‘কার্যক্ষেত্রে পুরুষের পরিশ্রমের মূল্য বেশি, নারীর
কাজ সস্তায় বিক্রয় হয়। নিম্নশ্রেণীর পুরুষ যে কাজ করিলে মাসে ২ টাকা বেতন পায় ঠিক
সেই কাজ স্ত্রীলোকে করিলে ১ টাকা পায়। চাকরের খোরাকী মাসিক ৩ টাকা আর চাকরানীর
খোরাকী ২ টাকা।’
আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে বেগম
রোকেয়া দুঃখের সঙ্গে কথাগুলো লিখে গেছেন। এতগুলো বছর পর অর্থনৈতিক এ বৈষম্যের
চিত্র ঠিক কতটা পরিবর্তন হয়েছে? মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করলে আদৌ পরিবর্তন হয়েছে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই
যায়।
খুব বেশি দিন নয়, মাত্র ছয়দিন আগে প্রকাশিত ‘Gender Pay Gap Statistics 2’-এর তথ্যমতে পুরুষের তুলনায় নারী গড়ে
১৬ শতাংশ কম আয় করে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইউনিভার্সিটি উইম্যান বলছে, পুরুষ
যেখানে ১ ডলার আয় করে নারী সেখানে আয় করে মাত্র ৮৪ সেন্ট। প্রশ্ন উঠতেই পারে
যোগ্যতার মাপকাঠি ছাড়া এ ধরনের তুলনা আদৌ গ্রহণযোগ্য কিনা। ইউএস সেনসাস ব্যুরো বলছে, একই ব্যাচেলর ডিগ্রি ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় একজন পুরুষ
যদি আয় করেন ১ ডলার, নারীর আয় সেখানে মাত্র ৭৪ সেন্ট। একই চাকরিতে একই পদে
প্রবেশকালেও বেতনের বৈষম্য দেখা যায়। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব কলেজ অ্যান্ড এমপ্লয়ার্সের গবেষণায় দেখা যায় নারী-পুরুষের গড় বার্ষিক
বেতনের ব্যবধান ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। পুরুষ যেখানে বার্ষিক ৬৪ হাজার ২২ ডলার উপার্জন করে, নারীর পকেটে যায় সেখানে মাত্র ৫২ হাজার ২৬৬ ডলার। পকেট বললে ভুল হবে, ফ্যাশনের হাজারটা ভোল বদল হলো কিন্তু নারীদের
পোশাকে পকেটের অবস্থান পাকাপোক্ত হলো না। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি নিরুৎসাহিত
করার কী জ্বলজ্বলে উদাহরণ!
বাংলাদেশের দিকে তাকাই দেশের অর্থনীতির
তিনটি প্রধান খাত—গার্মেন্টস, কৃষি ও রেমিট্যান্স। তিন খাতেই সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল
রাখছে সাধারণ নারীরা। এ অবদান প্রায় ২৮
শতাংশ বেড়ে যেত যদি নারীর অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ জিডিপির সংজ্ঞায় যুক্ত হতো। যেহেতু বিনিময় মূল্য নেই, সেহেতু নারীর গৃহশ্রমের
আর্থিক মূল্য নেই, এমনকি সামাজিক স্বীকৃতিও নেই। ঠিক
এ কারণেই দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপিতে তাই নারীর অবদান খুব কম চোখে পড়ে। খোদ অর্থনৈতিক
তত্ত্ব নারীর অমানুষিক পরিশ্রমের স্বীকৃতি দিতে কৃপণতা করছে। নারী যেখানে
মজুরিবিহীন কাজ করে ৬ বা ৮ ঘণ্টা, পুরুষ সেখানে করে ১ বা দু-আড়াই ঘণ্টা। একই সঙ্গে পুরুষের
তুলনায় কম মজুরিতে কারখানায় কাজ করতে হয় নারীদের। বেগম রোকেয়ার কথাতেই ফিরে যাই, ‘আমরা উপার্জন করিব
না কেন? আমাদের কি হাত নাই, পা নাই,
না বুদ্ধি নাই? কী নাই? যে
পরিশ্রম আমরা স্বামীর গৃহকর্মে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা
কি স্বাধীন ব্যবসা করিতে পারিব না?’
