অধ্যাপককে ইউনূসকে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল সমাজের ‘নিচের দিকের জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করার জন্য’। তখন অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এটা ভেবে যে সমাজে নিচের দিকের জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে শান্তির কী সম্পর্ক রয়েছে। যারা শান্তি ও সংঘর্ষের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের সম্পর্কে অবগত আছেন, তারা জানেন যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় শান্তি ও সংঘর্ষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিসম্প্রতি অধ্যাপক ঐন্দ্রিলা দুবে ও অধ্যাপক জুয়ান ভারগাছ এক প্রবন্ধে কলম্বিয়ার উদাহরণ টেনে দেখিয়েছেন যে বেশি শ্রমনির্ভর আইনসম্মত কর্মকাণ্ডে প্রাপ্ত আয় তুলনামূলকভাবে কম শ্রমনির্ভর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রাপ্ত আয়ের তুলনায় কম হলে শ্রমিক নিজেকে আইনসম্মত কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করেন, যা ক্রমান্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হয়। এ অবস্থা কোনো একটা সমাজে তখনই তৈরি হয়, যখন সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন কম তথা বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার বেশি থাকে। সমাজের বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে আইনসিদ্ধ কর্মকাণ্ডে শ্রমের চাহিদা ও দাম বাড়ে এবং সন্ত্রাসভিত্তিক কর্মকাণ্ড তুলনামূলকভাবে কম লাভজনক হয়। আর এভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অধ্যাপক ইউনূস কীভাবে সমাজের নিচের দিকের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন তথা বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা পালন করেছেন।
অধ্যাপক ইউনূস আশির দশকে দরিদ্র মানুষের জন্য জামানত ব্যতিরেকে কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ছোট অংকের ঋণ উদ্ভাবন করেন, যা এখন ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রো ক্রেডিট) হিসেবে পরিচিত। যদিও দেশ-বিদেশে অনেকেই দাবি করেছেন যে অধ্যাপক ইউনূসের এই উদ্ভাবনের অনেক আগেই ক্ষুদ্রঋণের প্রচলন ছিল। যেমন দাবি করা হয় যে উনিশ শতকে আয়ারল্যান্ডে ক্ষুদ্রঋণের প্রচলন ছিল। এও দাবি করা হয় যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্ষুদ্রঋণ প্রচলন করেছিলেন। তবে ক্ষুদ্রঋণের গবেষকরা দাবি করেন, অধ্যাপক ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ উনিশ শতকের আয়ারল্যান্ডের ক্ষুদ্রঋণ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষুদ্রঋণের চেয়ে ভিন্নতর।
আশির দশকের আগে আমাদের দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণের প্রধান উৎস ছিল মহাজন শ্রেণী। আর এ মহাজন শ্রেণী দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শোষণ করে গলাকাটা সুদ আদায় করার মাধ্যমে। এই সুদের হারের ব্যাপ্তি বছরে ৩৬ শতাংশ থেকে ৩৬০ শতাংশ বা তারও বেশি। অন্যদিকে জামানতযোগ্য সম্পদহীনতার কারণে দরিদ্র মানুষ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ গ্রহণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাকে ঋণ প্রদান করার সময় দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রথম ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয় ব্যাংকের নিজের দিক থেকে। আর এ সমস্যাটা হচ্ছে একজন খারাপ গ্রহীতাকে ঋণ দেয়ার জন্য নির্বাচন করা, যে পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধ করেন না। এ সমস্যা অর্থনীতিতে প্রতিকূল নির্বাচন (অ্যাডভার্স সিলেকশন) হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে একজন খারাপ ঋণগ্রহীতা ভালো ঋণগ্রহীতার বেশে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নিতে পারেন। দ্বিতীয় সমস্যাটি অর্থনীতিতে ঋণগ্রহীতার নৈতিক বিপত্তি (মোরাল হ্যাজার্ড) নামে পরিচিত। এ সমস্যা বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য তৈরি হয় এজন্য, ঋণগ্রহীতার নৈতিকতার মান দৃশ্যমান নয়। অধিকন্তু, এই নৈতিকতার মান নির্ণয়ে কোনো কার্যকরী পদ্ধতিও জানা নেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই দুই ধরনের সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ঋণের পরিমাণের চেয়ে বেশি মূল্যমানের সম্পদ জামানত হিসেবে নিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে ঋণগ্রহীতা কর্তৃক প্রদত্ত জামানত বিক্রয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ ও ঋণের সুদ আদায় করে।
