অতিসম্প্রতি
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির
অর্থনীতি বিভাগ
একটা অনলাইন
সেমিনারের আয়োজন
করে। এর
শিরোনাম সম্ভবত
বলে দেয়
সেমিনারটি কতটা
গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত
নীতিনির্ধারক মহলে:
‘Public
Policy Lessons from COVID-19 Outbreak: How to Deal with it in the Post-Pandemic
World?’ (কভিড-১৯
প্রাদুর্ভাব থেকে
জননীতিবিষয়ক সুপারিশ:
প্যানডেমিক-পরবর্তীকালে
কীভাবে এটাকে
মোকাবেলা করা
যায়?)।
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির
অর্থনীতি বিভাগের
শিক্ষক ও
গবেষক এ
কে এনামুল
হক ও
সৈয়দ এ
বাশার গলদ্ঘর্ম
এই গবেষণার
সঙ্গে সম্পৃক্ত
ছিলেন। অন্তত
আমার কাছে
মনে হয়েছে,
তাদের চমত্কার
উপস্থাপনায় পাওয়া
সেমিনারের পর্যবেক্ষণগুলো
অনেকটা ‘অন্ধজনে
দাও আলো’র
মতো; যেন
কভিড নিয়ে
গবেষণার জগতে
তীব্র অন্ধকারে
এক ঝলক
আলো, খরার
মাঝে এক
পশলা বৃষ্টির
দেখা। বস্তুত
এই মহামারীর
কার্যকারণ নিয়ে
আমরা যখন
প্রান্তিক দিগ্ভ্রান্ত
এবং শুধু
বিদেশী গবেষণার
পথ ধরে
চলছিলাম, তখন
এমনতর দেশজ
গবেষণা কিঞ্চিৎ
আশার আলো
সঞ্চার করে
বৈকি। সুড়ঙ্গের
শেষ প্রান্তে
বাতি বলে
কথা।
তাছাড়া প্রতীয়মান
হওয়ার কারণ
রয়েছে যে
করোনা নিয়ে
এ-যাবত্কাল
অর্থনীতিবিদরা যা
বলেছেন বা
বলে চলেছেন,
তা বাজেটে
অর্থ কিংবা
প্রণোদনা বরাদ্দ
ও বিতরণের
মধ্যেই সীমাবদ্ধ;
কভিড উপশমের
দাওয়াই নিয়ে
তারা অনেকটাই
নিশ্চুপ ছিলেন।
পরিসংখ্যানভিত্তিক কিছু
ফাঁকফোকর আবিষ্কার
করা ব্যতীত
এ ধরনের
আলোচনা নীতিনির্ধারণে
খুব একটা
সাহায্য করে
বলে আমার
মনে হয়
না।
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির
প্রখ্যাত প্রফেসরদ্বয়
নীতিনির্ধারকদের জন্য
এভিডেন্স বেজড
যে সুপারিশ
পেশ করেছেন,
তা এ
মুহূর্তে জাতির
জন্য অত্যন্ত
জরুরি। দ্বিতীয়ত,
গেল ছয়
মাসে মনে
হয়েছে কভিড-১৯
একমাত্র স্বাস্থ্যবিষয়ক
একটা ঘটনা
এবং স্বভাবতই
ডাক্তার আর
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
মিডিয়ায় মধ্যমণি
হিসেবে আবির্ভূত
হন। তা
ঠিক। তবে
স্বাস্থ্য দিয়ে
শুরু হলেও
অর্থনীতি, সমাজ
ও ব্যক্তি
সম্পর্ক দুমড়েমুচড়ে
দিয়ে করাল
করোনা এখন
ভয়ংকর বিপজ্জনক।
তার মধ্যেই
এনামুল হক
ও এ
বাশার প্রমাণ
করলেন যে
অর্থনীতিবিদ হয়েও
স্বাস্থ্য বিষয়ে নীতিনির্ধারণী
সুপারিশ করা
হয়েছে।
আপাতত থাক
সে কথা।
বিভাগের সভাপতি
বিভা অরণি
মল্লিকের সঞ্চালনায়
অনুষ্ঠিত ওই
সেমিনারে প্রধান
অতিথি ছিলেন
মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী
এমএ মান্নান,
বিশেষ অতিথি
হিসেবে ছিলেন
পরিকল্পনা কমিশনের
সদস্য ও
সিনিয়র সচিব
ড. শামসুল
আলম। বিশ্ববিদ্যালয়ের
সম্মানিত উপাচার্য
এমএম শহীদুল
হাসানের শুভেচ্ছা
বক্তব্য দিয়ে
শুরু হওয়া
এ সেমিনারে
আলোচক হিসেবে
ছিলেন এ
দেশের বিশিষ্ট
স্বাস্থ্য ও
অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
প্রসঙ্গত, বলে
রাখা ভালো
