তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাতও তৈরি পোশাক পণ্য। জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ অনেকাংশে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক খাতের ক্রমবিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুতা ও সুতা তৈরির কাঁচামাল তুলার চাহিদা। গত এক দশকেই দেশে তুলার চাহিদা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। সেই তুলনায় বাড়েনি পণ্যটির উৎপাদন। এ কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা তুলা দিয়ে পূরণ করতে হচ্ছে। চাহিদার পাশাপাশি গত এক দশকে দেশে তুলা আমদানিও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আমদানীকৃত এ তুলার বেশির ভাগ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে (একক দেশ হিসেবে)। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সবচেয়ে বেশি তুলা আমদানি করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের মোট কৃষিজমি দিয়ে মূলত খাদ্যপণ্য চাষ করা হয়। পাট ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থকরী ফসল উৎপাদন হয় না। তুলা চাষ করতে বেশ লম্বা সময়ের প্রয়োজন। তুলা ওঠা পর্যন্ত ছয় মাসের মতো অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ওই সময়ে কৃষকরা দুটি শস্য তুলে ফেলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তুলাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে সবজি ও কলার সঙ্গে। কিন্তু এত বেশি মানুষের খাদ্যের জোগান যে দেশে করতে হয়, সেখানে সেটি কঠিন বৈকি। এক্ষেত্রে তুলার উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষকের কাছে একে অধিক লাভজনক করে তোলা গেলে সুফল মিলতে পারে। বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানির চেয়েও বড় সমস্যা এর বাজার। মাঝেমধ্যেই ভারত তুলা রফতানি বন্ধ করে দেয় বা উচ্চ শুল্কারোপ করে। এতে বাংলাদেশের সুতা-কাপড় তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানসহ তৈরি পোশাক শিল্প বিপদে পড়ে। এক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায় জমি লিজ নিয়ে তুলা আবাদের সুযোগ। বাংলাদেশ থেকে কিছু উদ্যোক্তা এ কাজে আগ্রহী বলেও জানা গেছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের অনুমোদন প্রদানের অপেক্ষায়। তৈরি পোশাক শিল্পে আমাদের সম্ভাবনা অনেক বলে দাবি করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আগামী কয়েক দশকে আমাদের পণ্যের চাহিদা বাড়বে। আর এর জোগান নিশ্চিত করতে হলে তুলার সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখাটা জরুরি। তুলার ওপর একক দেশনির্ভরতা কমিয়ে আনতে বিকল্প উৎসদেশ খুঁজে বের করা এবং আফ্রিকার মতো অঞ্চলে জমি লিজ নিয়ে তুলা উৎপাদন করে তা নিয়ে আসার পরিকল্পনারও বাস্তব রূপ দেয়া আবশ্যক।
তুলার দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছিল দেশের বস্ত্র শিল্প। চীন বিশ্বের বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী দেশ। তবে বিশ্বে তুলার উৎপাদন কমে গেলে এ দেশটি আবার হয়ে পড়ে তুলার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। চীন আমদানি শুরু করলে তুলার বিশ্বভাণ্ডারে টান পড়ে। দাম বেড়ে যায় পোশাকের এ মৌলিক উপাদানের। তখন বিপাকে পড়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো। পোশাক খাতের তিনটি সংগঠনের কোনোটিকেই স্থানীয়ভাবে তুলা উৎপাদনের বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়নি। ভারত ও চীন বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় তুলা উৎপাদনকারী দেশ। আর বাংলাদেশের তুলার চাহিদার ৯৮ শতাংশই মেটাতে হয় আমদানি করে। ফলে বিশ্ববাজারে তুলার দামের হেরফের হলে পুরো বস্ত্র ও পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপন্ন হয়ে পড়ে স্পিনিং, তাঁতসহ অন্যান্য সহযোগী শিল্প।
আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে নানা আর্থিক ও রাজস্ব সুবিধার ওপর ভর করে গত তিন দশকে তৈরি পোশাক খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও স্থানীয়ভাবে তুলা উৎপাদনের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার সরবরাহ ও দামের অস্থিরতার ঢেউ এসে লাগে এ দেশের তাঁত, বস্ত্র ও পোশাক খাতে। সরকারিভাবে একটি তুলা উন্নয়ন বোর্ড রয়েছে। তবে তুলা চাষের প্রসারে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা সীমিত। সরকারি ও সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হলেও আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে তামাক চাষ বাড়াচ্ছে সিগারেট কোম্পানিগুলো। দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত হয়েও বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প এ ধরনের কোনো উদ্যোগ কখনো নেয়নি। তুলা উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মতে, দেশে তুলার যে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে তা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব নয়। তবে চাষীদের কেবল উন্নত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলেও তুলার চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশেই উৎপাদন সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা যেমন বাঁচবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত থাকতে পারবে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত।
তুলার উৎপাদন বাড়াতে উচ্চফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহনশীল জাতের উন্নয়ন, আঁশের গুণগত মানের উন্নতি সাধন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খায়, এমন লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, তুলার জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, উচ্চফলনশীল, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল এবং মানসম্পন্ন আঁশ উৎপাদনকারী জাতের উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনশীল এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের জন্য জলবায়ু অভিযোজনশীল তুলার জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এখন সময়ের দাবি।










