মনে আছে, ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম লেটার গ্রেড পদ্ধতি শুরু করা হলো, পরীক্ষায় যোগ হলো ৪০ শতাংশ নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন। সারা দেশে ৭৬ জন এ+ পেল সেবার, পাস করল ৩৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী। ২০০৮-এ আবার শুরু হলো সৃজনশীল ধরনের পরীক্ষা। সে এক তেলেসমাতি কাণ্ড! নানা পথ ঘুরে আবার ২০২১ থেকে নতুন শিক্ষাক্রম আর অভিজ্ঞতাভিত্তিক পড়ানো! সরকার বদল হয়, বছর ঘুরে, আর কর্তাবাবুরা শিক্ষায় নতুন নতুন ভেলকি দেখিয়ে দেন। অপ্রস্তুত ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের ওপর আকাশ থেকে পড়ে সরকারের খেয়ালখুশি মতো অদক্ষ বিশেষজ্ঞদের হাতে গড়া শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক আর মূল্যায়ন পদ্ধতি। সেগুলো যারা পড়বে আর যারা পড়াবেন, তাদের লক্ষ্য, চাহিদা, প্রস্তুতি বা সক্ষমতা কিছু যাচাই বা বিবেচনা করা হয় না। দিন দিন শিক্ষা হয়ে ওঠে প্রতারণার আরেক নাম।
প্রতারণা খুব কঠিন অভিযোগ। কিন্তু চিন্তা করে দেখেন, আপনি ভীষণ ক্ষুধার্ত, অপুষ্টি আর রোগে ভোগা একজন মানুষ। তেমন সময় আপনাকে ঠাণ্ডা জমাট একটি আইসক্রিম এনে দিলে সেটা খেয়ে আপনার কতটা উপকার হবে? আপনার তখন পাওয়ার কথা পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূলের সরবরাহ আর ধারাবাহিকতা। মন ভোলানো আইসক্রিম খেয়ে আপনার আনন্দ লাগতে পারে, কিন্তু আপনার পক্ষে দেহগঠন বা ভারী কোনো কাজ করা কতটা সম্ভব হবে, সে বিবেচনা আপনার ওপরই ছেড়ে দিলাম।
একই কাণ্ড ঘটেছে শিক্ষায়। হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রচারণা অথবা চটকদার কোনো চমক দেখানো ছাড়া আমাদের শিক্ষার আর বিশেষ কার্যকারিতা দেখি না। প্রমাণ চান? বঙ্গদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিরক্ষর। ক্লাস থ্রি থেকে ফাইভের শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি বাংলা-ইংরেজি পড়ে বুঝতে পারে না, যোগ-বিয়োগ পারে না। বিভ্রান্ত হয়ে মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আগ্রহী প্রার্থীদের ১০ শতাংশ ও ন্যূনতম পাস নম্বর তুলতে পারে না। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তাদের এমন কোনো যোগ্যতা বা দক্ষতা তৈরি হয় না যা তাদের জীবিকা অর্জনে সাহায্য করবে। বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই অবর্ণনীয় ঘাটতি নিয়ে ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরিপ্রার্থীরা বুঁদ হয়ে স্কুলের বই পড়ে (কারণ সেই পরীক্ষার সিলেবাসই তা-ই) এবং যথারীতি তাদের ৯৬ শতাংশ অকৃতকার্য হয়। স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করার পরও অর্ধেকের বেশি গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের ঘানি টানতে থাকে বছরের পর বছর। এটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠলে চলবে না। আরো আছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী। তারপর এল কভিড। এরপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অবধারিত আন্দোলন-সংগ্রাম। ক্ষমতার পালাবদল। ২০২৪-এ ন্যূনতম ১৮৫ কার্যদিবসের মাঝে ৪২ শতাংশ দিন ক্লাস করা সম্ভব হয়েছে। এর পরও সারা দেশে অটোপাসের দাবি উঠেছে ছাত্রদের মাঝে। পরীক্ষা না দিয়ে তারা সার্টিফিকেট পেতে চায়, কারণ তারা গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে!