যে ইন্টারনেটের
গোলযোগের কারণে
অনলাইনে শ্রুত
বক্তব্যে কিছুটা
অস্পষ্টতা ছিল।
আর তাই
বক্তব্য যথাযথ
উপস্থাপনে অপারগতার
কিংবা ভুলত্রুটির
পুরো দায়ভার
গবেষকদের নয়,
এ নিবন্ধের
লেখকের ওপর
বর্তায়।
নীতিগত সুপারিশ
প্রদানে গবেষকদ্বয়
১৬৩টি দেশের
প্যানডেমিকপ্রসূত অভিজ্ঞতাজনিত
তথ্য-উপাত্ত
সংগ্রহ করেছেন।
প্রফেসরদের পরীক্ষাকৃত
হাইপোথিসিসগুলো নিম্নরূপ:
(ক) বেশি
টেস্ট মানে
বেশি আক্রান্ত;
(খ) বায়ুদূষণ
স্তর ও
কভিড বিস্তৃতির
সম্পর্ক ইতিবাচক;
(গ) জনসংখ্যা
ঘনত্ব ও
কভিডের প্রকোপ
সম্পৃক্ত; (ঘ)
সার্স ভাইরাসে
ভুক্তভোগী দেশের
অভিজ্ঞতা করোনাকালে
কাজ দিয়েছে;
(ঙ) করোনায়
ম্যালেরিয়া- নিরোধক
ওষুধের প্রভাব
রয়েছে; (চ)
নির্ভরতার হার
ও করোনার
প্রকোপ পারস্পরিক
সম্পর্ক নেতিবাচক;
(ছ) চলাচলে
বিধিনিষেধ ও
করোনার প্রকোপ
প্রশমনের ভেতর
সম্পর্ক আছে
এবং ইত্যাদি।
পর্যবেক্ষণ
এক.
গবেষকদ্বয় রিগ্রেশন
মডেল ব্যবহার
করে দেখানোর
প্রয়াস নিয়েছেন
যে বেশি
টেস্ট মানে
বেশি শনাক্ত
বা আক্রান্ত—একথা
ঠিক। তার
মানে কম
আক্রান্তের হার
দেখে আত্মতুষ্টি
লাভের কোনো
সুযোগ নেই,
হতে পারে
টেস্ট কম
হচ্ছে বলে
এই অবস্থা।
তবে দেখা
গেছে যে
২৫ গুণ
টেস্ট বাড়ালে
আক্রান্তের হার
বাড়ে মাত্র
পাঁচ গুণ!
দুই. বায়ুদূষণ
স্তরের সঙ্গে
কভিডের বিস্তার
ও ব্যাপকতার
সম্পর্ক শক্তিশালী
এবং সিগনিফিকেন্ট।
যত বেশি
বায়ুদূষণ, তত
বেশি করোনায়
আক্রান্ত হওয়ার
সম্ভাবনা রয়ে
যায়।
তিন, লকডাউন
করোনা বিস্তার
রোধে সাহায্য
করে বটে,
তবে এ
দুয়ের সম্পর্কটা,
অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে,
শক্তিশালী বা
তাত্পর্যপূর্ণ নয়।
তেমনি ম্যালেরিয়া
নিরোধক ওষুধ
করোনা নিয়ন্ত্রণে
কার্যকর, তবে
এ দুয়ের
মাঝে সম্পর্ক
ততটা শক্তিশালী
নয়।
চার. মাস্কের
ব্যবহার ও
সামাজিক দূরত্ব
নিশ্চিতভাবে করোনার
প্রকোপ কমায়।
এ বিষয়ে
বিশেষত সার্স
আক্রান্ত দেশগুলোর
অভিজ্ঞতা তা-ই
বলে। দক্ষিণ
এশিয়া তথা
সার্স ভাইরাসে
আক্রান্ত দেশগুলো
মাস্ক ও
সামাজিক দূরত্বের
ওপর ভর
করে পরিস্থিতি
সামাল দেয়ার
কসরত করেছে
এবং সন্তোষজনকভাবে
সফল হয়েছে
বলে ধারণা
করা হয়।
মনে রাখা
দরকার, মাস্ক
নিজেকে যেমন,
অন্যকেও তেমনি
সুরক্ষা দিয়ে
প্রকোপ কমায়।
পাঁচ. সর্বজনীন
স্বাস্থ্য পরিচর্যা
কভিড-১৯-এর
তীব্রতা দমনে
সক্ষম।
ছয়. বাড়িতে
থাকার সঙ্গে
আক্রান্ত হওয়ার
সম্ভাবনার সম্পর্ক
পজিটিভ কিন্তু
তাত্পর্যপূর্ণ নয়।
আগেই বলেছি
১৬৩টি দেশের
কভিডের প্রকোপ
ওঠানামার সঙ্গে
ব্যাখ্যামূলক কিছু
উপাদানের সম্পর্ক
দেখা হয়েছে।
এ উপাদানগুলো
আমাদের সবার
মাথায় সারাক্ষণ
ঘুরপাক খায়
কিন্তু ইকোনমেট্রিক
মডেল ব্যবহার
করে এর
একটা বৈজ্ঞানিক
কার্যকারণ ও
বিশ্লেষণ দাঁড়
করানোর চেষ্টা
এর আগে
করা হয়েছে
বলে মনে
পড়ছে না।
সুপারিশমালা
(ক)
বায়ুদূষণের স্তর
কমিয়ে নিচে
রেখে বায়ুদূষণ
দূর করা
জরুরি; বস্তুত
পরিবেশদূষণ, জলবায়ু
পরিবর্তন এসবই
নেতিবাচক প্রভাব
রাখে বিধায়
জনসচেতনতা ও
