জর্জ সান্তায়ানার বিখ্যাত উক্তি, ‘যারা অতীতকে স্মরণ রাখতে পারে না তারা সেটা পুনরাবৃত্তির জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়’, কিন্তু আমার একটি অনুসিদ্ধান্ত রয়েছে, যারা অতীতকে ভুলভাবে স্মরণ করে তারাই ইতিহাসকে ভুলভাবে পাঠ করে ভুলের দিকে পরিচালিত হয়। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের বর্তমান নীতির দৈন্যদশাকে উল্লেখ করা যেতে পারে। আশির দশকের গোড়ার দিকে সাবেক চেয়ারম্যান পল ভলকার এবং ফেডারেল রিজার্ভ যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল সেটা এখনকার সময়ের সংকটের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। আপনারা যদি সমান্তরাল শব্দটি নেন তাহলে সেটার মর্মার্থ হলো মূল্যস্ফীতি কমাতে উচ্চ সুদের হার, প্রচুর কষ্ট সহ্য এবং সম্ভবত গভীর মন্দা দেখার প্রয়োজন হবে আমাদের। নিশ্চিতভাবে বললে সমান্তরাল আসলেই রয়েছে। গত ১৮ মাস বা তারও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি পল ভলকারের যুগের পর থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। দ্রব্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধির কারণে জনসাধারণ ব্যাপকভাবে সমস্যার মুখোমুখি, পরিস্থিতি তখনকার মতোই যখন মূল্যস্ফীতি যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে আমাদের সামনে উঠে এসেছিল। খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের উচ্চ দাম ও প্রতিকূল সরবরাহের ধাক্কায় সত্তর এবং আশির দশকের গোড়ার দিকে অর্থনীতি দিশেহারা হয়ে পড়ে। তবে পল ভলকারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় বর্তমান ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের কাজগুলোয় পার্থক্যের চেয়ে সাজুয্য অনেক বেশি। আসুন প্রথমত যা সুস্পষ্ট কিন্তু বহু-উপেক্ষিত বটে সেই সত্য দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের আজকের মূল্যস্ফীতি সমস্যা তুলনামূলক খুব সম্প্রতি কেবল ২০২১ সালের বসন্তে দেখা গিয়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতেও ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ, কিন্তু মে মাসের মধ্যে তা ৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। এর বিপরীতে ১৯৭৯ সালের আগস্টে পল ভলকার যখন ফেডারেল রিজার্ভের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয়। তিনি যখন অফিসের দায়িত্ব বুঝে নেন তখন মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ১৯৭৩ সালের এপ্রিল থেকে ৫ শতাংশের ওপরে এবং ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৮ শতাংশেরও বেশি ছিল। মূলত উচ্চমূল্যস্ফীতি আমেরিকানদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং জনপ্রিয় বিদ্যমান মনস্তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ততা হয়েছিল। জরিপে দেখা যায়, মানুষ ধরেই নিয়েছিল ৮-১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত থাকবে। এটি আমাদেরকে নিয়ে আসে দ্বিতীয় বড় প্রশ্নের কাছে। বর্তমানে প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতিকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ধরে রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতিতে প্রায় কাছাকাছি সামঞ্জস্য ধরে রাখা হয়েছে যেমনটি ফেডারেল রিজার্ভে নির্ধারিত ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। অবশ্য এটা সত্য, প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশেরও বেশি। জনগণ দেখতে পাচ্ছে মূল্যস্ফীতি এখন ঊর্ধ্বমুখী। তবে আগামী পাঁচ বা দশ বছরের ভেতরে এটি ২-৩ শতাংশের পরিসীমার মধ্যে থাকবে। এটি বেশ অর্থবহ, তার কারণ হলো মূলত মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাগুলো অনুবিদ্ধ হয়—মজুরি, সুদের হার এবং পারিবারিক ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে। মূল্যস্ফীতি একবার বেড়ে গেলে তখন সেটা নিচে নামিয়ে আনা বেশ কঠিন, যেমনটি ১৯৭৯ সালে পল ভলকারের সময় হয়েছিল। অন্তত এখনকার ক্ষেত্রে জেরোম পাওয়েলকে এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে জেরোম পাওয়েল এবং পল ভলকার মূল্যস্ফীতি কমাতে প্রচারাভিযান শুরু করে। ১৯৭৯ সালের আগস্টে পল ভলকারের মেয়াদের শুরুতে মার্কিন বেকারত্বের হার ছিল ৬ শতাংশ, যা খুব খারাপ ছিল না। তবে ১৯৮০ সালের মে মাসের মধ্যে এসে স্বল্প ও তীব্র মন্দা দেখা দেয়ার কারণে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। জেরোম পাওয়েলের অধীনে ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালক্ষেপণ করে আসছিল, যার জন্য সবাই তার সমালোচনা করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত যখন সুদের হার বাড়ানো শুরু হয় তখন ২০২২ সালের মার্চ মাসে বেকারত্বের হার কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক হার অনুসারে নতুন বেতন-ভাতাভিত্তিক চাকরি তৈরি হচ্ছে প্রতি মাসে পাঁচ লাখের অধিক। এ সংখ্যা পর্যালোচনা করে বলা যায়, বেকারত্বের হার স্থির রাখার জন্য প্রয়োজন প্রতি মাসে সাড়ে সাত লাখ থেকে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালের মার্চ মাসেও একটি শক্তিশালী এবং ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজার ছিল।
কঠোর আর্থিক নীতির কারণে কর্মসংস্থান তৈরি শূন্য থেকে এক লাখের কোটায় নেমে এসেছে এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে চাইলে দক্ষতা ও ভাগ্য উভয়েরই সহায়তার প্রয়োজন হবে। পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলবেন, জেরোম পাওয়েল এবং তার সহকর্মীরা একটি অর্থনৈতিক সফট ল্যান্ডিং অর্জন করেছেন। তবে পল ভলকারকে এমন কোনো বিলাসিতার সুবিধা দেয়া হয়নি। পরিশেষে পল ভলকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছিলেন। জেরোম পাওয়েলের ফেডারেল রিজার্ভ মূল দৃষ্টি দিয়েছে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় মূল্যসূচকের (পিসিই) মূল্যস্ফীতি হ্রাসে, যা গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ফেডারেল রিজার্ভ এ সংখ্যাটি ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে আগ্রহী। এটি কোনো সাধারণ কাজ নয়। সাপ্লাই চেইনের বাধা কিছুটা কমার ফলে ফেডারেল রিজার্ভ সরবরাহের দিক থেকে কিছু সুবিধা পাচ্ছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
অ্যালান এস. ব্লাইন্ডার: প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগের অধ্যাপক, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান (১৯৯৪-৯৬)
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: মো. আবিদ মঈন খান










