‘ই-কমার্স’ শব্দটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠেছে এক দশকের কিছু বেশি সময় ধরে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিশ্বে এ শব্দটির ব্যবহার ও তাত্পর্যকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই; বরং যতই দিন গড়াচ্ছে, ই-কমার্স আমাদের সর্বাঙ্গীণ চাহিদার সঙ্গে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিচ্ছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিক কমার্স বা ই-কমার্স আধুনিক সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ দিচ্ছে, যার চিত্র আমরা আশপাশে একটু চোখ বোলালেই দেখতে পাই।

বাংলাদেশেও এখন আমরা ই-কমার্সের ইতিবাচক দিকগুলো উপভোগ করতে পারছি। যেকোনো সময় যেকোনো জায়গা থেকে আঙুলের কয়েকটি ট্যাপে বা মাউসের ক্লিকে আমাদের জন্য হাজির হচ্ছে সুস্বাদু কোনো খাবার কিংবা পছন্দের কোনো পোশাক, পছন্দের পণ্য আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সি বা মোটরসাইকেল। গৃহস্থালির কাজে সহায়তার জন্য কর্মী, ভারী পণ্য দ্রুত পরিবহন করতে পিকআপ-ট্রাক কিংবা মহামারীকালে ঘরে বসে পড়াশোনায় সহায়তার জন্য অনলাইন টিউটোরিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্সের ছোঁয়ায় এখন এর সবই এসে গেছে আমাদের হাতের মুঠোয়। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালে দেশের ই-কমার্স বাজার দেশীয় মুদ্রায় ১৭ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়, ২০২১ সালে যা ৭০ বিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে বলে অনুমান করা হয়েছে। করোনার বৈশ্বিক মহামারীর প্রভাব বিবেচনা করে এবং দেশে ই-কমার্সের জনপ্রিয়তা ও বিনিয়োগের হার পর্যবেক্ষণ করে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খাতটি একটি পূর্ণাঙ্গ লাভজনক অবস্থানে পৌঁছে যেতে সক্ষম। দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের জন্য ই-কমার্স তাই এখন রীতিমতো এক উজ্জ্বল আশার আলো।

কিছুটা ধীর লয়ে হলেও আমাদের চারপাশে এখন একটি ই-কমার্স ইকোসিস্টেম তৈরি হচ্ছে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন পেশার লাখো মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ একটি অন্যটির সহায়ক শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা তাদের গতানুগতিক মানসিকতার গন্ডি পেরিয়ে অনলাইনে সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারছেন, অন্যদিকে ক্রেতারাও তাদের শত ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মেলাতে অনলাইনভিত্তিক সুবিধাগুলোকেই প্রাধান্য দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ কোটিরও বেশি সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন এবং অতীত পরিসংখ্যানের ধারা থেকে এটি স্পষ্ট যে ভবিষ্যতে এ সংখ্যা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং দেশের মানুষকেও যে পরিবর্তনশীল সময় এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের চাহিদা ও মানসিকতার সঙ্গে খাপ খাইতে নিতে হবে, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

এখানেই আলোচনায় আসে দেশের ই-কমার্সের ভিত্তি মজবুত করে তোলা এবং এ খাতে প্রবৃদ্ধির সূচক উন্নয়নে কারা, কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন? ২৪০টিরও বেশি দেশে সক্রিয় বিশ্বের অন্যতম সফল ও লাভজনক ই-কমার্স নির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘আলিবাবা’ ২০২০ সালে প্রায় ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ই-রেভিনিউ উপার্জন করে। প্রতিষ্ঠানটির জন্য এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কর্মীর আর্থিক সচ্ছলতা এবং ৭৫০ মিলিয়নের বেশি গ্রাহকের কাছে প্রাত্যহিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠার গল্পটি একদিনে রচিত হয়নি। বিশ্বের আরেক শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘ই-বে’ও করোনাকালে ক্রেতাসাধারণের ঘরবন্দি জীবনে প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য পণ্য পৌঁছে দিয়ে স্বস্তি জুগিয়েছে, যার প্রমাণ ২০২০ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেই এর প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন। করোনার আবির্ভাবের আগে বিশ্বে অনলাইন শপিংয়ের মোট বার্ষিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি, করোনার লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের বাধ্যবাধকতার দরুন যা ২০২০-২১ সালে এসে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পৃথিবীতে আমাদের জন্য রীতিমতো আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে।

