কভিড- ১৯ এর মাঝেই গত ১১ জুন ঘোষিত হল বাংলাদেশের ইতিহাসের সব থেকে বড় বাজেট। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রস্তাবিত এই বাজেটের পরিমাণ ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন মন্তব্য ও প্রকাশনার ভিড়ে একটি ব্যাপার বেশ চোখে পড়ার মতো। আর তা হল- কভিড-১৯ ও স্বাস্থ্যখাত সম্পর্কিত বিশেষ কোন ঘোষণার আহ্বান। এর বাইরে প্রণোদনা বিষয়ক কিছু কাজও বেশ চোখে পড়ার মতো। এই বিষয়টি নিয়েই এই লেখায় সংখ্যাতাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়ে সাদা চোখে দেখার চেষ্টা করেছি এই প্রণোদনার ফলে আসলে কী হয় অর্থনীতির।

করোনা মোকাবেলায় বিশ্ব শক্তিগুলোর ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণাই মূলত আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই প্রণোদনার স্বরূপ সম্পর্কে জানার।  

অর্থনৈতিক প্রণোদনা হল কেইনসিও অর্থনীতির ধারণার ভিত্তিতে গৃহীত নির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত, সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি যা মূলত বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক প্রণোদনা সাধারণত মন্দার সময় গৃহীত হয়ে সুদের হার হ্রাস করা, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, কুয়ান্টিটেটিভ ইজিং ইত্যাদি বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবীদ জন মেইনার্ড কেইনস এবং তার ছাত্র রিচার্ড কান এর ফিস্ক্যাল মাল্টিপ্লায়ার তত্ত্বের সাথেই মূলত অর্থনৈতিক প্রণোদনার ধারণাটি যুক্ত।

কেইনসিও অর্থনীতির মতে, মন্দা বলতে বোঝায় মূলত সামগ্রিক চাহিদার নিয়ত ঘাটতি যেখানে অর্থনীতি নিজে নিজে ঠিক হওয়ার বদলে অধিক কর্মহীনতা বা বেকারত্ব সৃষ্টি, তুলনামূলক স্বল্প উৎপাদন এবং ধীর উন্নয়নের হারের মাধ্যমে একটি নতুন সাম্যাবস্থায় পৌঁছায়। এই তত্ত্ব মতে সরকারকে মন্দা মোকাবেলায় নতুন বর্ধনশীল অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে বলা হয় যাতে করে ব্যক্তিখাতে কনজামশন কমে যাওয়াকে মোকাবেলায় এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন অর্থের যোগান সামগ্রিক চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং সাথে সাথে সঠিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। 

আর্থিক প্রণোদনা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক বর্ধন নীতির  মাঝে সাধারণত বেশ কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে যেমন আর্থিক প্রণোদনা খুবই নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা হয় যা সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হয়ে থাকে যেখানে বেশিরভাগ কার্যকরী অর্থনৈতিক প্যাকেজ দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে থাকে। ব্যক্তিখাতের সাহায্যে আর্থিক প্রণোদনা বাজারের ঘাটতি পূরণ, কর মুক্তি, নিম্ন সুদের হার অথবা নির্দিষ্ট খাতে নতুন অর্থের যোগান  দেয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী মাল্টিপ্লেয়ার ইফেক্টের সাহায্যে সরাসরি না হলেও ব্যক্তিখাতের অধিক কনজামশন এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তি খাতের উন্নয়নকে সাহায্য করে থাকে যা মূলত সার্বিক চাহিদার  উপর প্রভাব ফেলে। ব্যয় বৃদ্ধি বা হ্রাসের মাধ্যমে দেশের মোট উৎপাদনের আনুপাতিক বৃদ্ধির বা হ্রাসের নির্ণায়ককে মাল্টিপ্লেয়ার ইফেক্ট বলে। 

