[গতকালের পর]

ত্রুটিপূর্ণ বিতরণ ব্যবস্থার সমাধান হিসেবে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে কী সমাধান আসবে? মানহীন ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুতের লাইন নিয়েও ভোক্তাদের অভিযোগ বাড়ছে। কেন?

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তরল জ্বালানির বিতরণ বা সঞ্চালন বেসরকারি খাতকে দেয়ার যুক্তিটা একটা সর্বনাশা যুক্তি। কারণ এগুলো লাভজনক। গ্যাস খাত প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল, কিছু শেয়ার বাজারে ছেড়ে দেয়া হলে শেয়ারহোল্ডাররা নজরদারি করত। এ যুক্তিতে কিছু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির আংশিক শেয়ার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। তাদের লভ্যাংশ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে ভোক্তার মূল্যহারে সমন্বয়ের মাধ্যমে। মূল্যহারে ডিভিডেন্ট ও প্রফিট মার্জিন ধরা আছে। উইন্ডফল প্রফিট হয়। বছরের পর বছর তারা এভাবে লভ্যাংশ পাচ্ছেন। কোম্পানির দুর্নীতি রোধ এবং দক্ষতা ও সক্ষমতা উন্নয়নে তাদের কোনো গরজ নেই। কারণ কোম্পানির লোকসানে তাদের লভ্যাংশ প্রাপ্তিতে কোনো কমতি নেই। এরা কারা, কীভাবে ১৭ কোটি মানুষের সম্পদের মালিক এমন গুটিকয়েক ব্যক্তি হলেন, তা কারো অজানা নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ায় ভোক্তারা লাভবান হয়নি। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তার পুনরাবৃত্তি করে বিতরণ বা সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ব্যক্তি খাতে নিয়ে নেপথ্যে আবার কারা লাভবান হবেন? দুর্নীতি প্রতিরোধ না করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিকার হিসেবে জনগণের সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়ার এ উদ্যোগ সুদূরপ্রসারী এক ষড়যন্ত্র বলা যায়।

’৭০-এর দশকে পল্লী বিদ্যুতায়নে যেসব ট্রান্সফরমার ক্যাপাসিটর বসানো হতো, সেগুলো নির্ধারিত মানের সঙ্গে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে বসানো হতো। ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হতো। দুর্নীতি ছিল না বললেই চলে। আজ ট্রান্সফরমার, ক্যাপাসিটর, সুরক্ষা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে যেকোনো কিছু কেনা হচ্ছে ২০১০-এর দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন অনুসারে পিপিআর উপেক্ষা করে। বিএসটিআই ও আইএসও স্ট্যান্ডার্ড মেনে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা, তা দেখার জন্য কোথাও কেউ নেই। বিএসটিআইও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নিয়ন্ত্রণকারী এ সংস্থার বিরুদ্ধেও নানা দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়। আমি নিজে সেখানকার মান নিয়ন্ত্রণকারী কোনো এক কমিটির সদস্য। বছরে একবারের বেশি মিটিং হয় না। কোনো কোনো বছর আবার হয়ও না। সমস্যার প্রতিকারের কোনো বিষয় সেখানে আলোচনায় আসে না। অভিযোগ রয়েছে, একটা নতুন ট্রান্সফরমার দুই বছরও টিকে না। এর মানে আমরা সঠিক দাম ও সঠিক মান যাচাই-বাছাই করে পণ্য ক্রয়ের যোগ্যতা হারিয়েছি—এটাই তার প্রমাণ। বিতরণ, সঞ্চালন ও উৎপাদনে আমরা সে প্রমাণ পাচ্ছি। শুধু বিদ্যুৎ খাতে নয়, গ্যাস, কয়লা, তেল—সব জায়গাতেই একই মডেল। আমরা কত ভয়ংকর রকমের অযোগ্যতার পরিচয় দিতে পারি, অদক্ষতার পরিচয় দিয়ে আমরা কতভাবে জাতীয় অর্থ তছরুপ করতে পারি, তা শুধু বিতরণ কোম্পানিতেই প্রতিফলিত হয়েছে তা নয়, সব জায়গায় প্রতিফলন ঘটেছে। যদি এসবের ওপর কোনো দিন গবেষণা হয় তাহলে ভয়ংকর সব চিত্র বেরিয়ে আসবে। যেমন কয়লা খাতে ক্যাবের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় হয়েছে এখন সেগুলোকে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বলা হচ্ছে। আর তার সমাধান বেসরকারীকরণ! প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড আছেই এজন্য। এ এক অভিনব প্রহসন ও জাতির সঙ্গে প্রতারণা।

 

প্রি-পেইড মিটার নিয়ে জটিলতা, যেমন গ্রাহককে নিম্নমানের মিটার কিনতে বাধ্য করা, একেক স্থানে এক মিটার স্থাপন, গ্রাহকের কাছ থেকে অধিক মূল্য আদায় প্রভৃতি সমস্যা কেন উদ্ভূত হলো? এর সমাধান হবে কীভাবে?

বিদ্যুৎ মিটার নিয়ে গ্রাহক তথা ভোক্তার ভোগান্তির শেষ নেই। অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল, ডিজিটাল থেকে প্রিপেইড, প্রিপেইড থেকে স্মার্ট মিটার লাগানো চলছে। ভোক্তাদের ভোগান্তিও বাড়ছে। সেদিকে সরকারের নজর নেই। প্রতি গ্রাহক নিজ খরচে ডিজিটাল মিটার লাগিয়েছিলেন। যখন সে মিটার পরিবর্তন করে প্রি-পেইড/স্মার্ট মিটার লাগানো হলো, তখন তার আগের মিটারের মূল্য সমন্বয় ছাড়াই প্রি-পেইড মিটারের জন্য মাসপ্রতি ভাড়া রাষ্ট্রপতির আদেশের অজুহাত দেখিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ধার্য করে। এ ব্যয় যেহেতু মূল্যহারের অংশ, সেহেতু মিটার বাবদ ব্যয় রাজস্ব চাহিদায় অন্তর্ভুক্ত করে বিতরণ ইউটিলিটির মার্জিন নির্ধারিত হবে। বিষয়টি বিইআরসির এখতিয়ারভুক্ত। মিটার ভাড়া বা অন্য কোনো মাসুল নির্ধারণ করা বিদ্যুৎ বিভাগের এখতিয়ার-বহির্ভূত। এই অস্বাভাবিক ঘটনার কারণ অনুশীলনে দেখা যায়, ভোক্তা মুক্তবাজার থেকে মিটার ক্রয় করে না। তারা বিতরণ ইউটিলিটির কাছ থেকে মিটার ক্রয় করতে বাধ্য হয়। মিটারের মূল্য ও মান কোনোটাই সঠিক থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাড়তি দামে নিম্নমানের মানহীন মিটার কেনা হয়। ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। ভিন্ন ভিন্ন ঠিকাদার নানা সময়ে নানা মানের মিটার সরবরাহ করে। ফলে ভোক্তাভেদে মিটারের মান এক হয় না। মিটারভেদে বিদ্যুতের পরিমাপেও তারতম্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ক্যাব বিইআরসিতে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পায়নি।

ধরুন, লাইফ লাইন মূল্যহারের আওতাভুক্ত কোনো ভোক্তা, যিনি মাসে ১০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না; শীতে আরো কম—এ ধরনের ভোক্তার বিদ্যুতের মূল্যহার ৩ দশমিক ৭৫ টাকা। মাসে ডিমান্ড চার্জ ৩০ টাকা এবং মিটার ভাড়া ৪০ টাকা। মাসিক বিদ্যুৎ বিল ১০৭ দশমিক ৫০ টাকা। তার মূল্যহার দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭৫ টাকা। তার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাটও দিতে হয়। যিনি মাসে ১ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তার মূল্যহার ১১ দশমিক ৬৪ টাকা। ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয়ে মূল্যহার ১০ পয়সার বেশি বাড়ে না। সরকার প্রান্তিক ভোক্তাকে স্বল্প মূল্যে বিদ্যুৎ দিলেও ট্যারিফ নির্ধারণে বিভ্রান্তির কারণে ভোক্তা সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য গণশুনানিতে প্রস্তাব করা হয়েছিল। গৃহীত হয়নি। মিটার কেনা-বেচায় অসাধু ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। ইউটিলিটি অভিযুক্ত। ইউটিলিটিকে স্বার্থসংঘাত মুক্ত হতে হবে এবং মিটার শতভাগ কেনা-বেচামুক্ত বাজারে ছেড়ে দিতে হবে। সে সমস্যা সমাধানের জন্য ভোক্তাদের আরো সোচ্চার হতে হবে। পরিশেষে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার দরকার হতে পারে।

