আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি
ক্ষেত্রেই প্লাস্টিক জড়িয়ে আছে। আমাদের
টুথব্রাশ, ফ্যানের
কন্ট্রোল প্যানেল,
ওষুধ অথবা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
প্যাকেজিং—প্রতিটি
ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আছে
প্লাস্টিক। দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হলে
প্লাস্টিক রিসাইকেল বা বাতিল করে
দেয়ার আগে
একে দীর্ঘ
সময় ব্যবহার
করা উচিত।
অন্যদিকে কার্যকর
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির অভাবে স্যাশে,
কাটলারি, পণ্যের
মোড়ক ইত্যাদির মতো সিঙ্গেল-ইউজ
প্লাস্টিক পরিবেশের অনেক ক্ষতি করে।
বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যবহারের মাত্রা
প্রতিনিয়ত বেড়েই
চলেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি বেশকিছু গবেষণা হয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা
অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৪৯
টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়,
২০৫২ সালের
মধ্যে যা
বেড়ে প্রতিদিন ৪২৮ টনে গিয়ে
দাঁড়াতে পারে।
এসব বর্জ্যের মধ্যে সিঙ্গেল-ইউজ
বোতল, বাসনকোসন, স্যাশে অন্যতম। এসব
বর্জ্যের ৫৬
শতাংশই সংগ্রহ
করা হয়
না, যার
ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্য অব্যবস্থাপনায় বিশ্বের
শীর্ষ একটি
দেশে।
বর্জ্যের এমন অব্যবস্থাপনার ক্ষতিকর
প্রভাবের মধ্যে
আছে ইথিলিন
ও মিথেনের
মতো ক্ষতিকর
গ্যাস উত্পন্ন
হওয়া। ২০০৫
থেকে ২০২০
সালের মধ্যে
দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে
৩৫০ শতাংশের
বেশি। ১৭৯
টন থেকে
এ পরিমাণ
বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪৬ টনে এবং
এ ৬৪৬
টনের মধ্যে
মাত্র ৩৭
শতাংশের মতো
বর্জ্য রিসাইকেল করা হয়। অবশিষ্ট
বর্জ্য গিয়ে
পড়ে জলাশয়,
ভাগাড়, সমুদ্রসৈকত ইত্যাদি জায়গায়। এ বাতিল বর্জ্য
দেশের জলবায়ুর
ওপর ক্ষতিকর
প্রভাব ফেলছে,
যার ফলে
আমরা পুরো
পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির কারণ হচ্ছি।
উন্নত
দেশগুলোর বিশেষত
ইউরোপের বর্জ্য
ব্যবস্থাপনার চিত্রের
দিকে তাকালে
আমরা দেখতে
পাই, এসব
দেশে একটি
সবুজ কর
(গ্রিন ট্যাক্সেশন) নীতির আওতায় কোম্পানিগুলোকে তাদের বর্জ্য রিসাইকেল ও রিইউজ করার
জন্য কর
হ্রাসের মতো
প্রণোদনা দেয়া
হয়, যাতে
শিগগিরই কার্বন
নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে
পৌঁছানো যায়।
এমনকি আমাদের
প্রতিবেশী দেশ
ভারতেও সরকার
এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি (ইপিআর) বাস্তবায়ন করেছে। এ নীতির
আওতায় পোস্ট-কনজিউমার পণ্যের
শোধন ও ব্যবস্থাপনার জন্য
উৎপাদনকারীদের আর্থিক
এবং/অথবা
শারীরিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়।
এটি কোকা-কোলা ও পেপসির মতো
শীর্ষস্থানীয় পানীয়
কোম্পানিগুলোকে নীতি
মেনে চলতে
বাধ্য করেছে,
যার ফলে
কোম্পানি ও সরকার উভয়ই
উপকৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে ইপিআর চালুর জন্য
পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১৮ সালে একটি
এসআরওর (স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা/সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ) খসড়া তৈরি
করে। এই
এসআরও অনুসারে
উৎপাদকরা নিজেরা
অথবা কোনো
চুক্তিবদ্ধ তৃতীয়
পক্ষের সাহায্যে ব্যবহূত প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ করবে। এছাড়া
এনভায়রনমেন্ট ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের (ইসিসি) জন্য
আবেদন করার
সময় উৎপাদকদের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা জমা দিতে
হবে। পাশাপাশি ইসিসি নবায়নের সময়
রিসাইক্লিং ও শোধনবিষয়ক তথ্য
জমা দিতে
হবে। যদিও
এসআরও একটি
সঠিক পদক্ষেপ
ছিল, শিল্প
খাতের জন্য
এমন কোনো
নীতি এখনো
চালু করা
হয়নি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে আমরা কর
প্রণোদনা বা
এমন কোনো
নীতির প্রয়োগ
দেখতে পাই
না যা
কোম্পানিগুলোর জন্য
কিছু পরিবেশ
সচেতন নিয়ম
মেনে চলা
বাধ্যতামূলক করে।
এটি তাদের
পরিবেশ রক্ষায়
সচেতন করে
তোলে যাতে
তাদের ব্যবসা
টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
প্লাস্টিক পণ্য
উৎপাদনের ক্ষেত্রে কী ব্যবহার করা
যাবে আর
কী ব্যবহার
করা যাবে
না, সে
বিষয়ে কোম্পানি ও সংস্থাগুলোর সব
সময় পরিষ্কার ধারণা থাকে না।
নীতির বাস্তবায়নের জন্য আমাদের যথাযথ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৩০০ প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা রয়েছে যা স্ক্র্যাপ থেকে প্লাস্টিক ফ্লেকস তৈরি করে। এ ৩০০ কারখানার মধ্যে ৮০টি কারখানা বছরে ৪০ হাজার টোন ফ্লেকস রফতানি করে থাকে। এ থেকে বোঝা যায়, এ ধরনের আরো কারখানা স্থাপন করার বড় সুযোগ এ দেশে রয়েছে। এসব কারখানায় রিসাইকেলড প্যাকেজিং উৎপাদনের জন্য পেট বোতলের পাশাপাশি অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য, বিশেষত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফুড গ্রেড রিসাইকেলড পণ্যও রিসাইকেল করা যাবে।
এর জন্য পূর্বশর্ত হিসেবে দুটি জিনিস প্রয়োজন: কোম্পানির প্লাস্টিক বোতলের একটি প্রাসঙ্গিক ডিজাইনিং প্রক্রিয়া, যা নিশ্চিত করে যে তাদের উৎপাদিত প্লাস্টিক বোতলে প্লাস্টিক উপাদানের পরিমাণ কম থাকবে। বোতলের ক্যাপের আকার ছোট করা, আকৃতি পরিবর্তন করা যাতে বাতিল করা সহজ হয় ইত্যাদি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এখান থেকে কোম্পানিগুলো সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বর্জ্য সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত এনজিওর সঙ্গে পার্টনারশিপে যেতে পারে। তারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করতে পারে যাতে বর্জ্য থেকে বাতিল প্লাস্টিক আলাদা করা যায় এবং রিসাইক্লিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। এতে বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এর পরও রিসাইক্লিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করার সমস্যা রয়েই যায়। এসব যন্ত্রপাতি জোগাড় করা কঠিন এবং আমদানিতেও অনেক খরচ পড়ে যায়। এক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের অনেকটা পথ এগিয়ে নেবে।
বাংলাদেশে ইউনিলিভার, পেপসি, আকিজ
ও কোকা-কোলার ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়েস্টের মতো
উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়, তবে প্লাস্টিক দূষণের
ভয়াবহতা মোকাবেলায় শুধু এসব উদ্যোগ
যথেষ্ট নয়।
সরকারের উচিত
একটি সঠিক
কাঠামো তৈরি
করে শীর্ষ
প্লাস্টিক উৎপাদক
কোম্পানিগুলোর সঙ্গে
সহযোগিতার মাধ্যমে
নীতির বাস্তবায়ন করা।
বিশ্বজুড়ে নানা সমস্যার মধ্যেও
বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে
চলেছে। ফলে
নতুন নতুন
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে,
দেশের উন্নয়নে
ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট সবার
সঙ্গে আলোচনার
মাধ্যমে একটি
কাঠামো নির্ধারণ করা হলে তা
সরকারকে টেকসই
প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সাহায্য করবে
যা রিডিউস,
রিইউজ ও রিসাইকেল করার
থ্রিআর পদ্ধতির
ওপর ভিত্তি
করে ২০২৫
সালের মধ্যে
৫০ শতাংশ
প্লাস্টিক রিসাইকেলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ
করছে।
সুমাইয়া রশিদ: কান্ট্রি ডিরেক্টর, সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি এশিয়া বাংলাদেশ