ব্যক্তিখাতের এই অধিক ব্যয় অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বের হতে সাহায্য করে, এমনটি মনে করে থাকে এই তত্ত্ব। মূল লক্ষ্য মূলত ব্যক্তিখাত কে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বের হয়ে আসা যা সরকারকে সাহায্য করে অন্যান্য খাতে মনোনিবেশ করতে। ঘাটতি বাজেট সহ অন্যান্য সরকারি অর্থনৈতিক কর্তন থেকে বেঁচে থাকতে এই তত্ত্ব সাহায্য করে। উল্লেখিত সরকারি নীতির মাধ্যমে অত্যধিক মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের অক্ষমতা অথবা বিভিন্ন শিল্পের জাতীয়করণের মত ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে। পরবর্তীতে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে কর আরোপের মাধ্যমে এই সরকারি প্রণোদনা অর্থের কিছু অংশ সরকারিখাতে ফেরত আনা সম্ভব। তাই দেখা যায় আর্থিক প্রণোদনা ফিস্ক্যাল পলিসি ও মনিটারি পলিসির মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি। 

রিকার্ডিয়ান ইকুইভালেন্স এবং ক্রাউডিং আউট অফ প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আর্থিক প্রণোদনা বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে বিভিন্নভাবে। আবার অনেকে মনে করেন মন্দার প্রভাব থেকে মুক্ত করার বদলে আর্থিক প্রণোদনা ব্যক্তি খাতকে আরো গভীর অর্থনৈতিক সমস্যায় নিমজ্জিত করে। 

নতুন সরকারি ব্যয় ভোক্তাদের দ্বারা এমনভাবে আত্তীকরণের শিকার হয় যে তা মূল অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো থেকে তাদের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়- এমনটাই মনে করেন ডেভিড রিকার্ডো আর আঠারো শতকের শুরুর দিকের রিকার্ডিয়ান ইকুইভালেন্সও মূলত তাই বলে। অন্যভাবে বললে রিকার্ডো মনে করেন ভোক্তাগণ বর্তমানের ব্যয় কমিয়ে দেয় ভবিষ্যতের অধিক করের ভয় যেখানে তারা বর্তমানের এই হ্রাসকৃত অর্থ পরবর্তীতে কর পরিশোধের জন্য ব্যবহার করবে বলে ধরে নেয়া হয়। যদিও তথ্যগতভাবে একে প্রমাণ করা বেশ কঠিন। 

ক্রাউডিং আউট সমালোচকদের মতে প্রণোদনা ব্যক্তিখাতে ব্যাক্তিগত বিনিয়োগ দুভাবে কমিয়ে দেয়। প্রথমত বর্ধনশীল শ্রমের চাহিদা বেতন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে যা মুনাফা অর্জনকে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত এই প্রণোদনা ঋণ হিসেবে দেওয়ার ফলে পরবর্তীতে সুদের হারের উপর এর প্রভাব পড়ে যা আবারো নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে কেননা পূর্বের ঋণ থেকে বাড়তি সুদের চাপ থেকে যায়। ভোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ফলে প্রণোদনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে ওঠে না সবসময় এমন ধারণা করাটা মনে হয় ভুল হবে না। 

রিয়েল বিজনেস সাইকেল তত্ত্বের মতে বাজারে সামঞ্জস্য আনয়ন এবং পূর্ববর্তী ঋণাত্মক অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে ফিরে আসার জন্য মন্দা একটি মাধ্যম। অস্ট্রিয়ান বিজনেস আইটেম তত্ত্বের মতে মন্দা একটি মাধ্যম যা পূর্ববর্তী ক্ষতিগ্রস্ত বাজারে ভুল  বিনিয়োগের তরলীকরণের সাহায্য করে এবং তা পুনর্বিন্যাসের সহায়তা করে যাতে করে সঠিক খাত সঠিক বিনিয়োগ লাভ করে। দুই ক্ষেত্রেই আর্থিক প্রণোদনা বাজারের স্বাভাবিক অবস্থার নিজস্ব ঠিক হবার ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই তত্ত্ব দুইটির দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে অনেক ক্ষেত্রেই যেসব খাত থেকে অর্থ  মন্দার ফলে সরে গিয়ে অন্য খাতে যুক্ত হবার কথা তা- আদতে কার্যকরী হলেও প্রণোদনার ফলে বাধাগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক  মন্দাকে আরো ত্বরান্বিত করে থাকে।

