কভিড-১৯ মহামারী আঘাত হানার বেশ আগেই যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি মহামারী ব্যাপকভাবে চলছিল, যা ২০১৮ সালে নভেল করোনাভাইরাসের চেয়ে বেশি আমেরিকানদের হত্যা করেছিল। আমরা সেই মহামারীকে বলি ‘হতাশার মৃত্যু’। গত শতকের মধ্যে নব্বই দশক থেকে বিশেষত আত্মহত্যা, অ্যালকোহলসংক্রান্ত লিভার রোগ ও মাদকের অতিমাত্রা  গ্রহণজনিত মৃত্যু ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ ধরনের মৃত্যু ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৬৫ হাজার ছাড়িয়ে ২০১৮ সালে ১ লাখ ৫৮ হাজারে উন্নীত হয়েছে।

তবে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই হতাশার মহামারীতে মৃত্যুহার বৃদ্ধির বিষয়টি চার বছর মেয়াদি কলেজ ডিগ্রিবিহীন আমেরিকানদের মধ্যেই অনেকাংশে সীমাবদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি থাকা আমেরিকানদের সার্বিক মৃত্যুহার কমলেও স্বল্পশিক্ষিত আমেরিকানদের মৃত্যুহার বেড়েছে। জন্মসূত্রভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকেরই ২০১৪ থেকে ২০১৭—এ সময়পর্বের মধ্যে প্রত্যাশিত জীবন আয়ুষ্কাল কমেছে। আর এই হ্রাস ছিল ১৯১৮-১৯-এর স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর পরে জীবন আয়ুষ্কালে প্রথম তিন বছরের লক্ষণীয় পতন। এখন দুটি মহামারী একসঙ্গে চলছে। এ অবস্থায় জীবন আয়ুষ্কাল আবার নিম্নমুখী হতে পারে।

এসব মৃত্যু পরিসংখ্যানের পেছনে সমানভাবে অর্থনৈতিক তথ্যও নিষ্প্রভ। আমাদের বইয়ে আমরা যেমনটা তুলে ধরেছি, কলেজ ডিগ্রিবিহীন মার্কিন পুরুষদের প্রকৃত (মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত) মজুরি গত ৫০ বছরে কমেছে। একই সঙ্গে কোনো ডিগ্রি থাকাদের বিপরীতে কলেজ স্নাতকদের আর্নিংস প্রিমিয়াম বিস্ময়করভাবে ৮০ শতাংশ বেড়েছে। স্বল্পশিক্ষিত আমেরিকানদের জন্য অব্যাহতভাবে কম চাকরি থাকার কারণে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মোট শ্রমশক্তিতে কর্মক্ষম (২৫-৫৪ বছর) পুরুষের অংশ নিম্নমুখী হয়েছে, যেমনটা ২০০০ সাল থেকে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে এসেছে। স্বল্পশিক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চেয়ে শিক্ষিত আমেরিকানরা কেবল আয় নয়, স্বাস্থ্য সুফলেও (হেলথ আউটকাম) অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ডিগ্রি না থাকাদের মধ্যে যন্ত্রণা-মনোকষ্ট, একাকিত্ব ও প্রতিবন্ধিতা নিত্যকার সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কভিড-১৯ মহামারীর শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে অসম আর্থসামাজিক অবস্থা ছিল। এখন ভাইরাসটি বিদ্যমান অসমতা-বৈষম্যকে আবার নতুন করে উদোম করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে মহামারীগুলো সবসময়ই বৃহত্তর অসমতা সামনে এনেছে। সবচেয়ে কুখ্যাত ব্ল্যাক ডেথ মহামারী চৌদ্দ শতকের ইউরোপে এত লোক হত্যা করেছিল যে সেখানে ব্যাপক শ্রমিক ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা অবশ্য কর্মীদের দরকষাকষি অবস্থানের উন্নতি ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উনিশ শতকে কলেরা মহামারী রোগের জীবাণু তত্ত্ব উৎসাহিত করে মানুষের পরমায়ুতে আধুনিক বৃদ্ধির পর্যায় তৈরি করেছিল। এতে প্রথমে ধনী দেশগুলোয় গড় প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বেড়েছিল, তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাকি বিশ্বে তা বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনব্যাপ্তিতে এই দুর্দান্ত উল্লম্ফন মহারূপান্তরের পথ তৈরি করেছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র দুই প্রজন্ম ধরে গ্রেট ডাইভারজেন্সের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং কভিড-১৯ দেশটির স্বাস্থ্য ও আয়ে এরই মধ্যে থাকা বিপুল অসমতা আরো বিস্তৃত করেছে। ভাইরাসের প্রভাব শিক্ষাগত অর্জন যোগ্যতা দ্বারা বিপুলভাবে স্তরায়িত। কারণ যাদের শিক্ষা বেশি, তারা বাসা থেকে অফিসের কাজ ও উপার্জন চালিয়ে যেতে অধিক সমর্থ। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্য ফ্রন্ট লাইন সেক্টরে নিয়োজিত খুব উচ্চশিক্ষিত ও বিশেষায়িত জ্ঞানের কিছু কর্মী বাদে বাকিরা বাসায় বসে কাজ করতে পারেন এবং নিজেদের অবসরকালীন তহবিলের মূল্য আরো বাড়াতে স্টক মার্কেটে মুহূর্তেই অনলাইনের মাধ্যমে লগ্নি করতে  পারেন।

