‘বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা

তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর

তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে

নেমে গেছে 

শুকনো রক্তের রেখা

চোখ দুটি চেয়ে আছে

সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে

চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়। ’

—লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সেই কতদিন আগে।  তারপর সময় যত গেছে, বনে—বনে চে-এর ছায়া ঘনিয়ে এসেছে।  দুই গোলার্ধে ক্রমশ গাঢ় হয়েছে তার উপস্থিতি। এমনকি তার মৃত্যুর জন্য নিজেদের অপরাধী মনে না করা যুবক-যুবতীদের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছেন আইকন, ফ্যাশনের। কোন জাদুমন্ত্রবলে রচিত হল এক কমিউনিস্ট যোদ্ধাকে নিয়ে এই আধুনিক রূপকথা? কীভাবে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন এক কিংবদন্তি, এক মিথ? সত্যি বলতে কি, তা নিয়েও তো গবেষণা হয়েছে, লেখা হয়েছে গ্রন্থ, নির্মিত হয়েছে ডকুমেন্টারি।  উঠে এসেছে নানা কারণ, পাওয়া গেছে নানা দৃষ্টিকোণ— চে-কে দেখার।  মত পাল্টে পাল্টে গেছে, কিন্তু পাল্টায়নি একটি জিনিস।  তা হলো চে-এর জনপ্রিয়তা।  পৃথিবীর নানা প্রান্তে বামপন্থার বিপর্যয় ঘটেছে, বামপন্থী সরকারগুলো অনেক জায়গায় ক্ষমতা হারিয়েছে, কিন্তু চে-কে মুছে ফেলা যায়নি।  এখনও বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং মুক্তিকামী মানুষের কাছে চে সমান প্রাসঙ্গিক।  

১৯৫৬ সালে ‘গ্রানমা’য় চড়ে যে ৮২ জন স্বাপ্নিক তরুণ কিউবাকে স্বৈরতন্ত্রের কবল থেকে মুক্ত করতে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আর্জেন্টিনার তরুণ চিকিৎসক চে গুয়েভারা।  খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি গেরিলা দলটির গুরত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। তার সাহস এবং কৌশলে সবাই মুগ্ধ। তিনি অচিরেই বিদ্রোহী দলটির পাঁচটি যুদ্ধের নেতৃত্বভার পেয়ে যান এবং কমান্ডার পদে আসীন হন। একজন চিকিৎসক থেকে গেরিলা যোদ্ধায় পরিণত হয়ে চে সবসময় শত্রুপক্ষের যোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্বশীল এবং মানবিক আচরণ করতেন।  তিনি খুব দ্রুত কিউবার বিপ্লবী মতাদর্শে দীক্ষিত হন এবং বিপ্লবের অন্যতম নায়কে পরিণত হন।  বিপ্লবের পর কিউবার পুনর্গঠনে গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।  তিনি কিউবার ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং শিল্প মন্ত্রী হিসাবে তিনি বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব বিনির্মাণ এবং প্রয়োগে নিয়োজিত হন।  তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিউবার বিপ্লবের কন্ঠস্বর হিসাবে আর্বিভূত হয়ে তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে নতুন দুনিয়া গঠনের স্বপ্ন দেখান।  ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকুতি, মানবতাবোধ, উদারতা, কথাকে কাজে পরিণত করার সামর্থ্য; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক জ্ঞানের অসাধারণ দখল ইত্যাদি বৈপ্লবিক গুনাবলী সবময়েই অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।  একজন মার্কসবাদী হিসাবে তিনি সবসময়ে উদ্ভট মতান্ধতা, চটুল মতাদর্শ এবং আমলাতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।       

পৃথিবীর অনেক বিপ্লবী তরুণদের কাছে চে গুয়েভারা কিউবান বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নায়ক, বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে গুরত্বপূর্ণ বিপ্লবীদের একজন এবং যিনি নিজের বিশ্বাসকে প্রয়োগ করতে গিয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।  অনেকেই চে’র নিজস্ব মূল্যবোধ দ্বারা তাড়িত হন, যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সততা, সাম্যবাদের প্রতি নিষ্ঠা এবং বিশ্বাসের জন্য আত্মোৎসর্গ করার দৃঢ় মনোবল।  বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদবিরোধী বিপ্লবীদের কাছে চে শুধু কেবলমাত্র র্যা ডিকাল কিংবা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন যোদ্ধা হিসাবে অনুপ্রেরণাদায়ক নয়, উপরন্তু তথাকথিত সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদী পথে চলতে থাকা পার্টিগুলোর আমলাতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একজন কঠোর সমালোচক হিসাবেও বিবেচিত।  এখানেই চে’র অনন্যতা, সেজন্যই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে তার চিন্তা এবং প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা বিদ্যমান।  