ভালো কথা। বিগত স্বৈরাচারী আমলে পাঠ্যপুস্তকগুলো হয়ে উঠেছিল সরকারি দলের প্রচারণা আর প্রোপাগান্ডার বাহক। চূড়ান্ত বিকৃতি ধারণ করা সেসব শিক্ষাক্রম, বই আর পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবেই ৫ আগস্টের পর অচল হয়ে যায় আর পরিবর্তনের দাবিদার হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চলমান বিতর্কিত শিক্ষাক্রম স্থগিত করেন এবং তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য পূর্ববর্তী (সৃজনশীল) শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক আর মূল্যায়ন পদ্ধতি বলবৎ করেন। সেই সঙ্গে পূর্ববর্তী শিক্ষাক্রম আর পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
সিদ্ধান্ত মন্দ নয়। কিন্তু সেই পরিবর্তন করবেন কে বা কারা? তাড়াহুড়ো আর মাঠ দখলের খেলায় উৎসাহী ব্যক্তিদের নিয়ে অর্ধস্বচ্ছ উপায়ে শুরু হয় শিক্ষাক্রম আর পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের কাজ৷ যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই না করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি একের পর এক বিতর্ক আর আন্তঃকলহের জন্ম দিতে থাকেন। এ ডামাডোলের মাঝে সময়ও থেমে নেই, এগিয়ে আসছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। সংস্কার উন্মুখ অন্তর্বর্তী সরকার এরই মাঝে অত্যন্ত গুরুত্ব নিয়ে নির্বাচন, জনপ্রশাসন, পুলিশ, বিচারসহ ১১টি সংস্কার কমিশন করে ফেললেন। অভাগা জাতি তার মাঝে শিক্ষা নিয়ে বিশেষায়িত কোনো কমিশন পেল না।
বেশ। কিন্তু ড. মাহমুদ মৃদু আক্ষেপের সঙ্গে একাধিক বক্তব্যে জানালেন যে শিক্ষার অবস্থা বড়ই জীর্ণশীর্ণ। সেই সঙ্গে শ্বেতপত্র আর বিভিন্ন তদন্তে বের হয়ে এল শিক্ষা খাতে গত দেড় যুগের মাত্রা ছাড়া দুর্নীতি। আমরা ভাবলাম, এই বেলা বুঝি পরিবর্তনের বাতাস বইল। কিন্তু না। শিক্ষা নিয়ে যা আলাপ জনপরিসরে হলো, তা নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বললেন যে এ বড় কঠিন কাজ বাপু, এত বড় ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা আমাদের কাজ নহে!
এরই মাঝে আরো বিপত্তি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর এনসিটিবি এবারো অস্বচ্ছ-অর্ধস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিটি স্থাপন করল। যৌক্তিক পদ্ধতিতে নিয়োগ না দেয়া বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অনিয়ম ও ব্যর্থতা ঠিকরে বের হতে থাকল। এবারো কোনো গবেষণালব্ধ ফলাফলের বালাই না করে ‘আমাদের মনে হয়’ ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম আর পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনে হাত দিলেন। যা কাজ করলেন তা মূলত রাজনৈতিক ইতিহাস যোগ-বিয়োগ করা, তার সঙ্গে উন্নত কাগজ আর ভালো বাঁধাইয়ের বই ছাড়া শিক্ষার গুণগত মানের খুব সম্পর্ক নেই। মুহুর্মুহু আন্দোলন-সংগ্রাম-অস্থিতিশীলতাকে সঙ্গে নিয়েও অপরিণামদর্শী বঙ্গসন্তানের নামে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ জুড়তে সময় লাগেনি।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. মাহমুদ দ্রুতই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হস্তান্তর করলেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরারের হাতে। কেবল অন্তর্বর্তী সরকার নয়, কোনো সরকারই কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা প্রদর্শনে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বোধ করেননি। আমরাও ধরে নিলাম, এই আমাদের ভাগ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাজ্ঞ অধ্যাপক আবরার অভিবাসীদের মানবাধিকার নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে সফল, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এ ক্রান্তিকালে টেনে তোলার ক্ষেত্রে তার কী সম্ভাব্য ভূমিকা থাকতে পারে এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান-দক্ষতা-অভিজ্ঞতা আছে কিনা তা নিয়ে আমরা কেউ জিজ্ঞাসা করিনি। নতুন শিক্ষা উপদেষ্টা দরদের সঙ্গে জানালেন, যে শিক্ষা ব্যবস্থায় তার শেকড়, তার জন্য কিছু করার সুযোগ তিনি সানন্দে গ্রহণ করছেন। এর ক’দিন বাদেই তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে যা বললেন তার সারমর্ম হলো এনসিটিবি কারো কথার ধার ধারে না, তারা তাদের সক্ষমতার ৮০ শতাংশই ব্যয় করে মুদ্রণে, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন একটি তামাশার শামিল। এ পর্যায়ে হয়তো আমাদের জানতে চাওয়া উচিত, এ সমস্যা সমাধানে তিনি কী উদ্যোগ নেবেন। লক্ষণীয় নতুন বছরের চতুর্থ মাস শেষ হতে চলছে কিন্তু শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছেনি।