ই-কমার্সভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ কিংবা ডিজিটাল প্লাটফর্মে যুক্ত হতে সাধারণত বড় অংকের বিনিয়োগ, শক্তিশালী মানবসম্পদ কিংবা বাহারি পণ্য বা সুবিধার প্রয়োজন পড়ে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ড্রাইভার, শেফ, মিউজিশিয়ান, ডিজাইনারসহ বিভিন্ন পেশার অসংখ্য পেশাজীবী স্বাধীনভাবে অর্থাৎ ফ্রিল্যান্স কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স প্লাটফর্মে শ্রমদানের মাধ্যমে বর্তমানে জীবিকা উপার্জন করছেন। এতে একদিকে যেমন নামি ব্র্যান্ড হওয়া কিংবা পসার বিস্তার করার প্রয়োজনীয়তাকে পাশ কাটিয়ে মানুষ এককভাবে নিজের কর্মদক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে, পাশাপাশি ক্রেতা বা গ্রাহকরাও একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাজার থেকে চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী সেরাটা বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তা-ও একদম ঘরে বসেই। এ অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের ই-কমার্সে আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট হলেও বাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হতে পারে ই-কমার্সের ভবিষ্যত্মুখিতা। বর্তমানের থ্রিজি বা ফোরজি প্রযুক্তি অচিরেই রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে দ্রুতগতির ফাইভজি বা প্রস্তাবিত সিক্স জি-তে। পরিসংখ্যান বলছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমাদের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ আমাদের টেলিভিশন পর্দার আসক্তিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বড় পর্দার নিছক বিনোদনের চেয়ে হাতের তালুতে বন্দি ইনফোটেইনমেন্টকেই আমরা এখন প্রাধান্য দিতে শুরু করেছি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ক্লাউড, বিগ ডাটা ও মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তিগত পরিষেবা সামনের দিনগুলোয় ই-কমার্সের মূল ভিত্তিকে আরো দৃঢ় করে তুলবে এবং কার্যপরিসরে নবতর সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। সুতরাং এক্ষেত্রে ই-কমার্সে বিনিয়োগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

এরই মধ্যে পরিবেশবান্ধব উপাদানে তৈরি ডেলিভারি ব্যাগ ও বক্সের ব্যবহার, সেইম-ডে-ডেলিভারি অর্থাৎ ক্রয়ের দিনেই তাত্ক্ষণিক ডেলিভারি, অ্যাম্বাসেডর বা ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের দ্বারা বাজার প্রভাবিত করা, প্রত্যেক ক্রেতার চাহিদা ও পছন্দকে আলাদা করে যাচাই বা ইউজার পার্সোনালাইজিংয়ের মাধ্যমে কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে আরো আনন্দময় করে তোলাসহ অসংখ্য প্রযুক্তিভিত্তিক সুবিধার সমন্বয় ই-কমার্সকে আরো ক্রেতাবান্ধব করে তুলেছে। সেই সঙ্গে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সামাজিক ভূমিকা পালন যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাজারে গঠনমূলক সহাবস্থান তৈরি ইত্যাদি এদের আরো গ্রহণযোগ্য করেছে। যেমন দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজ বাংলাদেশের পণ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহসহ গোটা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় বিশ্বমানের অটোমেটেড ব্যাকএন্ড প্রযুক্তি দ্বারা, যার মূল চালিকাশক্তিই হলো ই-কমার্স। প্রতিষ্ঠার সাত বছরে দারাজ  একদিকে যেমন মানসম্পন্ন পণ্য ও সুবিধার সময়ানুগ সরবরাহ করে ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছে, তেমনি এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মী এবং নিজস্ব ডেলিভারি সার্ভিস ‘ডেস্ক’-র আওতায় অন্তত ১ হাজার ২০০ ডেলিভারি কর্মীর কর্মসংস্থান জুগিয়েছে। বৈশ্বিক মহামারী শুরুর দিকে চাহিদা ও জোগানের ধারায় আকস্মিক পরিবর্তন সামাল দিতে গোটা বাজার ও অর্থ ব্যবস্থা যখন হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল, তখন দারাজই সমাধান হিসেবে শতভাগ স্পর্শ ও  জীবাণুমুক্ত ডেলিভারি সার্ভিস নিয়ে আসে। অসংখ্য গ্রাহক এখনো এ সার্ভিসের মাধ্যমে ঘরে বসে সম্পূর্ণ নিরাপদে প্রয়োজনীয় যেকোনো পণ্য কিনতে পারছেন। 

ই-কমার্সের আরো একটি আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এটি তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে পারে এবং চাকরি না খুঁজে চাকরি দেয়ার মানসিকতা গঠনে সহায়তা করতে পারে। গত সাত বছরে দারাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যাদের শ্রম ও নিষ্ঠাকে গ্রাহক পর্যন্ত নিয়ে যেতে সব রকম সহায়তা দিয়েছে এই সফল ই-কমার্স প্লাটফর্ম। বিভিন্ন রকমের ডিসকাউন্ট ও লোন সুবিধা দিয়ে দারাজ দেশের অসংখ্য উঠতি ব্যবসায়ীকে যে নিদারুণ আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করেছে, ই-কমার্স খাতে ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল উদ্যোগের প্রশ্নে আলোচনায় তা সবসময়ের জন্য এক উদাহরণ হয়ে থাকবে। 

অদূরভবিষ্যতে বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী দশকটি ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির পেশাজীবী, ক্রেতাসাধারণ, তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষক—সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার বাস্তবতাই আসলে নির্ধারণ করে দেবে ভবিষ্যৎ ডিজিটাল বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা পোক্ত হতে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়, ই-কমার্সের মূল হাতিয়ার তথা ইন্টারনেট প্রযুক্তির কাঠামোগত বিকাশে গুরুত্বারোপসহ ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ—এসব বিষয়ে আমাদের এখনই মনোযোগী হতে হবে। সময়, শ্রম, ধৈর্য ও পৃষ্ঠপোষকতার মানসিকতা—এ বৈশিষ্ট্যগুলোর সফল সমন্বয়ই পারবে বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে সুবর্ণ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে।  

 

সৈয়দ মোস্তাহিদুল হক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক

দারাজ বাংলাদেশ