চে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কমিউনিজমের আদর্শে আকৃষ্ট হন।  তার কাছে রাষ্ট্র পরিবর্তন গুরত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এবং এই পরিবর্তনের গতিমুখ হিসাবে মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শকেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন।  কিন্তু কমিউনিস্ট হলেও তার স্বকীয়তা ছিল।  সেজন্যই তিনি তৎকালীন সোভিয়েত পার্টির সংশোধনবাদী প্রবণতাকে তিনি উপল্বদ্ধি করতে পেরেছিলেন এবং এর কঠোর সমালোচনা করতে পিছপা হননি।  তিনি যখন বিপ্লবে ভলিন্টিয়ার হিসাবে ভূমিকা রাখছেন তখন তিনি মাও সে তুং-এর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নীতিগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।  কিউবান সরকার থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তিনি সোভিয়েত পার্টিকে কঠোর সমালোচনা করেন।  তিনি উপলব্ধি করতে পারেন সোভিয়েতে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের স্থলে পার্টি একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।  তিনি সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের ধারণায় আস্থা রাখতেন।  তার সমাজতান্ত্রিক কিংবা কমিউনিজমের চিন্তায় শ্রমিকশ্রেণীর স্বশাসন প্রাধান্য পেয়েছিল।  এছাড়াও তিনি মনে করতেন সমাজতন্ত্রে যেমন বাক-স্বাধীনতা থাকতে হবে তেমনি শ্রমিক, কৃষাঙ্গ এবং মুক্তিকামী নাগরিকদের প্রাতষ্ঠানিক স্বাধীনতা থাকতে হবে।  চে’র কাছে সমাজতন্ত্রের অর্থ ছিল পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার সকল ধরনের প্রতিযোগিতা এবং পুঁজিবাদী মুনাফার অবসান।  তিনি মনে করতেন এ ব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণীর ভ্যানগার্ড কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং জনগণের অর্থনৈতিক জীবন নিয়ঢন্ত্রণ করবে।  তিনি ছিলেন অর্থনৈতিক সাম্যতা পক্ষে।  তার মতে সমাজতন্ত্রে শ্রমিকশ্রেণীর নিয়ন্ত্রণ এবং স্বব্যবস্থাপনা যেমন থাকতে হবে, তেমনি তাদের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য, স্বার্থ এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে।  এক্ষেত্রে তিনি সাম্য এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পুরনো টোক্কেভিলিয়ান বৈপরিত্যের নীতি গ্রহণের পক্ষে ছিলেন।

চে গুয়েভারা নিজেকে মার্কসবাদী হিসাবে বিবেচনা করতেন এবং মার্কসীয় চিরায়ত সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন।  কিন্তু এগুলোকে তিনি আপ্তবাক্য হিসাবে মনে করেননি, বরং তার নিজের মতো করে গ্রহণ করেছেন।  মার্কস এবং এঙ্গেলস বলেছিলেন,‘ শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি শ্রমিকশ্রেণি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ’ তারা মনে করতেন শ্রমিকশ্রেণি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে পরিণত হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে তারা নিজেদের মুক্তি ত্বরাণ্বিত করবে।  কিন্তু ১৯৫৮ সালে সিয়েরা মিয়াস্ত্রার যুদ্ধে চে দেখলেন বিপ্লবী বাহিনীর সমর্থনে শ্রমিকশ্রেণি এগিয়ে না এসে কৃষকরা এগিয়ে আসছেন।  তাদের সাহায্যে বাতিস্তার স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করা সম্ভব হলো এবং কিউবায় সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করা গেল।  পুরনো রাজনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার ক্ষেত্রে চে আত্ম-মুক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের মার্কসীয় ধারণার বিস্তৃতি ঘটাতে চেয়েছিলেন।  কিউবায় তখন যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো তা অনেকটা উপরস্থ হলেও এর জনসমর্থন ছিল ব্যাপক এবং সে ব্যবস্থায় জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গণমুখী অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা গিয়েছিল।  