কাগজে-কলমে অনেক অর্থায়ন সফল দেখালেও বাস্তবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে তা আর সফলতার মুখ দেখতে পারে না। সময়ের স্বল্পতার কারণে খাত নির্বাচন ভুল হলে বা সঠিক সময়ের আগে বা পরে অর্থায়ন হলে পুরো অর্থায়ন অপচয় হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। আবার অনেক সময় কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক আঞ্চলিক সমস্যা নির্ণয় করা সফলভাবে সম্ভব হয়ে উঠে না। সেক্ষেত্রেও আঞ্চলিক বা দাপ্তরিক ত্রুটির ফলে অর্থায়ন সঠিক ফল দিতে না পারার সম্ভাবনা থেকেই যায়। 

হেনরি মরগেন্থু ১৯৩৯ সালের মে মাসে কংগ্রেসের সামনে দেয়া এক বক্তব্যে বলেন যে, তিরিশের মহামন্দা মোকাবেলায় বিগত আট বছরে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন যদিও বেকারত্ব পূর্বে যা ছিল এখনও তাই রয়ে গেছে। এমনকি বারাক ওবামার গৃহীত ২০০৮ পরবর্তী প্রণোদনা প্যাকেজও খুব বেশি সফলতার মুখ দেখেনি। 

প্রণোদনার মাধ্যমে অর্থের সংকুলান যখন সম্পদ উৎপাদনে ব্যর্থ হয় তখন অতিরিক্ত সরবরাহকৃত অর্থ বাজারের ভারসাম্যে সমস্যা সৃষ্টি করে। কোনরকম সম্পদ বা বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের বিপরীতে অর্থের সংকুলান না দেখিয়ে বরং ব্যাংক নোটের মাধ্যমে এই অর্থের সংকুলান অর্থনীতিতে তারল্য বৃদ্ধিতে  সহায়তা করে। এই অতিরিক্ত অর্থের যোগান মূলত কোন তলাবিহীন ঝুড়িতে নতুন করে ফল রাখার মত যেখানে ঝুড়ি ফল ধারণে সক্ষম নয় এমন অবস্থায় নতুন ফলের যোগান ঝুড়িতে সম্পদ বৃদ্ধিতে কোন ভূমিকা পালন করে না। 

সবচেয়ে বেশি যেই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে বলে মনে হয় তা হলো মুদ্রাস্ফীতি। যেকোনো বাজারেই কোন পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে তার মূল্য হ্রাস পায়। এরকম ভাবেই অর্থের যোগান বৃদ্ধি পেলে অর্থের ক্রয় ক্ষমতা কমে যায় বা অর্থের  মূল্য মানে পতন ঘটে। এই অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। 

সাধারণভাবে দেখা যায় যে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গুলোই সম্পদ উৎপাদনে অধিক ভূমিকা পালন করে থাকে যেখানে সরকার এই সম্পদের বিন্যাসে সহায়তা করে থাকে বা অন্যভাবে বললে এই সম্পদের সঠিক পরিবহন, মূল্য নির্ধারণ,  রক্ষণাবেক্ষণ ও হাতবদলের সহায়তা করে থাকে।  এই বিষয়টির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব। কিভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় তাও বিষয়টিকে শক্ত অবস্থানে থাকতে সহায়তা করে থাকে।

পণ্য লেনদেনের সময় উভয় পক্ষই যদি যা দিচ্ছে তার বদলে যা পাচ্ছে তাকে অধিক মূল্যবান মনে করে তখন সাধারণত বাণিজ্য হয়েছে বলে ধরা হয় এবং এভাবেই পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয়। তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্বের মাধ্যমেও বাজার পণ্যের মূল্য উৎপাদন করে থাকে। এই ধারণা অনুযায়ী সুযোগ ব্যয় যত কমানো যায় ততই লাভবান হওয়া যায় কোন লেনদেন থেকে।

যখন বাইরে থেকে বাজারে অর্থের যোগান দেওয়া হয় তখন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দুইটি ব্যাহত হয় এবং অর্থের মূল্যমান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় যেখান থেকে পূর্বোল্লিখিত মুদ্রাস্ফীতি সহ আরো কিছু অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হয় বলে ধারণা করা হয়। 

তাই বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণায় খুশি না হয়ে বরং কিভাবে একইসাথে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব বা অন্তত পক্ষে কিভাবে অর্থনৈতিক ধ্বস ঠেকানো সম্ভব তা নিয়ে ভাবা মনে হয় শ্রেয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়