উত্তরটা একটু নিষ্ঠুর কিন্তু বাস্তব। শতবর্ষ
পরও আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি পেতে হিমশিম খাচ্ছি। তার কারণ প্রচলিত অর্থনীতি
নারীবান্ধব কাজের এবং আয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ ও পরিবেশ দিতে পারছে না। কর্মস্থলে মাতৃত্বকে এখনো নারীর অযোগ্যতা বিবেচনা
করা হয়। পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে নারীর সক্ষমতাও গড়ে উঠছে কম। ‘কমোডিটিজ
অ্যান্ড ক্যাপাবিলিটিজ’ প্রবন্ধে অমর্ত্য সেন বলেছেন, কাউকে কোনো
পণ্য দিলেই তার জীবনযাত্রার মান বদলে যায় না। বদলানো নির্ভর করে ওই পণ্য ব্যবহার
করার সক্ষমতা ব্যক্তির রয়েছে কিনা তার ওপর। দক্ষতার অভাবে নারী তার মেধার
তুলনায় নিচু পর্যায়ের কাজগুলোয় অংশ নেয়। অবসরকালীন সঞ্চয় ও পেনশনেও
আছে বৈষম্য। ইউএস অ্যাকাউন্টিবিলিটি অফিসের তথ্যমতে, নারীর অবসর
গ্রহণ অ্যাকাউন্টে পুরুষের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম টাকা জমা হয়। সমাজের আয়বৈষম্য
শিক্ষার অভাবেই হয়। সহস্রাব্দের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ যেসব সূচকে এগিয়ে
বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে, সেখানে নারী শিক্ষার অগ্রগতি বিশেষভাবে
সমাদৃত। জন স্টুয়ার্ট মিল, অ্যাডাম স্মিথ এবং কার্ল
মার্ক্সের মতো অর্থনীতিবিদ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই
উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। ‘মানব মূলধন’ তত্ত্বে মানব
মূলধনের ওপর যে বিনিয়োগের কথা বলা হয় সে মানবের
অর্ধেক নারী। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ।’
এ বিনিয়োগ হোক অবকাঠামোগত।
কর্মক্ষেত্রে পৃথক পরিচ্ছন্ন বাথরুম, মাতৃদুগ্ধ পান কক্ষ, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে
কেয়ার) স্থাপন, সংখ্যা বৃদ্ধি ও সুব্যবস্থাপনা—কর্মজীবী নারীর প্রতি কোনো
পক্ষপাতিত্ব নয়, এ সবকিছু তার অধিকার। এ বিনিয়োগ হোক নীতিগত। বাজেটের
জেন্ডারভিত্তিক মূল্যায়ন, বাজেটের সব পর্যায়ে জেন্ডার
দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্ভুক্তি এবং রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পুনর্বিন্যাসে জেন্ডার সমতা
রক্ষা হোক। জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট নারীর জন্য আলাদা বাজেট নয়, বিদ্যমান জাতীয় বাজেটে জেন্ডার সমতা রক্ষার জন্য নীতিমালা ও বরাদ্দ করাই
হচ্ছে জেন্ডার বাজেটিং।
বিভিন্ন দিবস উদযাপনকালে খুব জনপ্রিয়
একটি দর্শন হচ্ছে স্বীকৃতির জন্য আলাদা কোনো দিবসের প্রয়োজন নেই; প্রতিদিনই নারী
দিবস। নারীদের স্বীকৃতির বেলায় আমাদের সমাজ ব্যবস্থা কেবল উপমাসর্বস্ব। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক
পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায়
নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা। সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের তথ্যমতে,
পুরুষের ১ ডলারের বিপরীতে নারী আয় ১৯৬৩ সালে ছিল মাত্র ৫৯ সেন্ট; ২০১০ সালে ৭৭
সেন্ট, ২০২৪ সালে ৮৪ সেন্ট। বালুঘড়ির বালুর মতো এ অগ্রগতি বজায় রাখলে নারী-পুরুষ
আয় সমতায় পৌঁছতে লেগে যাবে ২০৫৬ সাল। তাই বছরের প্রতিদিন তো বটেই, নারী দিবসে আরো
জোরালোভাবে হিসাবের খাতা মিলিয়ে নিন। বেগম রোকেয়া থেকে ক্লারা জেটকিন, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির রিলে রেসের ব্যাটন এবার আপনার হাতে।
আফরিদা জিননুরাইন উর্বী: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়