 

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ পর্যায়ে কী প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ মিলবে?

প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা আছে কিনা, তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি। এ বিদ্যুতের বাজার সৃষ্টি হয়নি। মানহীন যন্ত্রপাতির বাজার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভোক্তা সোলার হোম সিস্টেম থেকে প্রায় ৯০ টাকা মূল্যহারে নামমাত্র বিদ্যুৎ পেয়েছে এবং প্রতারণার শিকার হয়েছে। সম্প্রতি রিনিউয়েবল এনার্জি জার্নালে প্রকাশের জন্য দাখিলকৃত সৌরবিদ্যুতের ওপর ইতালির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা গবেষণা প্রবন্ধ আমি রিভিউয়ার হিসেবে মূল্যায়ন করি। তাতে দেখেছি শুধু সৌরবিদ্যুৎ থেকে কীভাবে সেখানকার একটা শহর বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে—এমন পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও পরিকল্পনাটি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও আমার কাছে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় প্রবন্ধটি ছাপার জন্য সুপারিশ করেছি। প্রবন্ধটি পাঠে আমার মধ্যে নতুন যেসব উপলব্ধি জন্মলাভ করেছে, তা থেকে বলতে পারি, ইতালির কোনো একটি জেলার বিদ্যুৎ চাহিদা আমাদের ঢাকার বিদ্যুৎ চাহিদা থেকে বেশি। সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে সে শহর বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে একমাত্র শীতের সময় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হতে পারে। কারণ বিদেশে শীতের সময় ঘরবাড়ি গরম করতে বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। আবার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও কম হয়। আমাদের দেশে শীতের সময় সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। সোলার সেচব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। গরমের সময় তীব্র সূর্যের তাপ থাকে, আলো থাকে, তখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি করা সম্ভব। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা ও নীতি আমাদের সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী হতে পারে, বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণেও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই বলব, বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ যথেষ্ট কার্যকর। বিদ্যুৎ বঞ্চিতদের সৌরবিদ্যুৎ দু’ভাবে সরবরাহ করা হয়। একটা সোলার হোম সিস্টেম। অন্যটি মিনি গ্রিড। বিচ্ছিন্ন ছোট এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং ক্ষুদ্র শিল্প ও সেচ গ্রাহককে মিনি গ্রিড দ্বারা ৩০০-৪০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ দেয়া যায়। গ্রামের জন্য এ বিদ্যুৎ একটা নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে। তবে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহে বাংলাদেশ সফট ও হার্ড স্কিল অর্জন করতে না পারায় ব্যয় কমিয়ে আনতে পারেনি। অথচ বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে অলাভজনকভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকিতে জাতীয় গ্রিড থেকে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ টেনে নেয়া হয়েছে। কাজটি সরকার জন বা জাতীয় স্বার্থে নয়, ব্যবসায়ীদের স্বার্থে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ক্ষমতা বৃদ্ধির অজুহাত তৈরি করেছে।

