শিল্পোন্নত জাপানের শিল্পায়নের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। পশ্চাত্সংযোগ শিল্প হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে। দেশে বিসিকের ৭৬টি শিল্পনগরী রয়েছে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ২০ হাজার একর জমিতে ৫০টি পরিবেশবান্ধব শিল্প পার্ক স্থাপনের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিসিক। শিল্পোন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্যে বিসিকের ভূমিকা তাই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে অসংখ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বড় অবদান রাখার সুযোগ আছে। কিন্তু দি ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন ফর স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস ইন এশিয়া পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, আমাদের অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান এখনো খুবই কম। মোট জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান বাংলাদেশে মাত্র ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ। ভারতে যা ৮০ শতাংশ ও চীনে ৬০ শতাংশ। আর্থিক ঝুঁকি নিতে ভয়, পরিচালনাগত সমস্যা, অর্থায়ন ও আমলাতান্ত্রিকতা—এ খাতটি সঠিকভাবে বিকশিত না হতে পারার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। গত বছর বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে গড় হিসাবে বাংলাদেশেই এসএমই খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে সীমিত পরিমাণে হয়।

সারা বিশ্বেই সিংহভাগ বড় শিল্প-কারখানার শুরু হয়েছে ক্ষুদ্র বা অতিক্ষুদ্র থেকেই। সাধারণত বৃহৎ শিল্প একদিনে গড়ে ওঠে না। একসময়ের ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্পই কালের পরিক্রমায় হয়ে ওঠে বৃহৎ শিল্প। কিন্তু এই উত্তরণের পথটা সহজ তো নয়ই, বরং অত্যন্ত দুরূহ। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল এই পথকে আরো দুরূহ করে দিয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতাকে সময়োপযোগী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, অর্থের অপ্রতুল জোগান, কঠোর নীতি ও বৈষম্যমূলক আচরণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে কঠিন করে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড অনীহা ও অবহেলা চোখে পড়ে। সাধারণত বৃহৎ শিল্প-কারখানা যেমন একদিনে গড়ে ওঠে না, তেমনি রাতারাতি অনেক শিল্প-কারখানাই রফতানিকারক হয়ে উঠতে পারে না। তাই বলে দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এ ধরনের ভাবনাজনিত বৈষম্যের শিকার। সবকিছুর পরও অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো কথা হচ্ছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এসএমই নীতি অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৪ পর্যন্ত এ নীতি বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে। সবাই অপেক্ষায় রয়েছে এই নীতির ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন দেখার জন্য।

এশিয়া অঞ্চলের অনেক দেশই প্রমাণ করেছে, এসএমই শিল্পের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপের মাধ্যমে দ্রুত জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ চীন ও ভারত। চীনের শিল্প খাতে এমএসই শিল্পের অবদান ৬০ শতাংশ। এ খাতে মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ভারতের শিল্প খাতে এসএমই খাতের অবদান ৪০ শতাংশ এবং তাদের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে ১০ কোটি ৬০ লাখ এসএমই খাতে নিয়োজিত। বাংলাদেশের শিল্প খাতে এসএমই খাতের অবদান ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। এসএমই খাতের এগিয়ে চলার পথে সমস্যাগুলো এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং এ খাতকে উৎসাহ দেয়া উচিত। বর্তমানে খাতটি বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ পূরণ করছে। সঠিকভাবে বিকশিত হলে দেশের বেকারদের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার সক্ষমতা আছে এসএমই খাতের। বিষয়টি মাথায় রেখেই আমাদের উচিত এ খাতে গবেষণা বাড়ানোসহ নীতিগত উদ্যোগ নেয়া। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। এর নেপথ্যে বেশকিছু বিষয় কাজ করে। এ ধরনের শিল্প বা উদ্যোগগুলো সমাজের পিছিয়ে পড়া, গরিব মানুষদের সামনের সারিতে নিয়ে আসে, দারিদ্র্য দূর করতে সাহায্য করে; যা সর্বোপরি ক্ষুধাভিত্তিক সমস্যার সমাধান করে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিরসনের পাশাপাশি এ শিল্পগুলো সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবন বা নতুন চিন্তাধারাকে দৃঢ়তা দেয়। সুষ্ঠুভাবে কাজ, সুস্থ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের নেপথ্যেও এ উদ্যোগগুলো সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে।

বিশ্বের বেশির ভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এসএমই কৌশলগত গুরুত্ব অধিকার করে রেখেছে। শিল্পায়নে এসএমই খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে জাপানের সফলতা বিপুল প্রশংসিত। জাপানের এসএমইগুলো সাবকন্ট্রাক্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বৃহৎ ফার্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সাবকন্ট্রাক্টিং হলো বৃহৎ ফার্ম থেকে এসএমইতে কারিগরি সহায়তা, আর্থিক সহায়তা, উপকরণ সরবরাহ, ব্যবস্থাপনাগত সহায়তা ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফার্মগুলোর মধ্যে উলম্ব সহযোগিতা স্থাপনের মাধ্যমে এসএমইগুলোর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য বা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। এসএমই খাতে এ পর্যন্ত সাধিত অগ্রগতিকে ধরে রেখে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে এসএমই খাত বিকাশের অমিত সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে পর্যাপ্ত মানবসম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের কারণে। তবে এ খাতকে গতিশীল করতে অনুকূল ও সাযুজ্যপূর্ণ নীতি পরিবেশের যথেষ্ট ঘাটতিও রয়েছে। এসএমই খাতের বিকাশকে বেগবান করার লক্ষ্যে এ খাতের সংস্থাকে এগিয়ে নিতে সঠিক কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।