যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর জ্বালানি। যত সস্তায় ও সহজলভ্যভাবে জ্বালানি জোগানো যাবে অর্থনীতি তত বেগবান হবে, পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও অনেকাংশে বাড়বে। এজন্য প্রতিটি দেশই নিজস্ব উেসর প্রাথমিক জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অধিক মনোযোগ দেয়, যাতে অর্থনৈতিক গতিশীলতা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি চাহিদা নিম্ন ব্যয়ে মেটানো যায়। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। পাকিস্তান আমল থেকেই সংগত কারণে এখানে বিভিন্ন উেসর জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয় এবং তাতে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান মেলে। মূলত এ সহজলভ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভর করেই দেশের অর্থনীতির আজকের এ রূপান্তর সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অর্থনীতির পরিসর বৃদ্ধির অনুপাতে আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের উন্নয়নে তেমন একটা উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ায় বিদ্যমান গ্যাসের মজুদ অব্যাহতভাবে কমতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতে জ্বালানি চাহিদা বাড়ায় সহজ পথ হিসেবে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। এটি অর্থনীতি তথা শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপের উত্তরণের পথে বড় বাধা বৈকি।

জ্বালানি পরিকল্পনা পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, গ্যাস সংকটের কারণে সরকার ক্রমেই আমদানীকৃত জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এটি সার্বিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এক হিসাব অনুযায়ী, যদি ব্যয়সাধ্য এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা অব্যাহত থাকে, নির্মিতব্য বৃহৎ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যদি শুধু আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং যদি আমদানি করা তেলের ওপর বাড়তি নিভর্রশীলতা কমানো না যায়, তাহলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ৯০ শতাংশের বেশি হবে আমদানিনির্ভর। এতে জাতীয় অর্থনীতির ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষভাবে শিল্প খাতে আমদানীকৃত উচ্চ ব্যয়ের জ্বালানি শিল্পোৎপাদন খরচ, বিনিয়োগ অনেক ব্যয়বহুল করে তুলবে। এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় খাতটি পিছিয়ে পড়বে। তদুপরি ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ দীর্ঘদিন স্থবির থাকার ক্ষেত্রেও বেড়ে চলা জ্বালানির ব্যয়ের একটি সংযোগ থাকতে পারে। কাজেই দেশের অর্থনীতির নবতর উল্লম্ফনের স্বার্থে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভরতা থেকে সরিয়ে এনে দেশী জ্বালানি জোগানে আরো বেশি তত্পর হতে হবে।

অত্যধিক আমদানিনির্ভরতার একটি বহিঃস্থ অভিঘাতও বিদ্যমান। উৎস দেশগুলো তথা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমাদেরও বেশি ব্যয়ে জ্বালানি কিনতে হবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ নিগড় ব্যাহত হলে বেশি দামেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি জোগানো কঠিন হবে। এমনটি হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে শিল্প খাতে বিপর্যয়কর অবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তাই সব দিক বিবেচনায় দেশী জ্বালানির নিশ্চয়তা বিধানই জরুরি।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কমবেশি সব দেশই স্বনির্ভরতার নীতি গ্রহণ করেছে। উন্নত দেশগুলো দূরে থাক, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি জোগানোতেই অধিক মনোযোগী। ভিয়েতনাম বর্তমানে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে মোট বিদ্যুতের যথাক্রমে ৩১ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ উৎপাদন করছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দেশটিতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুতের অবদান ৪১ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে থাকে। এখন দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে আরো বেশি বদ্ধপরিকর। একইভাবে কম্বোডিয়াও গতানুগতিক দেশীয় জ্বালানি উেসর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়ও একই অবস্থা। দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার প্রাধান্য থাকলেও ধীরে ধীরে জলবিদ্যুৎ ও জিওথার্মালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশীয় উৎসনির্ভর। ফলে সেসব দেশে জ্বালানি ব্যয় আপেক্ষিকভাবে কম। এটা দেশগুলোর শিল্প উৎপাদনের খরচ কমানো এবং সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। সুতরাং জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে দেশীয় জ্বালানির জোগান নিশ্চিতের বিকল্প নেই।

জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পেরোলেও আমাদের দেশে এটি করা হয়নি। এটি জরুরিভিত্তিতে করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা।