অর্থনীতি কেন পড়ব? এ প্রশ্নের থেকে অর্থনীতি কেন পড়ব না! এ বিস্ময়বোধক বাক্যটি সম্ভবত বেশি যুক্তিসংগত। আমরা অর্থনীতির মাঝেই ডুবে আছি। কুঁড়ে ঘরের সদাইকেন্দ্রিক মনোমালিন্য, টঙ দোকানের চায়ের কাপের ঝড় কিংবা ঘুমোতে যাওয়ার আগে টেলিভিশনের টক শো—অধিকাংশ আলোচনায় অর্থনীতি কোনো না কোনোভাবে জড়িত। ঘর থেকে দুই পা ফেলা দূরত্বের মাছের বাজার থেকে শেয়ারবাজার, ঘরকন্যার বাজার ফর্দ থেকে জাতীয় বাজেট—কোথায় নেই অর্থনীতি। বলা হয়ে থাকে শুধু একটি জায়গায় অর্থনীতির প্রয়োজন নেই, আর তা হচ্ছে স্বর্গ। কারণ স্বর্গে কোনো কিছুর অভাব নেই, কিন্তু এ পৃথিবীতে আমরা আসি অসীম অভাব আর সীমিত জোগানের যুদ্ধ নিয়ে। আর সে যুদ্ধের নীতিই অর্থনীতি। আর সে অর্থনীতি আমরা কম-বেশি সবাই পড়ি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থনীতিকে পাঠ্য বিষয় হিসেবে কেন বেছে নেয়া যেতে পারে তার কিছু দিক নিয়েই আজকের এ লেখা। 

আকাশের বিরামহীন বিস্তীর্ণ ডানা: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থনীতি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত এটা মানবিক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। অর্থনীতির আকাশটা সবার জন্য মুক্ত। যে আকাশে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা আর মানবিক বিভাগ সবখান থেকে আগত শিক্ষার্থীরা উড়বার সুযোগ পায় এবং এ উড়ে চলা আসলে বিরামহীন। জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় হওয়ায় আমাদের প্রতিদিন নিজের অজান্তেই নেয়া অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাখ্যা চমকে দিতে থাকবে আপনাকে। মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে পাতায় পাতায় যৌক্তিক তত্ত্ব, মজার মজার গাণিতিক সূত্র, লেখচিত্র শাণিত করবে আপনার সৃজনশীলতাকে। আপনি জানতে পারবেন আপনার দেশের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক ও দেশী বাজার, পুঁজিবাজার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে। সে সঙ্গে পুরো বিশ্ব অর্থনীতির হালচাল। অর্থনীতির আকাশ কখনো একঘেয়ে হয় না। কেননা অর্থনীতি সতত পরিবর্তনশীল। আর তাই অর্থনীতির মজাটা একবার ধরে ফেলতে পারলে আপনি নিজেই একটু একটু করে হিসাব মেলাতে পারবেন কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কীভাবে ঘুরছে দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির চাকা। 

অর্থনীতির কর্মপরিধিও বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বহুমুখী। অর্থনীতির জ্ঞান আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে গবেষক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, উন্নয়ন খাত, বিভিন্ন থিংক ট্যাংক, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তৈরি করে তুলতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে চৌকস হওয়ার কারণে আপনিও হতে পারেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কিংবা একজন ওয়ারেন বাফেট। কে বলতে পারে অদূর ভবিষ্যতে আপনার হাত ধরেই বাংলাদেশ অর্থনীতিতে নোবেল ছিনিয়ে আনবে না!   

বাংলাদেশে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করা একজন শিক্ষার্থী গবেষণা ক্ষেত্রে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আছে, যেমন—বিআইডিএস, সানেম, পিআরআই, সিপিডি, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইত্যাদি। আছে বহুজাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন— বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, আইএমএফ, ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইত্যাদি। এছাড়াও আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের পদ। সাধারণ পদগুলোর পাশাপাশি শুধু পরিসংখ্যান আর অর্থনীতিনিবিড় কিছু পদ থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, কনসালট্যান্সি ফার্ম, এনজিও, ফিন্যান্স এডভাইজার, কলেজের প্রভাষক ইত্যাদির সুযোগ তো আছেই। অর্থনীতিপড়ুয়া শিক্ষার্থী বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যেকোনো ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি খুঁজে পেতে পারে।

পথ ও পথিক: বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাড়া প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই (সরকারি ও বেসরকারি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগ হিসেবে অর্থনীতি আছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অর্থনীতি কোর্স হিসেবে পড়ানো হয়। ডিগ্রি কলেজগুলোয়ও অর্থনীতি বেশ পরিচিত বিষয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অর্থনীতিবিষয়ক স্নাতক অর্জনে সাধারণত চার বছর ও মাস্টার্স অর্জন করতে আরো এক বছর সময় প্রয়োজন হয়।

অর্থনীতিতে ভালো করতে হলে গণিতে দক্ষতা আবশ্যক। পরিসংখ্যান ও গণিতভীতি অর্থনীতিতে পড়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। আগ্রহ নিয়ে অর্থনীতি পড়লে অনেক বড় বড় সুযোগ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। অনার্স, মাস্টার্স দুটোতেই অর্থনীতি থাকলে দেশের বাইরে মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি প্রোগ্রামে স্কলারশিপ বা ওয়েভার পাওয়ার এক বিরাট সুযোগ আছে। সাধারণত সিজিপিএ আর SAT/GRE/IELTS-এর স্কোরের ওপর ভিত্তি করে স্কলারশিপ বা ওয়েভার দেয়া হয়। সচরাচর ওয়েভারে যায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী। ওয়েভারের পরিমাণটা স্কোর অনুযায়ী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী পার্থক্য হয়। ফুল ব্রাইট স্কলারশিপের সুযোগও আছে, তবে তুলনামূলক একটু কম। বিশেষত কানাডা বা উত্তর আমেরিকার দিকে এশিয়া থেকে প্রতি বছর প্রচুর ছাত্রছাত্রী পড়তে যায়। বেশ কঠিন কারিকুলাম হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শিক্ষার্থীই বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বেশ ভালো ফল করে আসছে।

বেলাশেষে: জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন, ‘অর্থনীতিবিদরা শুধুই বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং পরামর্শ দিতে পারেন। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন না।’

তাই কি? আপনি নিজেই যাচাই করে দেখতে পারেন।

তাহলে আর দেরি কেন সৃজনশীল মেধা, কৌতূহলী মন আর সুন্দর ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন যদি থেকে থাকে তবে অর্থনীতিকে নিজের পছন্দের বিষয়ের তালিকায় রাখতে পারেন। আর সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেন। অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস কিন্তু বলে গেছেন, ‘In the long run we are all dead’. তাই বেলা শেষে কিন্তু কর্মই রয়ে যাবে। সুতরাং যে বিষয়েই আমরা পড়াশোনা করি না কেন একজন ভালো মানুষ হওয়া, নিজের পেশায় সততা রেখে দেশের প্রতি কর্তব্য পালন সবচেয়ে জরুরি। 

 

আফরিদা জিননুরাইন উর্বী: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়