মহাজনের শোষণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সুবিধা না থাকার কারণে অধ্যাপক ইউনূস জামানতবিহীন ও কিস্তিভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ প্রচলন করেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য। তিনি ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় জামানতের পরিবর্তে ‘পারস্পরিক বিশ্বাস’ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পারস্পরিক বিশ্বাস বলতে প্রথমত ঋণগ্রহীতা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থার মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস এবং দ্বিতীয়ত, ঋণগ্রহীতাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস বোঝায়। প্রথম ধরনের পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপনের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থার কর্মকতাদের ঋণগ্রহীতার ঋণের বিনিয়োগ কার্যক্রমগুলো তদারকির ওপর জোর দেন। দ্বিতীয় ধরনের পারস্পরিক বিশ্বাস অর্জনের জন্য তিনি যৌথ দায় (জয়েন্ট লায়াবিলিটি) ধারণা প্রচলন করেন। ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় সাধারণত পাঁচজন ঋণগ্রহীতাকে একটা দল গঠন করতে হয়। যৌথ দায় ধারণার অধীনে এ দলের একজন সদস্য ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে অন্য চারজন সদস্য একত্রিতভাবে ওই ঋণ পরিশোধে বাধ্য হন। এ কারণে একটা দলের সব সদস্যই নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ঋণ ব্যবহার ও পরিশোধ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, যা প্রকারান্তে একজন ঋণগ্রহীতার খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। তবে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো বর্তমানে তাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে যৌথ দায় ধারণাটির ব্যবহার অনেকাংশে বাদ দিয়েছে। যৌথ দায় ধারণা ব্যবহার ব্যতিরেকেই পারস্পরিক বিশ্বাস অর্জন তথা ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর বিকল্প পদ্ধতিগুলো তারা এরই মধ্যে উদ্ভাবন করেছে।
অধ্যাপক ইউনূসের আগে যারা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, তারা তা করেছেন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন লোকদের মধ্যে এবং তারা ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে বাধ্য করতে পারতেন। অধ্যাপক ইউনূসই প্রথম দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের নিচের দিকের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করতে হয়। তিনিই প্রথম সফলভাবে সেই সব মানুষকে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করেছেন, যাদের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং পরবর্তীতে প্রদানকৃত ঋণগুলো সফলভাবে আদায় করেছেন। আর এভাবে তিনি আমাদের দেশ তথা সারা বিশ্বের শতকোটি মানুষকে মহাজনের শোষণ থেকে রক্ষা করেছেন।
অধ্যাপক ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ প্রচলন করেছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় মূলধন জোগানের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি তথা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য। ঋণগ্রহীতাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা শীর্ষক যেসব প্রবন্ধ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ছাপা হয়েছে, তার বেশির ভাগ প্রবন্ধেই ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে আর্থসামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ক্ষুদ্রঋণের ধনাত্মক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। আর এভাবে ক্ষুদ্রঋণ জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি তথা দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়তা করেছে। তবে কিছু প্রবন্ধে ক্ষুদ্রঋণের ধনাত্মক প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে ক্ষুদ্রঋণ গ্র্রহীতাদের দারিদ্র্য দূর না করে বরং তাদের ঋণের ক্রমবর্ধমান দুষ্টচক্রে নিমজ্জিত করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর ঋণ প্রদান কার্যক্রমে প্রায় তিন কোটি সদস্য রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে নিচের দিকের জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রতি ঘরে একজন ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা রয়েছে। আশির দশকে অধ্যাপক ইউনূস উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণ এখন পৃথিবীর সব প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের উদ্ভাবক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সম্মানিত হয়েছে সারা বিশ্বে। অধ্যাপক ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজে নিচের দিকের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে তাদের আয় বৃদ্ধি তথা দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়তা করেছেন। আর এভাবে তিনি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন।
আজ অধ্যাপক ইউনূসের আশিতম জন্মদিন। এই শুভ জন্মদিনে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।
ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইক্রোফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক










