বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২০ উপলক্ষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তারা বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম দুর্বলতা হলো মিউচুয়াল ফান্ড। এটির কাঠামোও অদ্ভুত। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে এ খাতের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। ভারতে মানুষ সঞ্চয়ের জন্য ব্যাংকের পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডকে খুব গুরুত্ব দেয়। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও ভালো মুনাফা দেয়ার পাশাপাশি মানুষকে ফান্ড সম্পর্কে বুঝাতে সমর্থ হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের ফান্ডগুলো আশানুরূপ মুনাফা দিতে পারেনি। আর সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো মিউচুয়াল ফান্ড সম্পর্কে সেভাবে প্রচারও করতে পারেনি। ফলে মানুষও এদিকে বেশি আগ্রহী হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের যেসব অর্ডার আসে তার ৮১ শতাংশই আসে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কাছ থেকে। আর মোট লেনদেনের ৮৫ শতাংশই করে মিউচুয়াল ফান্ড। অথচ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনের মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অবদান খুবই কম। বর্তমানে বাজার মূলধনে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের অবদান ২ শতাংশের কম। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই বাজার মূলধনে মিউচুয়াল ফান্ডের অংশ ৫০ শতাংশেরও বেশি। সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাধারণত পুঁজিবাজারে এসেই কেউ কোম্পানির শেয়ার কেনে না। বরং তারা মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনে। ধীরে ধীরে মানুষ শেয়ার কেনার দিকে যায়। আর আমাদের দেশে মানুষ পুঁজিবাজারে এসেই শেয়ার কিনতে শুরু করে। তাই তাদের ঝুঁকি বেশি হয়, বাজারও অদক্ষ আচরণ করে। মিউচুয়াল ফান্ড সারা বিশ্বে ঝুঁকিহীন বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এলেও বাংলাদেশ এর বিপরীত চিত্র দৃশ্যমান। ফান্ডের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর সমাধান করতে হলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে তদারকির আওতায় আনতে হবে। মিউচুয়াল ফান্ডের স্বচ্ছতা, ঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য টেকসই রিটার্নের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বৈকি।
দেশে পুঁজিবাজারের বড় সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব। এখানে ব্যক্তি বিনিয়োগকারী অনেক বেশি। অথচ ম্যাচিউরড, ইমার্জিং, ফ্রন্টিয়ার মার্কেটগুলোতে ৮০ শতাংশই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। সেখানে ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নেই তা না। বরং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্রোকারেজ হাইজের ডিসক্রিশনারি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে। এজন্য আমাদের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা আনতে অডিটরদের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হলে বিএসইসির সক্ষমতা আরো বৃদ্ধির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষ জনবলের সন্নিবেশ ঘটানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আইনের সংস্কার ও বিএসইসির সাংগঠনিক কাঠামোগত রূপান্তর প্রয়োজন। উন্নয়নশীল বিশ্বের সফল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার আদলে একে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। প্রাইমারি মার্কেটে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট হতে হবে। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে কার্যকর নিয়মাবলি অনুসরণে অডিট ফার্ম ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির ভূমিকা নির্ধারণ এবং তা তদারকির জন্য যথাযথ ব্যবস্থা রাখতে নিয়মকানুনের সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশে সেকেন্ডারি বাজারে ট্রানজেকশন কস্ট বিশ্বের অনেক বাজারের চেয়ে বেশি। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে আরো স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে আরো সক্রিয় করা দরকার। তাদের বন্ড ও ডেরিভেটিভস মার্কেটকে আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোম্পানি পরিচালনায় উদ্যোক্তারা ব্যাংক ব্যতীত দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহ করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সুকুক নিয়ে আলোচনা চলছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এর আইনি কাঠামো দাঁড় করানো প্রয়োজন। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটানো দরকার। ট্রেডিং প্লাটফরম, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও রিয়েল টাইম ট্রেড নিশ্চিতের মতো অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পুঁজিবাজারকে আরো দক্ষ করে তুলতে বিএসইসি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের আরো সক্রিয় হতে হবে। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি তদারকি জোরদার ও অনিয়ম-ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত তা বন্ধে তত্পরতা দেখানো দরকার। দেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী এবং আগামী দিনের বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে স্বল্প ব্যয়ে মূলধন সংগ্রহের বাজারে পরিণত করা না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া, মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রভৃতি লক্ষ্য অর্জন করতে হলে স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই।










