যায় যে ল্যাব টেস্টটি মূলত উপসর্গ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে, ফলে ল্যাব টেস্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কভিড-১৯-এ সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও প্রায় একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ একজন সুস্থ মানুষের কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার তুলনায় একটি কভিড উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর ভেতর নভেল করোনাভাইরাস ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে স্পষ্ট টেস্টের সঙ্গে সংক্রমণ হার একই গতিতে বাড়ে-কমে। উপসর্গহীন সংক্রমিত ব্যক্তিরা টেস্টের আওতায় আসেনি। যদি আসত, সংক্রমণ রোধে পদক্ষেপ নিতে তা সহায়ক হতো। বেশি রেনডম টেস্ট কভিড সংক্রমণের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে ও নিরোধে সহায়ক হতো।
নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের গতিপ্রকৃতি জানার সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি বিষয় সরকারি নীতিনির্দেশনা গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো, আগামী দিনে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কী হারে বৃদ্ধি বা হ্রাস পাবে। এটি জানার লক্ষ্যে আমরা ২৯ আগস্ট থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইকোনমেট্রিকসের প্রক্ষেপণ পদ্ধতি ব্যবহার করে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের আগাম এক মাসের একটি প্রক্ষেপণ করেছি। ইকোনমেট্রিকস প্রক্ষেপণের সঙ্গে জড়িত শব্দ বা টার্মগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে পরিচিত না-ও হতে পারে, তাই যতটা সম্ভব টেকনিক্যালিটি পরিহার করে ওই প্রক্ষেপণটি এখানে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা প্রক্ষেপণের জন্য ইউনিভেরিয়েট টাইম সিরিজের অন্তর্গত ‘এআরআইএমএ’ বা সংক্ষেপে অ্যারিমা পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। ওই পদ্ধতি অনুসরণ করে সংক্রমণ হারের আগামী ৩০ দিনের প্রক্ষেপণ নিম্নের চিত্রে উপস্থাপন করা হলো।
উপরের চিত্র (চিত্র-৩) অনুযায়ী লাল রেখাটি (মধ্যম অবস্থান) হলো কভিড-১৯-এর সংক্রমণ হারের প্রক্ষেপিত রেখা। আমরা যদি প্রকৃত সংক্রমণ হারের (হলুদ রেখা মধ্যম অবস্থান) তথ্যের সঙ্গে আমাদের প্রক্ষেপিত রেখার তুলনা করি তাহলে দেখব যে নমুনা সময়কালের ভেতর আমাদের অ্যারিমা মডেলটি প্রকৃত রেখার খুবই কাছাকাছি ছিল এবং এটি প্রক্ষেপণের পরিমিত বিচ্যুতির ৯৫ শতাংশ কনফিডেন্স সীমার ভেতর রয়েছে। প্রক্ষেপণের চিত্র অনুযায়ী আমরা বলতে পারি, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ হারে নিম্নগতি লক্ষ করার সম্ভাবনা রয়েছে; যা আগস্টের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে প্রায় মিলে যায় (আগস্টের প্রকৃত তথ্যানুযায়ী সংক্রমণ হার ওই সময়ে গড়ে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে)। একইভাবে নভেল-১৯ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহারের প্রক্ষেপণ ২৯ আগস্ট থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সময়কালের জন্য নির্ণয় করা হয়েছে, যা নিম্নরূপ।
সংক্রমণ হারের অনুরূপ উল্লিখিত চিত্রটি (চিত্র-৪) পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে কভিড-১৯-এর কারণে প্রকৃত মৃত্যুহারের (হলুদ রেখা, মধ্যম অবস্থান) তথ্যের সঙ্গে আমাদের প্রক্ষেপিত মৃত্যুহার (লাল রেখা, মধ্যম) নমুনা সময়কালে খুবই কাছাকাছি অবস্থান করেছে, যা প্রক্ষেপণের নির্ভুলতার প্রমাণবাহী। ওই প্রক্ষেপণ অনুযায়ী আমরা বলতে পারি, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সংঘটিত মৃত্যুহারে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আগস্টের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে প্রায় মিলে যায় (আগস্টের প্রকৃত তথ্যানুযায়ী সংক্রমণ হার ওই সময়ে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ হারে
বৃদ্ধি পেয়েছে)। প্রাপ্ত প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে আমরা ২৯ আগস্ট থেকে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রক্ষেপিত হারের প্রবৃদ্ধি নির্ণয় করেছি। এ হিসাব অনুযায়ী, যদি বর্তমান কভিড-১৯ পরিস্থিতি প্রক্ষেপিত সময়কালে অন্য কোনো উপাদান দ্বারা প্রভাবিত না হয় (যেমন ভ্যাকসিন এসে গেলে) তাহলে ওই সময়কালে সংক্রমণ হার গড়ে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে হ্রাস পেলেও মৃত্যুহার গড়ে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে আরো বোঝা যায় যে সম্প্রতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শিথিল করা বা ঈদ উপলক্ষে জনমানুষের চলাফেরা বৃদ্ধিতে নভেল করোনাভাইরাসের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ বাংলাদেশে সংঘটিত হয়নি। তবে মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে ভাইরাসটির মিউটেশন হওয়া কোনোভাবে দায়ী কিনা, তা ভাইরোলজিস্টরা ভালোভাবে বলতে পারবেন এবং মাইক্রো বায়োলজিস্ট গবেষকদেরই বলা উচিত। ভাইরাস নিয়ে আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার হওয়া আবশ্যক।
ড. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ
মোহাম্মদ জারিয়াব হোসেন: গবেষণা সহকারী










