করোনা মহামারীর আগে যে পৃথিবী ছিল; জীবন ধারণের উপায় যেমন ছিল, কর্মপরিবেশ যেমন ছিল, জীবনাচরণ যেমন ছিল তেমন স্বাভাবিক জীবন-যাপন কখন হবে, কীভাবে হবে তার সদুত্তর কারো জানা নেই। বেঁচে থাকার তাগিদেই আমাদের নিউ নরমাল (নতুন স্বাভাবিক) জীবনের সাথে অভিযোজনের কোন বিকল্প নেই। কভিড-১৯ মোকাবেলায় আমাদের নানাবিধ দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়েছে। এ বিশ্বমারী আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে তা আমাদের ভবিষ্যতে উদ্ভুত কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজে লাগাতে হবে। এ সকল অনাকাঙিক্ষত দুর্যোগ মোকাবেলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এ সকল দুর্যোগের ঝুঁকি নিরসনে নিম্নোক্ত বিষয়ে অধিক গুরুত্বারোপ এবং তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করি।
১। অবহেলিত কৃষি খাত যা আমাদের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচার অবলম্বন হিসেবে আশা যোগাচ্ছে, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কৃষিখাতের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান প্রয়োজন। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে টেকসই ও নির্ভরযোগ্য পেশা হলো কৃষি। করোনাকালীন কৃত্রিম উৎপাদন ব্যবস্থা যখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে তখন কৃষির উত্পাদন আমাদেরকে নতুন করে আশার সঞ্চার যোগাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে নই, সারা বিশ্বব্যাপী একই অবস্থা। চিন্তা করুন যদি এ মুহূর্তে খাদ্য সংকট হতো, কিংবা আমদানি করতে হতো, তা হলে কী হতো? অচিন্তনীয় ব্যাপার! সৌভাগ্যবশত কৃষির উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে। সরকারের কিছু কিছু উদ্যোগ সত্ত্বেও ধানের দাম এবং বাজারজাতকরণ নিয়ে চিরাচরিত সমস্যা লেগেই রয়েছে। কৃষক ও কৃষিকে বাচিয়ে রাখতে হলে কৃষকদের জন্য এ খাতকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আমাদেরকে চরম মূল্য দিতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জাপানিরা আধুনিক শিল্পের পাশাপাশি কৃষককে বাচিয়ে রাখার উদ্যোগও গ্রহণ করেছে, তাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য। নিজ দেশের কৃষিপণ্য তারা অধিক মূল্যে ক্রয় করে, কৃষি ও কৃষককে বাচানোর জন্য যা আমদানি করলে অনেক কম মূল্যে তারা পেতো।
২। কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব আমাদের দেখিয়ে দিল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা নাজুক। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট জিডিপির ১ শতাংশও নই যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক কম। আবার যে বাজেট বরাদ্দ থাকে তার যথাযথ ব্যবহার নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। নেকে মনে করেন, কমিউনিটি ক্লিনিক হতে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দরকার। প্রয়োজনে এর বিকেন্দ্রীকরণ করার জন্য সরকারকে ভাবতে হবে। এ খাতে বাজেট বরাদ্দের হার বৃদ্ধি, পেশাগত নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, স্বাস্থ্যখাত এ খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরিচালনা করা, প্রয়োজনে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল প্রদানসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তাদের নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
৩। পরিবর্তীত বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাসে উদ্যোগী হওয়ার কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে প্রায় এক কোটির মতো লোক প্রবাসে থাকে যাদের অধিকাংশই অদক্ষ এবং স্বল্প দক্ষ। কভিড-১৯ এর প্রভাবে কয়েক লক্ষ শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো হতে ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা হ্রাস, আমদানি হ্রাস, বিদেশী সাহায্যের প্রতি নির্ভরতা হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। সার্বিকভাবে দেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪। করোনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শুধু গার্মেন্টস শিল্প এবং প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভর করলে হবে না। আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থার বৈচিত্রায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশের অর্থনীতি এক বা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে যা অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নই। অর্থনীতির ভাষায় একে ডাচ ডিজিজ বলা হয়। ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত দেশগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায় এটা আমাদের দেশের জন্য কতটা মারাত্মক হতে পারে। দেশের নীতিনির্ধাকদের অবশ্যই এ বিষয়ে ভাবা উচিত।
৫। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। এখাতে দেশের মোট কর্মসংস্থানের পঞ্চাশ ভাগের অধিক জড়িত এবং মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে এ খাত হতে। এছাড়া, মোট কর্মসংস্থানের প্রায় নব্বই শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সাথে সম্পৃক্ত। আশ্চর্যের বিষয় হলো এ বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাততে দেখভাল করার জন্য দেশে কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। সরকারের নীতি নির্ধারকদের অবশ্য এ বিষয়ে ভেবে দেখা উচিৎ। দেশের সার্বিক উন্নয়ন, স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অগ্রাধিকার প্রদান ও তদানুযায়ী পদক্ষেপ জরুরি।
৬। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির পরিধি ও ক্ষেত্র বৃদ্ধি করতে হবে। আপৎকালীন অবস্থা মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এর চেয়ে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সরকার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সার্বজনীন পেনশন ও বিমা ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। প্রয়োজনে সরকার সার্বজনীন পেনশন ও বিমা ব্যবস্থা চালুর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরো মজবুত ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে পারে। নানা কারণে বিমা ব্যবস্থাটি এ দেশে এখনো তেমন জনপ্রিয় হয়নি। এ সম্পর্কে জনমনে অবিশ্বাস ও আস্থার অভাব রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এর যৌক্তিকতাও রয়েছে। গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আগ্রহী হলে এবং প্রয়োজনীয় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেই এটা সম্ভব বলে মনে হয়। এ সকল ব্যবস্থা মানুষের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আশার আলো হিসেবে কাজ করবে তাতে সন্দেহ নেই।
৭। পরিবর্তীত পরিস্থিতির মধ্যে কর্মপরিবেশে আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। চিরাচরিত অফিসের পরিবর্তে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে ভার্চুয়ালি কাজ করার সুযোগ ও সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কর্মী ও চাকরিদাতা উভয়ের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ অনলাইনভিত্তিক শিক্ষণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এ ধরনের মানসিকতা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিবর্তীত পরিস্থিতির সাথে বেমানান। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
৮। আমাদের জীবনমান ও জীবনাচরণের উন্নয়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে জীবন-যাপনের ধরণ, খাদ্যভ্যাসের পরিবর্তন দরকার যদিও তা সহজ বিষয় নয়। শরীরচর্চাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তিকরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান ও দৈনন্দিন জীবনে এর প্রতিফলন ইত্যাদি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে জীবনের প্রায়োগিক দিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।শিক্ষাবিদগণ নিশ্চয়ই এ বিষয়ে ভেবে দেখবেন। অন্যথায় কালের পরিক্রমায় আমরা শুধু মানুষ! হিসেবেই থেকে যাবো।
৯। গবেষণার ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। বিভিন্ন দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালগুলো যখন কভিড-১৯ এর জিনোম সিকোয়েনসিং, ভ্যানেশন উদ্ভাবন নিয়ে ব্যস্ত তখন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করলেন। দেশে হাজার হাজার সায়েন্টিস্ট এর পদ থাকলেও করোনা ভাইরাসের প্রথম জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে হয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বাবা-মেয়েকে। ভ্যানেশন নিয়ে গবেষণা করছে আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার এবং এর জন্য একজন বাংলাদেশী হিসেবে গর্ববোধও করি। শিক্ষাক্ষেত্রে দলবাজি বন্ধ করতে হবে, গবেষণায় বরাদ্দ দিতে হবে এবং মান সম্মত গবেষণা নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞানীদের প্রয়োজনে আর্থিক সুবিধা বাড়াতে হবে, মেধাবীদের এতে আকৃষ্ট করতে হবে। নীতিনির্ধারক এবং তরুণদের ভাবতে হবে শুধু বিসিএস দিয়ে সব সমস্যা মেটানো যাবে না। দেশের জন্য গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীও দরকার।
১০। দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাওয়া বেসরকারি সংস্থাসমূহকে (এনজিও) মূলধারার উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করা জরুরি। তাদের ইতিবাচক কাজকে স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। দেশের প্রায় ৩ কোটি পরিবার এ সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উন্নয়ন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে তা কাজে লাগানো হলে আখেরে দেশেরই উপকার হবে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারকদের অবশ্য এ বিষয়ে ভেবে দেখা উচিৎ।
লেখক: সমাজকর্মী ও উন্নয়ন বিশ্লেষক
ggilane@gmail.com










