করোনা সংকটে কিছুটা হোঁচট খেলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এখনো দুর্বার। ২০২৪ সালের মধ্যে স্থায়িত্বশীলভাবে দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ নিশ্চিত, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দৃঢ়সংকল্প। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বিষয়। তবে নিয়মাচার, সার্বিক পরিপালন নিশ্চিতসহ প্রাতিষ্ঠানিক উত্তম চর্চা অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছি। উন্নত দেশের উদাহরণ দূরে থাক; প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, ভারত, শ্রীলংকা এবং সমপর্যায়ের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে বলা চলে। ফলে রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসরে সুশাসনের অভাবে দেশে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। টিআইবির দুর্নীতি ধারণা সূচক প্রতিবেদনে সাংবৎসরিক যার প্রমাণ মেলে।  প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছেন, বিভিন্ন সময়ে এর বিরুদ্ধে দৃঢ় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। দুর্নীতি কমিশনও অনিয়ম রুখতে বদ্ধপরিকর। দুর্নীতির বিস্তার রোধে সংস্থাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। তবুও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না দুর্নীতি। এর পেছনে অনেক কারণই বিদ্যমান; কিন্তু অন্যতম প্রভাবক হলো প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ম পরিপালন সংস্কৃতির গভীরতর অনুপস্থিতি। দেশে কয়েক দশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ ব্যয়ের পরিধি বেড়েছে কয়েক গুণ, নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ায় খরচের খাতেরও আনুভূমিক সম্প্রসারণ ঘটেছে। নিয়ম হলো, বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় নিয়মিত নিরীক্ষা সম্পাদন করা। সব দেশেই এ চর্চা যথাযথভাবে অনুসরিত হয়, যেকোনো ত্রুটি এড়াতে গভীর অভিনিবেশে তা সম্পাদন করা হয়। আমাদের দেশেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নিরীক্ষার বিধান রয়েছে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়মিত নিরীক্ষা সম্পাদন করা হয় না; হলেও তা দায়সারাভাবে করা হয়। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্যে উঠে এসেছে, সরকারের অর্থ ব্যয়ের ১০ শতাংশেরও নিরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। আবার যা-ও হয়, তাও বেশ ত্রুটিপূর্ণ। এতে সরকারের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নানামাত্রিক দুর্নীতির সুযোগ থেকে যাচ্ছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বড় ধরনের অন্তরায় বৈকি। অনেক সময় নীতিনির্ধারণী মহলের সদিচ্ছা থাকলেও নিয়মাচার নিশ্চিতে প্রাতিষ্ঠানিক গলদ রয়ে গেলে অনিয়মে রাশ টানা কঠিন। তাই শুধু উপরে উপরে দুর্নীতিকে না বললে কাজ হবে না; বরং নিয়মিত নিরীক্ষা না হওয়ার মতো কাঠামোগত-প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও অবসান জরুরি। বিষয়টি আমলে নিয়ে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের বিশেষ সক্রিয়তা কাম্য।

আজকাল বেসরকারি বড় সব প্রতিষ্ঠানেই অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিয়মিত নিরীক্ষা সম্পাদন করা হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় সাংবৎসরিক সুষ্ঠু নিরীক্ষা না হওয়াটা হতাশাজনক। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈপুণ্য, কার্যকারিতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভাগীদার জনগণ। সরকার ও আমলাতন্ত্র এর ব্যবস্থাপক মাত্র। নিয়মিত কর দিয়ে জনসাধারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জুগিয়ে চলছে। ওই অর্থ কতটা, কোন খাতে, কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা জানার অধিকার রয়েছে তাদের। কোন প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পে অর্থ ব্যয় ঠিকভাবে হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে না এবং কোথায় অর্থের অপচয় হচ্ছে, কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, তা জানা না গেলে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না; দুর্নীতির বিস্তার ঘটতেই থাকবে। তাই সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নিরীক্ষা কার্যকর করতে হবে।

দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়মিত নিরীক্ষা না হওয়ার কারণ হিসেবে লোকবল সংকটের কথা বলা হচ্ছে। দায়িত্বশীলদের ভাষ্যে উঠে এসেছে, সময়ের দাবি অনুযায়ী ফিন্যান্সিয়াল অডিট, পারফরম্যান্স অডিট, আইটি অডিট ও ইস্যুভিত্তিক অডিট সম্পন্ন করার মতো দক্ষ জনশক্তিও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের নেই। অডিট কার্যে প্রশিক্ষিতদের কেউ কেউ অন্যত্র ডেপুটেশনে কাজ করছেন। ফলে নিরীক্ষাকাজের গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় তৃতীয় কোনো পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে সরকারি নিরীক্ষার জন্য নিয়োজিত করা যেতে পারে। দেশে এখন বেশকিছু স্বনামখ্যাত পেশাদার অডিট প্রতিষ্ঠান  রয়েছে। সেখানে সনদপ্রাপ্ত বিভিন্ন নিরীক্ষক পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তাদেরও সরকার কাজে লাগাতে পারে। সরকারি অডিট অধিদপ্তরের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পে দাতা সংস্থাগুলো তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষায় জোর  দিচ্ছে। এতে জবাবহিতাি ও স্বচ্ছতা বরং আরো বৃদ্ধি পাবে।

করোনা সংকটজনিত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে প্রতিটি দেশের সরকারই অর্থসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জনসংখ্যানুপাতে আমাদের দেশে সম্পদ নিতান্তই অপ্রতুল। অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে কীভাবে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করা যায়, তা ভাবতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বন্ধ করা না গেলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা অর্থের অপচয় ঘটবে।