কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ফলে বিশ্বব্যাপী ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম পর্যটন শিল্প। ভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে বিভিন্ন দেশ যেমন বাইরের পর্যটকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তেমনি ভ্রমণেচ্ছুরাও কয়েক মাস ধরে বেড়ানো বন্ধ রেখেছে। ফলে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে বিভিন্ন দেশের পর্যাটন শিল্প। একই হাল বাংলাদেশেও। কভিড পরিস্থিতি শুরুর পর প্রায় চার মাস ধরে খালি পড়ে আছে দেশের বিভিন্ন স্থানের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। দর্শনার্থী না থাকায় বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্ট বন্ধ। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট খাতের কয়েক লাখ মানুষ। সব মিলিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্পটি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কভিড-১৯-এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পর্যটন খাতের সম্ভাব্য ক্ষতির যে হিসাব করেছে, সেখানে বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বলা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে চার লাখেরও বেশি মানুষ। এ অবস্থায় দেশের পর্যটন শিল্পের গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। একই সঙ্গে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ প্যাকেজ ঘোষণা ও ছাড় প্রদানের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকে উৎসাহিত করা জরুরি।
পর্যটন খাতে করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্থানীয়দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভ্রমণার্থীদের উৎসাহিত করতে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছে। গত জুলাই থেকেই বিদেশী পর্যটকদের জন্য নিজ দেশে ভ্রমণ উন্মুক্ত করে দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিমান থেকে হোটেল, রেস্তোরাঁ—প্রতিটি ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বাস্থ্যবিধি। বিমানের যাত্রীদের যেমন সুরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তর করা হচ্ছে, তেমনি সংক্রমণ এড়াতে নির্দিষ্টসংখ্যক যাত্রীর বেশি বহন করা হচ্ছে না। এছাড়া বিমানবন্দরে ব্যবস্থা করা হয়েছে বিনা মূল্যে কভিড-১৯ টেস্টের। ফলাফল নেগেটিভ এলে ওই ভ্রমণার্থীর জন্য দেশটিতে প্রবেশে আর কোনো বাধ্যবাধকতা থাকছে না। হোটেলগুলো তাদের প্রতিটি কক্ষ স্যানিটাইজ করছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় নির্দিষ্ট দূরত্বে চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে যেন ভ্রমণেচ্ছুরা পরস্পরের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখেই স্থানগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। এভাবে দেশটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে উৎসাহিত করছে। ইতালির সরকার অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকে উৎসাহিত করতে একক ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১৫০ ইউরো, দুজন হলে ৩০০ ইউরো এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্রমণ করলে ৫০০ ইউরো করে হলিডে বোনাস প্রদান করছে। দেশটির সিসিলি আইল্যান্ডে ভ্রমণাগ্রহীদের বিমান ভাড়া কমানোর পাশাপাশি হোটেল ব্যয়ও কমানো হয়েছে। বিনা মূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে জাদুঘর, পার্কসহ দর্শনীয় স্থানগুলোয়। জাপানে গো টু ক্যাম্পেইন চালু করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকে উৎসাহিত করার জন্য। যেখানে বেড়ানোর খরচ, থাকা-খাওয়ার ব্যয় ও দর্শনীয় জায়গায় প্রবেশসহ কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ মূল্য ছাড় রয়েছে। মেক্সিকোয় কাম টু কানকুন ক্যাম্পেইনের আওতায় দুই রাতে থাকার বিনিময়ে আরো দুই রাত বিনা মূল্যে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি দর্শনার্থীদের ফিরতি ফ্লাইটের অর্থ রিফান্ড করা হচ্ছে।
আমাদের দেশেও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণার্থীদের উৎসাহিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনৈতিক এক ধরনের কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো নিশ্চিত করে জনগণকে ভ্রমণে উৎসাহিত করার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিদ্যমান আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে হোটেল রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের যেমন সহযোগিতা প্রয়োজন, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। মানুষকে উৎসাহিত করতে যেমন প্রণোদনা প্রদান ও বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যবস্থা করতে হবে, তেমনি নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা দেয়াও জরুরি। বিনা মূল্যে কভিড টেস্টের ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিমান ভ্রমণের জন্য যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলে দিলেই হবে না, স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোটেল-মোটেল-বিনোদনকেন্দ্রগুলো খোলাবিষয়ক সঠিক নির্দেশনা থাকতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে এবং নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ডকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
আমরা জানি, পর্যটন খাত নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। সহসা যেহেতু কভিড পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটছে না, তাই পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করতে এবং কর্মীদের কাজে ফেরাতে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে ট্যুর অপারেটর, ক্ষুদ্র বা মাঝারি হোটেল মালিকদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। শ্রম, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ, সেবাসহ পর্যটনের সঙ্গে অর্থনীতির অনেক খাত জড়িত। তাই একে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত সেবা প্রদান এবং দর্শনার্থীর সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে।