বিপরীতক্রমে, চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি থাকা দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমশক্তিই হয় অনাবশ্যক কর্মী (নন-এসেনশিয়াল), ফলে কাজ না থাকায় তারা আয় হারাচ্ছেন নতুবা আবশ্যক কর্মী (এসেনশিয়াল); ফলে বাধ্যতামূলকভাবে কর্মস্থলে গিয়ে কাজ করতে হওয়ায় তারা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। যেখানে কলেজ স্নাতকদের বেশির ভাগই তাদের স্বাস্থ্য ও সম্পদ উভয়ই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছেন, সেখানে স্বল্পশিক্ষিত কর্মীদের স্বাস্থ্য কিংবা সম্পদ কোনো একটির ঝুঁকি অবশ্যই নিতে হচ্ছে।

এ কারণে উল্লিখিত দুই জনগোষ্ঠীর আয় ও প্রত্যাশিত জীবন আয়ুষ্কালে উদোম হওয়া ব্যবধান এখন আরো বিস্তৃত হচ্ছে। তবে প্রথম মহামারীতে স্বল্পশিক্ষিত শ্বেতাঙ্গদের ওপর দিয়ে বেশি ধকল গেলেও কভিড-১৯-এ কিন্তু অসমানুপাতিকভাবে আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান ও হিস্পানিকদের প্রাণ যাচ্ছে। বলা চলে, এতে শেষোক্ত জনগোষ্ঠীই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সাদা ও কালোদের মৃত্যুহারের আগের কনভারজেন্স বিচ্যুত হয়েছে। 

পৃথক আবাসন, জনাকীর্ণভাবে বসবাসের অবস্থা ও কমিউটিং প্যাটার্নসহ এসব বর্ণগত-জাতিগত বৈষম্যের অনেক কারণ রয়েছে। যদিও এসব ফ্যাক্টর বিশেষত নিউইয়র্ক শহরে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবে সেগুলো অন্য এলাকায় খুব একটা ভূমিকা পালন করেনি। উদাহরণস্বরূপ, নিউ জার্সিতে আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান কিংবা হিস্পানিকদের মধ্যে অসমানুপাতিকভাবে কভিড-১৯ মহামারীতে মৃত্যুহার নেই।

আমেরিকার ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা চলমান মহামারীর প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই বসন্তে কয়েক মিলিয়ন চাকরি হারানো আমেরিকান নাগরিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে প্রদত্ত স্বাস্থ্য বীমাও হারিয়েছেন এবং তাদের অনেকেই বিকল্প স্বাস্থ্য সুরক্ষা (অলটারনেটিভ  হেলথ কাভারেজ) পেতেও সমর্থ হবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯-এর উপসর্গ দেখা দেয়া কাউকে কাউকে যেখানে চিকিৎসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে, সেখানে বীমার আওতায় না থাকা কর্মীরা স্বভাবতই চিকিৎসাসেবা গ্রহণে ইচ্ছুক হবেন না। এ নিবন্ধে যেমনটা বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১ লাখ ১৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে এবং দুই লাখের বেশি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেকেই সম্ভাবনাময়ভাবে মেডিকেল বিল পরিশোধে অসামর্থ্যের জন্য (এমনকি বীমা সুবিধা থাকা অনেক লোকও) দায়ী হবে, যা তাদের সারা জীবনের কৃতিত্ব বিনষ্ট করবে। ফেডারেল সরকার ওষুধ কোম্পানিগুলোকে একটি জুতসই টিকা উন্নয়নে কয়েক বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রদান করেছে এবং লবিস্টদের ধন্যবাদ যে তারা প্রাইসিং বা পেটেন্টের ওপর সরকারি দাবি আরোপবিষয়ক শর্ত যুক্ত করেনি।