মূল্যহারের সমতার প্রসঙ্গে বলব, মিনি গ্রিড এলাকায় আরইবি গ্রিড বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ করায় সরকার কিছুদিন আগে ঘোষণা দিয়েছে যে মিনি গ্রিড থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কিনে নেবে। এখন এ সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? বিদ্যুতের পাইকারি বাজারে একক ক্রেতা পিডিবি অর্থাৎ সরকার। সরকার নানা দামে নানা উৎস থেকে বিদ্যুৎ কিনে ব্লেন্ডিং তথা গড় ক্রয় মূল্যহার নির্ধারণ করে। ইউটিলিটি ভেদে লাভ বা ভর্তুকিতে সে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। বর্তমানে পাইকারি বিদ্যুতের গড় ক্রয় মূল্যহার ৫ দশমিক ৭০ টাকা। বিক্রয় মল্যূহার গড়ে ৫ দশমিক ১৭ টাকা। আরইবির কাছে বিক্রি হয় ৪ দশমিক ৩৭ টাকা মূল্যহারে। মূল্যহার যখন নির্ধারিত হয় তখন ভর্তুকি ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এখন ৯ হাজার কোটি টাকা। সরকার মিনি গ্রিডের বিদ্যুৎ আরইবিকে দিয়ে ক্রয় করাতে চায়। আরইবি গ্রিড বিদ্যুৎ ক্রয় করে ভর্তুকিতে। আরইবির পক্ষে মিনি গ্রিডের বিদ্যুৎ ৩০ টাকা মূল্যহারে ক্রয় করা কি সম্ভব? বাড়তি ভর্তুকি কে দেবে? সুতরাং সরকারের মিনি গ্রিড থেকে সৌরবিদ্যুৎ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত অকার্যকর। আবার আরইবির বিদ্যুৎ মিনি গ্রিড এলাকায় আসায় সেখানে সৌরবিদ্যুতের বাজার এখন বিলুপ্ত। উদ্যোক্তারা পথে বসেছেন। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০১০ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ মিনি গ্রিড বিদ্যুতের মূল্যহার ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। আর এর সঙ্গে ৩০ টাকা ভর্তুকি থাকে। মিনি গ্রিড স্থাপনের সময়ই এ ভর্তুকি দিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় হার ৬০ টাকা। ৬০ টাকা উৎপাদন ব্যয় হার থেকে এখনো বের হয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে এসে দেখা যায়, ইডকল ওই বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে মিনি গ্রিড ভেদে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার প্রস্তাব করেছে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ টাকা দরে। যদিও গত ১২ বছরে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ৮০ শতাংশ কমেছে। ব্যক্তি খাত উদ্যোক্তাদের কাছে থেকে ৬-৭ টাকা মূল্যহারে গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়া যায়। এমন অনিয়ম ও অসংগতির কারণে সৌরবিদ্যুতের বাজার সৃষ্টি হয়নি। এর দায় কি সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারে? এসব প্রতিষ্ঠান কি জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের উপযোগী? এমন পরিস্থিতির প্রতিকারইবা কী? এসব প্রশ্নের সুরাহা তো সরকারকেই করতে হবে। 

 

নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি কোন দিকে আমাদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন?

চলমান এনার্জি ট্রানজিশনে বিশ্বব্যাপী কার্বনমুক্ত অর্থনীতি গড়ার আন্দোলন চলছে। তাতে অনবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন ট্রানজিশনাল ফুয়েল। এ ট্রানজিশনকালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ ও সমৃদ্ধ হবে এবং অনবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার অধিকাংশ দেশেই বিলুপ্ত হবে। ফলে জ্বালানি সাপ্লাই চেইনে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে। নতুন নতুন যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জামাদি বাজারে আসবে। ফসিল ফুয়েল প্রযুক্তি পরিত্যক্ত হবে এবং এ জ্বালানি সাপ্লাই চেইনে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জামাদির বাজারও লুপ্ত হবে। সেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের দক্ষ, যোগ্য ও উপযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়নের বিকল্প নেই। চলমান ট্রানজিশনে অনেক জ্বালানি আমদানিকারক দেশ রফতানিকারক দেশে পরিণত হবে। আবার রফতানিকারক দেশ আমদানিকারক দেশে পরিণত হবে। নবায়নযোগ্য কিংবা অনবায়নযোগ্য যা-ই বলি না কেন, নিজস্ব সক্ষমতায় আমরা আমাদের জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান ও উৎপাদনে অমনোযোগী। কয়লা ও গ্যাস রফতানি প্রতিরোধে মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়েছিল, শত শত কিলোমিটার লং মার্চ করতে হয়েছিল, এমনকি জীবনও দিতে হয়েছিল। অবশ্য রফতানি প্রতিরোধ হলেও সে সম্পদ জনগণের কাজে আসেনি। নিজস্ব কয়লায় চালিত ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্লান্ট ব্যাপক কয়লা সংকটে। উৎপাদন ক্ষমতা অনেকাংশই অব্যবহূত। কয়লা খনি কোম্পানি ২৫ বছরেও কয়লা উত্তোলনে একটুও সক্ষম হয়নি। দেশীয় কোম্পানির শতভাগ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্থলভাগের গ্যাস অধিক ব্যয়ে বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে উত্তোলন করা হয়। অনুসন্ধানে অমনোযোগী। কারণ আমদানীকৃত কয়লা ও এলএনজির বাজার তৈরির লক্ষ্যে সরকার একসময় আমদানীকৃত কয়লায় হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এখন এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। ফসিল ফুয়েল গ্রিড বিদ্যুতের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার তৈরিতে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। আবার ব্যক্তি খাতের এলপিজির বাজার তৈরির লক্ষ্যে আবাসিক ও পরিবহনকে কৃত্রিম গ্যাস সংকটে রাখা হয়েছে। বেশি বেশি মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। সরকারি এলপিজি কোম্পানির সক্ষমতা উন্নয়ন করা হচ্ছে না। এসব পর্যালোচনায় বলা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্বার্থসংঘাতের শিকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আরো বেশি শিকার। নইলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার কথিত সোলার হোম সিস্টেমে ৯০ টাকা এবং মিনি গ্রিডে ৬০ টাকা হতো না। স্বার্থসংঘাতের শিকার না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সরকার অবশ্যই মনোযোগী হতো। পরিবেশজনিত ব্যয় সমন্বয় না হলেও আমাদের দেশে সৌরবিদ্যুৎ যেকোনো আমদানীকৃত ফসিল ফুয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব। শুধু দরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে স্বার্থসংঘাত মুক্ত করা।

বাজার যখন কাজ করে না তখন তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজার একই সঙ্গে ব্যর্থ হয় তখন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়? 

যখন বাজার ব্যবস্থা একক কর্তৃত্বের শিকার হয়, সেখানে যদি সরকার উদ্যোক্তা থাকে, তখন সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, চরম অদক্ষ হয়ে পড়ে এবং উত্তরোত্তর ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে, বিপর্যস্ত হয়ে যায় সবকিছু, ধ্বংস আসন্ন মনে হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তা তখন বেশি বেশি মুনাফা করার পথে যায়, বাজার ব্যবস্থায় তাদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন গত বছরের তুলনায় এবার চালের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। বাজার ব্যবস্থার স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম-নীতির আওতায় কিন্তু এ দাম বাড়েনি। বেড়েছে কারণ ব্যবসায়ীরা কৌশলে দাম বাড়িয়ে নিয়েছে। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত এলপিজির মূল্যহার ব্যবসায়ীরা মানেননি। এর কারণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ব্যর্থতা এবং ভোক্তা তথা সামাজিক সক্ষমতার অভাব।

এলপিজির বাজারের ক্ষেত্রে আমরা যেটা দেখলাম—বিইআরসিকে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা তাদের মতো করে দাম নির্ধারণ করে নিতে সক্ষম। এ অবস্থায় ভোক্তাস্বার্থ কীভাবে রক্ষা হবে?

আমরা বড় ধরনের ঝুঁকি ও সংকটের জায়গায় এসে পড়েছি। প্রথমত, ব্যবসায়ীরা যদি বাজারের ওপরে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে তাহলে বাজার প্রতিযোগিতা হারায়। ব্যবসায় যোগ্যতা অর্জন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যা খুবই কম। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে একজন ব্যবসায়ী অন্যকে পাশ কাটিয়ে স্থান করে নিতে পারেন। উন্নত দেশে ব্যবসায়ীরা সরকারেরই অংশ। সরকার তাদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিদেশীরা কাজ পেতে যখন কোনো দেশে প্রস্তাব জমা দেন, তখন তাদের দূতাবাস ওই দেশের সরকারের কাছে তদবির করে। সরকার উদ্যোক্তা নয়, তাদের উদ্যোক্তা বেসরকারি খাত। তবে বেসরকারি খাত বলতে আমরা যেমনটা বুঝি তেমনটা নয়। তারা সরকারেরই একটা অংশ। সেখানে যারা চাকরি করে, তারা সরকারি চাকুরেদের মতোই সুযোগ-সুবিধা পান। অবসরে ভাতাও পান। সেখানে সেক্রেটারিরা সিদ্ধান্ত নেন না, তারা হেড ক্লার্কের মতো কাজ করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। তাদের কাছে মানুষের যাওয়ার দরকার পড়ে না। সেসব দেশে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আলাদা। সেখানে পেশাদার লোকেরা পরিকল্পনা তৈরি, নীতি প্রণয়ন, মূল্য নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় থাকেন। কারণ পেশাদারি দক্ষতা ছাড়া সেবা বা পণ্য তৈরি করা, প্রস্তুত করা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। সেখানে বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ায় জনস্বার্থে স্বচ্ছতার সঙ্গে সবকিছু হয়। আমাদের এখানে কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে এসব বিবেচনায় নেয়া হয় না। দক্ষ ও যোগ্য লোক বা উদ্যোক্তা তৈরি করা হয় না। একটা পাওয়ার প্লান্ট তৈরির ক্ষমতাও আমাদের নেই। এ অবস্থায় সব জায়গায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অদক্ষতা বাড়ে। এতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, বিপরীতে পণ্য বা সেবার মানহানি ঘটে। ফলে ভোক্তা চরমভাবে জিম্মি হয়ে পড়েন এবং বঞ্চনার শিকার হন। বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে এমন পরিস্থিতির শিকার। ইউটিলিটি পর্যায় থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত অদক্ষ ও অপেশাদার ব্যক্তিদের একক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং তারা সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তার পরিণতি হিসেবে আমরা অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও অপশাসনের শিকার। এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘লোয়াব’ এলপিজি বাজার ব্যবস্থায় এমন একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা এক অন্যতম দৃষ্টান্ত। ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষায় বাজার ব্যবস্থায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হতে হবে। সেটি ভোক্তাকেই করতে হবে। সেজন্য ভোক্তাকে প্রতিবাদী পক্ষ হিসেবে সক্ষম ও শক্তিশালী হতে হবে।

আমরা জানি, বাজারে বেশি উৎপাদনকারী থাকলে প্রতিযোগিতা হয়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দাম ঠিক থাকে। এলপিজির ক্ষেত্রে তা দেখছি না কেন?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিইআরসির আইন হওয়ার পরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বেলায় ওই আইন আর কার্যকর নেই। বিইআরসির প্রস্তাবিত তিনটা প্রবিধানমালা দ্বারা পেট্রোলিয়াম পণ্য (এলপিজিসহ) ব্যবসাকে তিনটি আলাদা ব্যবসায় বিভাজন করা হয়। কিন্তু এখানে এলপিজি ব্যবসায় লোয়াব একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৬১ সালের ওই আইনের আওতায় সরকারের কাছ থেকে তারা একটা জিও বের করে নিয়ে এখন বলছে লোয়াবের সদস্য ছাড়া আর কেউ এ খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে না। জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক নানা ধরনের নীতিমালা তৈরি করে এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করার ফলে এলপিজিতে সবার জন্য ব্যবসা উন্মুক্ত করার অনুমতি নেই। এ খাতকে লেবেল প্লেয়িং ফ্লিড করা হয়নি। আপনি যদি বাজার নিয়ন্ত্রিত পণ্য কেনাবেচা করতে চান, তাহলে সেখানে ভোক্তাদের কথা বিবেচনা করতে হবে। ভোক্তাকে জিম্মি করার সুযোগ থাকবে না এবং বিনিয়োগকারীকেও উন্মুক্ত অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তাহলেই সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। এলপিজির ক্ষেত্রে এমন অসংগতি অনেক বেশি স্পষ্ট। বিইআরসি কর্তৃক ২০০৯ সালে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণ হয়েছিল ৭০০ টাকা। ২০২১ সালের এপ্রিলে নির্ধারণ হয় ৯৭৫ টাকা। এরপর হলো ৯০৬ টাকা। বর্তমানে ৮৪২ টাকা। ব্যবসায়ীরা কোনো মূল্যহারই মানেননি। বিইআরসির আদেশ না মানা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শাস্তি অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। কোনো কারণে ভোক্তাস্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে ফৌজদারি মামলাও করা যাবে। তা বিইআরসিকেই করতে হবে। ক্যাব তাদের কাছে আবেদন করেছে। কিন্তু বিইআরসি নিষ্ক্রিয়। এদিকে মূল্যহার ব্যবসায়ীদের মনোঃপূত না হলে তারা আইন অনুযায়ী আদালতে যেতে পারেন। কিন্তু তারা যাবেন না। বরং বিইআরসিকে বাধ্য করবেন। অবশ্য ব্যবসায়ীরা তা অনেকটাই করে ফেলেছেন। আর এভাবে বিইআরসি অর্থহীন, অকার্যকর, মৃত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর মানে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা এখন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। মুনাফার রাজ্যে প্রতিযোগিতাহীন একক কর্তৃত্বসম্পন্ন বাজার ব্যবস্থায় জাতি এখন আবদ্ধ। যে বাজার যত বেশি প্রতিযোগিতাহীন, সে বাজার তত বেশি একক কর্তৃত্বসম্পন্ন এবং বেশি বেশি মুনাফালাভের সুযোগ সেখানে উন্মুক্ত। তাই বড় বড় বিনিয়োগকারীর ভিড়ও সেখানে বেশি। এলপিজির বাজার ও ব্যবসা তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার জন্য তৈরি করা সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম, বাংলাদেশের সংগঠনগুলো কেন তা পারছে না?

সুরক্ষার এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর। সে সুরক্ষায় ক্যাবের মতো সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠনগুলো প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করে। এ কাজে তারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অবদান রাখে এবং সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব পালনে সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে। অবশ্য আমাদের বেলায় বিষয়টি ভিন্ন এবং জটিল। আমাদের সরকারি সংস্থাগুলো ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় নিষ্ক্রিয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অধিকার খর্বকারীর সহায়ক শক্তি। ফলে প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য ভোক্তা সংগঠনকে আইনের আশ্রয় নিতে হয়। আবার সামাজিক সংগঠনগুলোয় স্বেচ্ছাসেবক জনবল সংকটও প্রবল। অর্থের জোগান অপ্রতুল এবং অনিশ্চিত। তাছাড়া অধিকার সুরক্ষার জন্য শুধু প্রতিষ্ঠান হলেই হয় না, সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধও থাকা দরকার। আমাদের প্রতিষ্ঠান আছে, মূল্যবোধ নেই। তাহলে পরিস্থিতি কি ভয়ংকর হতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, করোনাকালে দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা অবস্থায় নিজের বাসভবনে বসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক তার বিদায়ক্ষণে অসাধু উপায়ে ১৩৮ জনের আকস্মিক নিয়োগের ঘটনায়। এ নিয়োগ এখনো বাতিল হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিষ্ক্রিয়। বাতিলের দাবিতে কোথাও থেকেই কোনো কথা নেই। জনগণের করের টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক প্রতিষ্ঠানে এভাবে তছরুপ হয়! অথচ সামাজিক সংগঠনগুলো অতিমাত্রায় নীরব। নিয়োগপ্রাপ্তরাই বরং তাদের নিয়োগের বৈধতার দাবিতে সরব।     

সরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মূল্যবোধ সুরক্ষায় সরকারের ন্যায্য ও দৃঢ় একটি আদর্শিক অবস্থান থাকা দরকার। কিন্তু তা নেই। মূল্যবোধহীন সংস্থা বা সংগঠন ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় সক্ষম হতে পারে না। তাই তাদেরকে অন্য দেশের অনুরূপ সংস্থা বা সংগঠনের সঙ্গে তুলনা চলে না।  

 ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ; ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন; কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির ও রুহিনা ফেরদৌস