নিবৃত্তিমূলক কঠোর
আইনের শাসন
দরকার। (খ)
মাস্কের ব্যবহার
এবং সামাজিক
দূরত্ব রক্ষা
করার আপাতত
কোনো বিকল্প
নেই। (গ)
সর্বজনীন স্বাস্থ্য
পরিচর্যা ব্যবস্থা
শক্তিশালীকরণ সময়ের
দাবি, যা
বর্তমান ও
ভবিষ্যৎ সংকট
নিরসনে সাহায্য
করবে। (ঘ)
আপাতত বাড়িতে
বসে কাজের
সুপারিশ করা
যায়।
সম্মানিত আলোচকরা
অনেক বিষয়ের
ওপর আলোকপাত
করেন। তার
মধ্যে প্রণিধানযোগ্য
কয়েকটা হলো:
বিদ্যমান উন্নয়ন
কৌশল ও
প্রবৃদ্ধি পরিমাপে
দুর্বলতা, দক্ষিণ
এশিয়ান দেশগুলোয়
ইনফ্লুয়েঞ্জার আবির্ভাব
এবং প্রস্তুতিকরণ,
সর্বজনীন স্বাস্থ্য
ব্যবস্থায় সাংবিধানিক
বাধ্যবাধকতা ও
এর বাস্তবায়নে
অপারগতা, জিডিপির
অনুপাতে স্বাস্থ্য
খাতে কম
বরাদ্দ এবং
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়
সরকারি-বেসরকারি
বেহাল অবস্থা,
শক্ত বনাম
নরম লকডাউনের
প্রভাব ইত্যাদি।
প্রধান এবং
বিশেষ অতিথি
কভিড-১৯
নিয়ন্ত্রণে সরকারি
পদক্ষেপের বিভিন্ন
দিক তুলে
ধরে মত
দেন যে
অর্থনীতি ঘুরে
দাঁড়ানোর পথে
চলছে এবং
তারা আশা
করেন অচিরেই
কভিডের ক্ষিপ্রতা
ও বিস্তারে
উন্নতি ঘটবে।
তারা ইস্টওয়েস্ট
ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি
বিভাগকে সমকালীন
বিষয়ে গবেষণা
করে নীতিনির্ধারণী
সুপারিশ প্রদান
করে সরকারকে
সাহায্য করার
জন্য ধন্যবাদ
জানান এবং
আশা রাখেন
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও
গবেষণা নিয়ে
এগিয়ে আসবে।
সমাপনী বক্তব্য
দিয়ে সভার
সমাপ্তি টানেন
সেমিনারের সভাপতি,
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা
ও বিশিষ্ট
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ
ফরাসউদ্দিন। সবাইকে
ধন্যবাদ জানিয়ে
তিনি বলেন,
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার
বিকেন্দ্রীকরণ সময়ের
দাবি। তাছাড়া
কমিউনিটি মোবিলাইজ
করে বিরাজমান
হাজার হাজার
কমিউনিটি ক্লিনিকের
যথাযথ ব্যবহারের
মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায়
উন্নতি আনা
সম্ভব।
সেমিনারের শেষে
ড. এনামুল
হকের কাছে
আমার প্রশ্ন
ছিল, ‘বাংলাদেশের
ক্ষেত্রে শহরের
চেয়ে গ্রামে
কভিড-১৯
আক্রান্তের হার
এত কম
কেন? এটা
কি এজন্য
যে কম
টেস্ট, কম
আক্রান্ত?’
তিনি তাদের
মডেল থেকে
প্রাপ্ত ফলাফল
তুলে ধরে
‘প্যারাডক্স’টি
ব্যাখ্যা করলেন
এভাবে: গ্রামাঞ্চলে
আপাতদৃষ্টিতে প্রকোপ
কম হওয়ার
কারণ সেখানে
পরিবেশ ও
বায়ুদূষণ অপেক্ষাকৃত
কম, শহরের
তুলনায় জনঘনত্ব
কম, সামাজিক
দূরত্ব শহরের
চেয়ে বেশি।
তবুও একটা
প্রশ্ন্ন মন
থেকে যায়
না, তা
হলো: শহরের
মধ্যে বস্তির
তুলনায় বস্তির
বাইরে কভিডের
প্রকোপ বেশি
কেন?
তার কাছে
এ প্রশ্নেরও
উত্তর নিশ্চয়
আছে, তবে
অন্য একদিন
এ নিয়ে
আলোচনার আশা
রাখি।
‘ওই
আলো যে
যায় রে
দেখা...হূদয়ের
পুব-গগনে
সোনার রেখা।
এবারে ঘুচল
কি ভয়,
এবারে হবে
কি জয়?
আকাশে হল
কি ক্ষয়
কালির রেখা?’
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য










