প্রত্নসম্পদ যেকোনো দেশ ও অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্মারক। ঐতিহাসিক গবেষণা ও জনগোষ্ঠীর চিরায়ত জীবনধারা বিশ্লেষণে এ ধরনের সম্পদের মূল্য অনেক। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অবয়বের ধারাবাহিকতা উত্তর প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কিংবা বিশ্বপরিমণ্ডলে নিজেদের স্বতন্ত্রতা তুলে ধরতে তাই প্রতিটি দেশই সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় প্রত্নসম্পদ সযত্নে আগলে রাখে। কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার পরিক্রমায় বাংলাদেশেও রয়েছে মূল্যবান বিপুল প্রত্নসম্পদ। এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সম্পদের সর্বতো সুরক্ষা জরুরি।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে দেশের নানা অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রত্নস্থল ও স্থাপনা থেকে নিয়মিত বিরতিতে প্রত্নসম্পদ চুরি হচ্ছে এবং সেগুলো বিদেশে পাচার করছে চোরাকারবারিরা। ২০১৪ সালে রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর থেকে শিব-পার্বতীর মূর্তি, একাধিক বিষ্ণুমূর্তি, সূর্যমূর্তি, বুদ্ধমূর্তি, বুদ্ধ স্তূপ, দুর্লভ টেরাকোটা, কারুকার্যখচিত প্রাচীন ইট, ৩৩টি প্রাচীন ধাতব মুদ্রাসহ মোট ১৮৫টি প্রত্নসম্পদ ও তিন হাজারের বেশি প্রাচীন প্রকাশনা খোয়া যাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। জাতীয় জাদুঘর থেকেও বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রত্নসম্পদ খোয়া গেছে। সম্প্রতি বনানীর রেস্তোরাঁয় র্যাবের অভিযানে দুর্লভ কষ্টিপাথরের হস্তনির্মিত একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা থেকে এটি পরিষ্কার যে চোরকারবারিরা থেমে নেই। এর মধ্যে খবর মিলছে চলমান করোনা মহামারীতে প্রত্নসম্পদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রগুলোর সক্রিয়তা আরো বেড়েছে। ফলে অব্যাহতভাবে চুরি হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, গত ছয় মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রত্নসম্পদই যার বড় প্রমাণ। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়াতে হবে, প্রত্নস্থলগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায়, পাচারের সময় কিছু প্রত্নসম্পদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হলেও পরবর্তী সময়ে আবার পাচার হয়ে যায়। তার মানে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও প্রত্নস্থলগুলো রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিতদের কারো কারো সঙ্গে নিশ্চয়ই পাচারকারীদের যোগসাজশ রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে চোরাকারবারিদেরও দমন করতে হবে শক্ত হাতে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্যে উঠে এসেছে, চোরাকারবারি চক্রের অনেক সদস্য গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে তাদের কেউ কেউ আবারো একই পেশায় ফিরে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, তারা মাঠ পর্যায়ের নির্দেশ বাস্তবায়নকারী মাত্র, তাদের মদদ দিচ্ছে প্রভাবশালী কোনো মহল বা চক্র। এই অন্তরালের হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

প্রত্নসম্পদ পাচারকে শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, দেখতে হবে জাতীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। উন্নত দেশগুলোয় প্রত্নসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গিই লক্ষণীয়। উন্নত দেশ দূরে থাক, আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানেও অনেকটা এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ মেলে। দেশগুলোয় প্রত্নসম্পদগুলো বিশেষ যত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, যাতে কোনোভাবে অক্ষয়িত না হয় কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয়। আবার চুরি থেকে সুরক্ষার জন্য স্থাপনাগুলোয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়। কিন্তু প্রত্ন আইন থাকলেও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত মহামূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে তেমন কার্যকর উদ্যোগ তো নেয়া হয়নি, প্রত্নস্থল ও স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সন্তোষজনক নয়। মূলত এ দুর্বলতার সুযোগই পাচারকারীরা নিচ্ছে। প্রত্নসম্পদের সুরক্ষায় এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগহীনতা, অযত্ন-অবহেলার অবসান দরকার।

সংশ্লিষ্ট আইন অনুসারে স্থাবর প্রত্নসম্পদের চারপাশের ১০০ মিটার সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকা বা কোর জোন হিসেবে গণ্য হবে। আর ২৫০ মিটার এলাকা বিশেষ সুরক্ষিত বা বাফার জোন হিসেবে গণ্য হবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কোনো বিশেষ সুরক্ষিত এলাকায় বহুতল ভবন, ইটভাটা, কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, রাস্তা নির্মাণ কিংবা কোনো ধরনের খননকাজ করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রত্নসম্পদ ধ্বংস কিংবা ক্ষতিসাধনের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অথচ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। ফলে প্রত্নস্থলগুলোর ধার ঘেঁষে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ যেমন অব্যাহত রয়েছে, আবার প্রত্নসম্পদগুলো অনেক ক্ষেত্রে ধ্বংসপ্রাপ্তও হচ্ছে। তাই কাগজ-কলমে আইন থাকলে হবে না, তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন আরো সংস্কার ও যুগোপযোগী করতে হবে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও স্থাপনায় প্রত্নসম্পদ ও নিদর্শনগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে কাজটি দ্রুত করতে হবে এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করতে হবে। কাণ্ডজ্ঞান বলে যে অপরাধীরা সবসময়ই বিশেষ সময়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। করোনা সংকটের এই বিশেষ সময়ে তাই সংস্থাটির বাড়তি নজদারি কাম্য। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতারও একটা ভূমিকা আছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতনতা থাকলে নিজেরাই নিজেদের অমূল্য সম্পদ যে রক্ষা করে, বিভিন্ন কালপর্বে এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। কাজেই জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব যত স্পষ্ট হবে, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নক্ষেত্রগুলো তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে। তাই নবীন সরকারি আমলাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের বিষয় তালিকায় প্রত্ন ঐতিহ্য ও প্রত্ন আইন সংযোজন করা চাই। কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা ও জনসাধারণের সচেতন প্রয়াসে প্রত্নসম্পদগুলো আরো সুরক্ষিত হবে বলে প্রত্যাশা।