চে গুয়েভারা তার তাত্ত্বিক প্রয়োগ শুধূ কিউবাতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি।  তিনি কঙ্গো এবং বলিভিয়াতেও এর প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছিলেন।  কিন্তু কঙ্গো এবং বলিভিয়ার আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় এবং এসব জায়গায় গেরিলা যুদ্ধের সাফল্যের শর্তগুলো বিবেচনা না করায় তাকে এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয়েছিল।  কঙ্গোতে কিউবান এবং কঙ্গোর নাগরিকদের সমণ্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনীর নেতৃত্ব দিলেও তিনি সেখানকার ভ্যানগার্ড পার্টির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে বিষয়গত প্রতিবন্ধকতা ছিল তার সমাধান করতে পারেননি।  বলিভিয়াতে তিনি জঙ্গি খনিশ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকা বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য পরিত্যাগ করার আহবান জানালেন এবং গণআন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করে তার গেরিলা বাহিনীতে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন।  এই দুটো ক্ষেত্রে চে গুয়েভারা কোনো কার্যকরী এবং আত্ম-মুক্তিমূলক পথের সন্ধান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এখানে তিনি গণতান্ত্রিক ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন।

চে গুয়েভারা যখন সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছিলেন তখন এ পদ্ধতি কিছু দেশের বিপ্লবী পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল।  কিন্তু এখন বিশ্ব পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যাওয়ায় এর কার্যকরিতা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।  তবে এটা সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়নি।  সেটা নির্ভর করছে আভ্যন্তরীণ আর্থ সামাজিক অবস্থা এবং ইতিহাসগত ঐতিহ্যের ওপর।  আর বিদ্যমান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শাসকশ্রেণিকে চূড়ান্তভাবে উৎখাতে জনগণের সশস্ত্র বলপ্রয়োগের তত্ত্বেরও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।  তবে এক্ষেত্রে গণ আন্দোলন এবং সংসদীয় লড়াই-এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।  এটা উপল্বদ্ধি করে লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বিপ্লবীরা জনগণের রায়কে পুঁজি করে সংসদীয় পন্থাকে বেঁছে নিয়েছে আপাত সংগ্রামের পথ হিসাবে।  বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় এ প্রবণতা বেশ কিছুদিন ধরে জনপ্রিয় হয়েছে।  ভেনিজুয়েলার হুগো চ্যাভেজ কিংবা বলিভিয়ার ইভো মোরালেস অথবা ব্রাজিলের লুলা ডি সিলভা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।  তবে এদের সবাই যে মার্কসবাদী কিংবা বিপ্লবী-এটা বলা যাবে না।  তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থেকে জাতিগত স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন।  কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই এখন সহজ হয়ে গিয়েছে।  আর লাতিন আমেরিকার এসব রাষ্ট্রে তো পুরনো ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলা হয়নি।  পাশাপাশি, প্রলেতারিয় ভ্যানগার্ড কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এটা সংঘটিত হচ্ছে না।  অধনবাদী পথে উন্নয়ন এবং তার পথ ধরে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের তত্ত্ব যে কার্যকর নয়, তা চিলির আলেন্দে, ঘানার নক্রুমা প্রমাণ করেছে।  এমনকী ব্রাজিলে লুলার সরকারের পতন, ভেনিজুয়েলার টালমাতাল রাজনৈতিক পরিস্থতি এবং ইভো মোরালেসের পদত্যাগ এ বাস্তবতাকে প্রমাণ করেছে।  তবে কিউবার জ্বলজ্বলে উপস্থিতি প্রমাণ করেছে পরিবর্তনের একমাত্র পথ মার্কসীয় মতাদর্শ এবং তার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব অপরিহার্য।  আর এখানেই চে গুয়েভারা এবং ফিদেল কাস্ত্রো নেতৃত্বাধীন সংগ্রাম লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের সকল মুক্তিকামী মানুষের কাছে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। 

লেখক: সাংবাদিক