দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকের অনেক রকমের ধারণা এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারিসহ প্রাইভেট হাসপাতালের খরচ এবং সেবার মান নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। যদিও সরকার দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। দুর্গম এলাকায় থাকতে চান না চিকিৎসকরা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা সেখানকার চিকিৎসায় অবহেলা করে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী দেখেন। চিকিৎসকদের এ ধরনের প্রবণতা রুখতে এবার তাদের জন্য সরকারি হাসপাতালেই প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্দিষ্ট অফিস সময়ের বাইরে সরকারি হাসপাতালেই আলাদাভাবে প্রস্তুতকৃত চেম্বারের মাধ্যমে রোগী দেখার সুযোগ দেয়া হবে চিকিৎসকদের। দ্রুতই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীও এমন উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে এমন দাঁড়ায়, সরকারি চাকরির সময় অনুযায়ী রোগীদের ‘সরকারি’ সেবা দেবেন চিকিৎসক, অন্য সময়ে দেবেন ‘প্রাইভেট’ চিকিৎসা। এতে ডাক্তারদের চিকিৎসায়ও হয়ে যাচ্ছে দুই ভাগ। অর্থাৎ যারা সরকারি ফিতে ডাক্তার দেখাবেন তারা পাবেন এক রকম চিকিৎসা এবং যারা প্রাইভেটে দেখাবেন তারা পাবেন ভিন্ন রকম। এক হাসপাতালে দুই রকমের চিকিৎসার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে সেবার মানে যেন কোনো তারতম্য তৈরি না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
দেশের অনেক মানুষ এখনো প্রাইভেটে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে সক্ষম নয়। তাই সরকারি ডাক্তারদের ‘ফি’র বিষয়টিও মাথায় নেয়া জরুরি। কোনোভাবেই যেন দেশের নিম্নবিত্ত নাগরিকরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন তারও নিশ্চয়তা জরুরি। হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নির্দেশনার পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আছে। এক্ষেত্রে সরকারি দায়িত্ব পালনে ডাক্তারদের ওপর কড়াকড়ি নির্দেশ দিতে হবে। যেহেতু চিকিৎসা সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার তাই এখানে কোনোরূপ হেলাফেলা করা যাবে না। সরকারি এবং প্রাইভেট—উভয় ব্যবস্থাতেই সব শ্রেণীর মানুষ যেন উত্তম চিকিৎসাসেবা পায় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালেই এমন বিভাগ বা শাখা খোলা হচ্ছে যেখানে সরকার নিয়োজিত ডাক্তাররা প্রাইভেটে রোগী দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। মূলত চিকিৎসকদের সরকারি হাসপাতালের বাইরে না যেতে দিতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর আগে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেটে প্র্যাকটিস বন্ধে আইনি নোটিসসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও আদতে তা কার্যকর হয়নি। নওগাঁসহ দেশের কয়েকটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে চালু হয়েছে বৈকালিক আউটডোর সেবা। নওগাঁর পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী, ঢাকার ধামরাই, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং টঙ্গী ও মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে বৈকালিক সেবা চালু হয়েছে। প্রথম দিকে এর সফলতা পাওয়া গেলেও চিকিৎসকের অভাবে বর্তমানে এ ব্যবস্থা তেমন সক্রিয় নেই।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকরা নিজের কর্মস্থলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস করেন—এমন কোনো নজির উন্নত দেশগুলোয় পাওয়া যায় না। তাছাড়া দেশে প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ছে এমনটি দেখা গেলেও বাস্তব অর্থে স্বাস্থ্য আর সেবা হিসেবে থাকছে না। বিএসএমএমইউতে বৈকালিক যে কনসালটেশন চলছে তাও বাস্তব অর্থে কার্যকর নয়। কেননা সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তেমন একটা বসেন না। তাই ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের বিষয়ে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকরা নিজের কর্মস্থলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস করেন—এমন কোনো নজির উন্নত দেশগুলোয় নেই। তাছাড়া দেশে প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ছে এমনটি দেখা গেলেও বাস্তব অর্থে স্বাস্থ্য আর সেবা হিসেবে থাকছে না। বিএসএমএমইউতে বৈকালিক যে কনসালটেশন চলছে তাও বাস্তবে কার্যকর নয়। কেননা সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তেমন একটা বসেন না।
ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস আদতে কতটুকু উপকারে আসবে তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। এমনও হতে পারে, এটা চালু হলে সরকারিভাবে যে সময়ে রোগী দেখা হতো, সেসব রোগীকে বৈকালিক কনসালটেশনের সময় আসতে বলা হবে। সরকারি সময়ে সেবার পরিসর ও মান কমে যেতে পারে। অথবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বৈকালিক কনসালটেশনে না থেকে মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে চালিয়ে নেয়া হবে। তাই উচিত হবে কোনো সরকারি চিকিৎসককে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাইরে কোনো কাজ করতে না দেয়া। তারা যেন পুরো সময়টা গবেষণা ও সরকারি চিকিৎসাসেবায় ব্যয় করতে পারেন, এজন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা দেয়া। দেশে চিকিৎসকের সংকট রয়েছে এমন একটি প্রশ্ন উঠলে দেখা যাবে, বেসরকারিভাবে চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছেন না। সরকারি চিকিৎসকরাই বেসরকারিভাবে প্র্যাকটিসে যাচ্ছেন। তাই শুধু সরকারিভাবে বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে, এমন বিষয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে যাতে কেউ ব্যবসা করতে না পারে, সেজন্য একটি নীতিমালা থাকা উচিত। ২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে হাসপাতালগুলোর আবাসিক চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে তাদের জন্য নন-প্র্যাকটিসিং ভাতা চালুর দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু গত ১১ বছরেও এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
সরকার বলছে, বর্তমানে চলমান চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণার কাজ যেভাবে চলছে তা কোনোক্রমেই বিঘ্ন ঘটানো যাবে না। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রথমে কেবল সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস চালু করা এবং এ অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে তা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বৈকালিক রোস্টার চালু করা, ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের আয়-ব্যয়ের ক্ষমতা স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর দেয়া, বহির্বিভাগে রোগী দেখা ও বসার স্থানের আধুনিকায়ন, নার্সসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক লোকবলের উৎসাহ ভাতার ব্যবস্থা ও রোগীদের রোগ নিরীক্ষণের প্রতিবেদন দ্রুততম সময়ে দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। রোগী ভর্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, বৈকালিক রোগীদের ভর্তির জন্য পৃথক বিছানা, অপারেশন থিয়েটার চালু থাকতে হবে। এ প্র্যাকটিসের মাধ্যমে আয়ের ১০ শতাংশ আয়কর প্রদান সাপেক্ষে ৬০ শতাংশ চিকিৎসক ও বাকি ৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা সহায়তাকারীদের মধ্যে বিতরণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া উন্নত দেশগুলোয় যেসব চিকিৎসক একামেডিক ও গবেষণায় কাজ করেন তারা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না।
সরকারি হাসপাতালে যদি ডাক্তারদের ফি ধার্য করে বৈকালিক আউডডোর সেবা চালু করা হয়, তবে তা নিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তখন দালালের দৌরাত্ম্য আরো বাড়বে। আর সকালের চেয়ে বিকালে রোগীর ভিড় বেশি হবে। ফলে সকালে ডাক্তাররা আউটডোরে বসতে নিরুৎসাহিত হবেন। অন্যদিকে যদি সকালের আউটডোর টাইমকেই বর্ধিত করে বিকাল ৪টা-৫টা পর্যন্ত করা হয়, তা-ও সমস্যা তৈরি করবে চাকরিবিধি অনুসারে। সরকারি চাকরিজীবীরা সপ্তাহে দুই দিন ছুটি পান, চিকিৎসকরা ছুটি পান একদিন। এ কারণে হাসপাতালে সেবা সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা করা হয়েছে। অন্যদিকে জনবল সংকট প্রকট। বিদ্যমান জনবল দিয়ে দুই শিফটে সেবা দেয়া সম্ভব কিনা, তাও এক প্রশ্ন। এসব কারণে সরকারি হাসপাতালে বৈকালিক সেবার পরিকল্পনা কার্যকর করা যায়নি। নতুন এ পরিকল্পনা কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা দেখার বিষয়। এতে রোগীর সেবার মান কমে না যায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
সরকারি হাসপাতালেই ডাক্তাররা প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ পেলে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। সেটি করার জন্যও সরকারি হাসপাতালের ল্যাবরেটরিগুলো খোলা থাকবে কিনা বা ফি কী হবে, এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। এতে হাসপাতালের কোনো লাভ হবে কি? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সান্ধ্য কোর্স করানো হয় মুনাফার জন্য। সরকারি হাসপাতালে এমন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। এ কথা ঠিক, বিকালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ দেয়া হলে সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামোগুলোর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হবে। কিন্তু এর জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠোমো সুবিধা রয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে ডাক্তাররা সকাল ও বিকালের রোগীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক কোনো আচরণ যাতে না করে তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।