সাকল্যে শিক্ষা আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের ১১ নম্বরেও নেই তা তো দৃশ্যমান। বিনিয়োগ, বিচার, প্রশাসন, পুলিশ কোনোটিই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু শিক্ষা আর স্বাস্থ্য যদি এমন অবহেলায় পড়ে থাকে, এত বড় জনগোষ্ঠী কোন উন্নয়নের কাজে লাগবে আর কোন উন্নয়ন থেকে তারা লাভবান হতে পারবে? রাজনৈতিক অর্থনীতিতে শিক্ষার ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত, এ কলামে তা নিয়ে পাঠকের কাছে হা-বিতং করব না। শিক্ষা দ্বারা দাস তৈরি করা যায়, আবার শিক্ষা গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ারও হতে পারে। আমরা কোনোটিই করিনি। আমাদের না আছে প্রশিক্ষিত দক্ষ কর্মী, না আছে জ্ঞাননির্ভর স্বাধীন মানুষ।
অসংখ্য-অগণিত সমস্যায় জর্জরিত বহুধাবিভক্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বারবার মনে করতে হবে বিগত সরকার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষাকে ধ্বংস করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ গণহত্যার বিচার এবং নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার হলেও শিক্ষাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় বহু বাধা সত্ত্বেও এ সরকার আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনীতিতে প্রশংসনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। কিন্তু আর সব সরকারের মতোই শিক্ষা তাদের কাছে অবহেলিত বিষয় কেন—আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
তাই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের পক্ষ থেকে খানিকটা দূরদৃষ্টি ধার দিতে চাই। শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক-দুই বছরে কিছু চটকদার পরিবর্তন দিয়ে ঠিকঠাক করা যাবে না, এটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ। এর ফল পেতে কয়েক দশক অতিক্রান্ত হবে। কিন্তু গবেষণা, বিশ্লেষণ আর উদ্যোগ গ্রহণ এখনই শুরু না করলে সমগ্র জাতিকে তার দুর্ভোগ পোহাতে হবে, এরই মধ্যে হচ্ছেও। এ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের শুরুটা অন্তর্বর্তী সরকার করলেও পরবর্তী যেকোনো নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে তার নির্বিঘ্ন ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য। আর এ পরিকল্পনা, বিনিয়োগ আর বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিকভাবে দক্ষ, যোগ্য, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের একত্র করে একটি কমিশন করে দিতে হবে। এই কমিশন দ্রুতই আমাদের উত্তর খুঁজে দেবেন যে আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় পৌঁছতে চাই আর শিক্ষা কীভাবে আমাদের সেই যাত্রায় ভূমিকা রাখবে।
আমরা আর আকস্মিক জনতুষ্টিমূলক আইসক্রিম চাই না। সুস্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে শিক্ষাকে দেখতে চাই। শিক্ষা আমাদের বিনোদনের মাধ্যম নয়। জাতিগঠনের জন্য শিক্ষাকে যদি খানিকটা তেতো হওয়া লাগে, ভারী হওয়া লাগে, হোক। কিন্তু বাধ্যতামূলক হোক, কেউ বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত হোক। পৃথিবীতে পিয়ারসন, কেমব্রিজ, আইবি শিক্ষাক্রম আর পাঠ্যপুস্তকের জয়জয়কার আছে, বিভিন্ন আদর্শায়িত মূল্যায়ন ব্যবস্থার উদাহরণ রয়েছে। তারা কতটা সদিচ্ছা, আন্তরিকতা আর পরিশ্রমের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষাকে কার্যকর করেছে তার তুলনামূলক পর্যালোচনা শুরু হোক। সুদূরপ্রসারী শিক্ষানীতি হোক, সে অনুসারে যত্ন করে শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক হোক, খুব ভালো শিক্ষক নিয়োগ শুরু হোক। চৌকস ও জবাবদিহিতামূলকভাবে তাৎক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি আর দীর্ঘমেয়াদি সুপরিবর্তনের শুরুটা অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগেই হোক।
আসিফ বায়েজিদ: শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম গবেষক, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য