অধিকন্তু, ভৌত দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ফেলার বিনিময়ে এরই মধ্যে আধিপত্যশীল হয়ে ওঠা ই-কমার্স জায়ান্টগুলোর জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে চলমান মহামারী শিল্প সংহতকরণে আরো শক্তি জোগাচ্ছে। জিডিপির শ্রম অংশ দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তনীয় ধ্রুবক হিসেবে বিবেচিত—সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পড়ে গেছে এবং পণ্য ও শ্রম উভয় বাজারের বাজারশক্তি এর একটি কারণ হতে পারে। সামনের বছরগুলোয় বেকারত্ব হার যদি বেশি থাকে, তাহলে ব্ল্যাক ডেথের সাযুজ্য উল্টিয়ে এবং বিপর্যয়ের নামে পুঁজিবাজারের আশাবাদের ন্যায্যতা প্রদান করে শ্রম ও পুঁজির মধ্যকার বাণিজ্য শর্ত এমনকি শেষোক্তটির (পড়ুন পুঁজি) দিকে আরো ধাবিত হতে বাধ্য হবে।

এটি সত্ত্বেও আমরা বিশ্বাস করি না যে কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনীতি হতাশাজনিত মৃত্যুতে বড় ধরনের উল্লম্ফন উসকে দেবে। আমাদের বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় ওই মহামারীর (হতাশার  মহামারী) মৌলিক কারণ অর্থনৈতিক দোলাচল ছিল না; বরং ছিল শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী শ্রেণীর আমেরিকানদের মধ্যে জীবনযাপনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, হতাশাজনিত মৃত্যু ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের আগে থেকে বাড়ছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব হার ৪ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ উন্নীত হয়েছিল এবং চলতি কভিড-১৯ মহামারীর আগের দিনগুলোয় ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসা পর্যন্ত বেকারত্ব হারের এই বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। অবশ্য আগে আত্মহত্যা ও বেকারত্বের মধ্যে একটি সম্পর্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে এখন তা আর দৃশ্যমান নয়।

তার পরও আগের অভিজ্ঞতা বলে যে ২০২০ সালে শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া কর্মীরা তাদের পুরো কর্মজীবনে নিম্ন আয়ের মধ্য দিয়ে যাবেন। সম্ভবত এ থেকে সৃষ্ট হতাশা তাদের মধ্যে আত্মহত্যা, অ্যালকোহল বা মাদকসংক্রান্ত মৃত্যু বাড়াবে। অন্য কথায় বলা যায়, কভিড-১৯-পরবর্তী আমেরিকা প্রাক-কভিড আমেরিকার মতো একই রকম হবে কেবল আরো অসমতা ও কর্মহীনতার দিক থেকে, অন্য কোনো দিক থেকে নয়।

সত্য হলো, পুলিশি সহিংসতা বা ব্যাপক ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবার ওপর জনরোষ একটি কাঠামোগত ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। এটি যদি ঘটে, তাহলে আমরা একটি অধিকতর ভালো সমাজের দেখা পেতে পারি। মনে রাখা চাই, ফিনিক্স পাখি সবসময় কিন্তু ছাইভস্ম থেকে উঠে আসে না।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

অ্যানি কেইস: প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ইমেরিটাস অধ্যাপক

আঙ্গাস ডিটন: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির উড্রো উইলসন স্কুল অব পাবলিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ইকোনমিকস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক ইমেরিটাস; ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির প্রেসিডেন্সিয়াল প্রফেসর 

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির