দীর্ঘ ১৫ বছর একদলীয় জোটের শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অনাস্থা, সঠিক নির্বাচন প্রক্রিয়া না থাকা, জনমনে অস্থিরতা, একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব ছিল প্রকট। দুই দফায় শেয়ারবাজার কারসাজির পাশাপাশি ব্যাংক থেকে টাকা হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনাগুলো আর্থিক খাতের অস্থিরতা প্রকাশ করেছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

১. নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি: সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ডাল, তেল, চাল, পেঁয়াজ, মাছ, মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে ২০২৩ সালে মূল্যস্ফীতির হার গড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে সামান্য বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এ পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, মজুদদারি ও চোরাচালানের মতো সমস্যাগুলো এখনো বিদ্যমান। অন্তর্বর্তী সরকারকে এ সমস্যা সমাধানে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি: সরকারের আয়ের সংকট

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। কর ফাঁকি, অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ফলে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য কর প্রশাসন সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে।

৩. বিনিয়োগে স্থবিরতা: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর

বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ আশানুরূপ বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ছিল, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ থেকে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপর্যাপ্ত। স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বিনিয়োগে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প ও তৈরি পোশাক খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে।

৪. কর্মসংস্থানের ঘাটতি: যুবসমাজের জন্য হতাশা

কর্মসংস্থানের অভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন এবং শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের মোট বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে নতুন চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় যুবসমাজের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সময় এসেছে স্কিল বেজড ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে পরিবর্তন আনার এবং কর্মমুখী ও প্রশিক্ষণমুখী পাঠদান কার্যক্রম চালু করার। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।

৫. অগ্রগতি: কিছু ইতিবাচক দিক

যদিও চ্যালেঞ্জগুলো অনেক তবু গত কয়েক মাসে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এছাড়া ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। কৃষি খাতেও কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রেখেছে। তবে এ অগ্রগতিগুলোকে টেকসই করতে আরো ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

পরিশেষে, রাষ্ট্র মেরামতে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব এ সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তার মধ্যে কভিড ১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন গোলযোগ, একদলীয় ক্ষমতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব উল্লেখ্য। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার বিষয়ক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গরিব মানুষের অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে নিয়ে ভাবতে হবে, ভোগ্যপণ্যকে সহনশীল মাত্রায় রাখতে হবে। আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে বাজার সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, পাশাপাশি জনগণ তথা জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারাই হবে সামনের দিনগুলোয় সংস্কার কার্যক্রমের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবেই সাধারণ মানুষের আস্থার পাশাপাশি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাবে।

মো. তৌফিক হোসেন: অর্থনৈতিক এবং ফাইন্যান্সিয়াল গবেষক, অ্যালামনাই, দ্য ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি, টাফটস ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র; ফিনটেক ও রিসার্চ ইউনিট, ওয়েভ ফাউন্ডেশন