সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় হয়। কথাটির সত্যতা কি অস্বীকার করা যায়? ছাত্রজীবনে 'The aim of life' নিয়ে হাজারো বিশ্লেষণ তো সে কথারই প্রমাণ বহন করে।

ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন স্বপ্ন ছাড়া বড় হয়ে ওঠা সহজ হয় না ঠিক তেমনি একটা রাষ্ট্রের বেলাতেও তা সমভাবে প্রযোজ্য। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে রাষ্ট্রের স্বপ্নের ধরন কি রকম হবে। রাষ্ট্র তো কোন জৈবিকসত্ত্বা নয়! কোন জৈবিকসত্ত্বা না হলেও রাষ্ট্রের একটি প্রধান উপাদান জনগণ (people)। জনগণের প্রত্যেকের নিজস্ব আলাদা আলাদা স্বপ্ন থাকে। একই সাথে রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে জনগণ অর্থাৎ নাগরিকরা স্বপ্ন দেখে থাকে। সেই স্বপ্নের সামগ্রিক রূপকে এক কথায় রাষ্ট্রের স্বপ্ন নামে অভিহিত করা যায়।

ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ ও অনেক সময় পাহাড়সম ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্রের ত্যাগ স্বীকারের কঠিন মূল্য দিনশেষে আবার দেশের  নাগরিকদেরকেই দিতে হয়। একইভাবে রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুফলও জনগণই ভোগ করে থাকে। তাই এখানে জনগণের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের স্বপ্নের সাথে যত বেশিবেশি মানুষ একাত্মতা অনুভব করে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন তত সহজ হয়ে যায়।

আমার আলোচনা মূলত অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে স্বভাবতই উন্নত বাংলাদেশের চিত্রটা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা আমরা করতে পারি যা মোটামুটি এরকম:

১. জনগণের মাথাপিছু আয় অনেক উপরে অর্থাৎ ১২৮০০ ইউএস ডলার বা তার বেশি। যদিও বর্তমান পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১০০,০০০ ইউএস ডলারেরও উপরে। (বর্তমানে বাংলাদেশে তা ২০৬৪ ইউএস ডলার মাত্র)।

২. দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান অনেক উচ্চ পর্যায়ের হবে। প্রত্যেকে নিজেদের আয় দ্বারা উঁচু মান বজায় রেখে খুব সহজেই মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে পারবে। 

৩. প্রায় শতভাগ জনগোষ্ঠী আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রের উপযোগী উচ্চমানসম্পন্নমানবসম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে। যে মানবসম্পদ দেশকে অধিকতর দ্রুততার সাথে সামনে এগিয়ে নিতে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

৪. উচ্চ ভারী ও আধুনিক শিল্পকারখানা দেশের অর্থনীতির মূল ভীত হিসেবে কাজ করবে। যা পর্যায়ক্রমিক শিল্প প্রসারকে ত্বরান্বিত ও সফল করার পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানেরউৎস হিসেবে কাজ করবে।

৫. বেকার সমস্যা সহনীয়পর্যায়ে অর্থাৎ বেকারত্বের হার নিম্ন পর্যায়ে থাকবে। ছদ্মবেকারত্ব থাকবে না বললেই চলে। সবাই মর্যাদার সাথে নিজ নিজপেশায়নিয়োজিত থাকবে। কাজ হারানো ও কাজ না পাওয়া লোকজন বেকার ভাতাসহ বিবিধ সুবিধার আওতায় সুরক্ষিত থাকবে। 

৬. সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক স্বাস্থসেবা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা থাকবে। ফলে বিনা চিকিৎসায় কারো মৃ্ত্যুবরন পর্যন্ত সেখানে অকল্পনীয় হবে।

৭. নাগরিকরা নিজ দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে গর্ববোধ করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কারণে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ ও সেখানে স্থায়ী বসবাসের চিন্তা ও প্রচেষ্টাকে অসম্মানজনক বিবেচনা করবে।

৮. দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি ও দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারকারীরা সামাজিক ভাবে লজ্জিত এবং আত্ম অনুশোচনায় দগ্ধ হবে।

৯. আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে। আইনের চোখে সবাই সমান বিবেচনার পাশাপাশি সকল পর্যায়ের নাগরিকরাও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। 

১০. দূর্নীতি কমে আসবে। কম দূর্নীতিপ্রবন দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ ও দূর্নীতি সূচক তালিকায় উপরের দিকে অবস্থান নিশ্চিত করবে।

১১. জনগণ নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস ও মত প্রকাশের সমন্বিত স্বাধীনতা উপভোগ করতে থাকবে।

১২. সাধারন শিক্ষায় নৈতিক ও জীবনমুখী শিক্ষা এবং উচ্চতর শিক্ষায় জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণা সবথেকেবেশি অগ্রাধিকার পাবে। 

১৩. দেশের আয়তন ও সম্পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) নির্ধারণ ও তা অর্জিত হবে।

১৪. অনেক মানুষ দক্ষজনশক্তি হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চ মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে থাকবে। বিদেশের মাটিতে প্রচলিত নিম্নমর্যাদার কাজ করার কথা কেউ চিন্তাও করবে না।

১৫. রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা (জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা) সরকারি (জনগণের) অর্থে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমনকেনিচুমানসিকতা ও চরম অমর্যাদাকর বিবেচনা করবে।

১৬. উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা (রেল ও সড়ক) নেটওয়ার্ক আকারে রাজধানীর সাথে সকল জেলাকে এক সুতোয় বেঁধে রাখবে। দেশের মধ্যে মানুষের চলাচল দ্রুত এবং স্বস্তিকর ও আনন্দদায়ক হবে।

১৭. বস্তিহীন, রিক্সা ও যানজটমুক্ত রাজধানী শহর ঢাকা বসবাসযোগ্য শহরের বিশ্বতালিকায় উপরের দিকে স্থান করে নিবে। 

১৮. দূষণমুক্তনবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং একসময় তা দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার শতভাগে উন্নীত হবে।

১৯. বহুল আলোচিত প্রযুক্তকেন্দ্রিক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে সফল করার ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে থাকবে। অর্থাৎ রোবটিক্স, আর্টিফিয়ালইন্টেলিজেন্স, বিগ ডাটা এবং এনালিটিক্স, ক্লাউডকম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো ইস্যুগুলো নিয়ে প্রচুর কাজ হবে।

২০. ভিশন-২০৪১ অর্জন নিশ্চিত করা হবে।

২১. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষনহীন, বৈষম্যহীন, সবার জন্য উন্নত জীবনের সুযোগ সৃষ্টিকারী বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাবো।

নানান গবেষণা আমাদের বলে দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর মূল লক্ষ্যে যাত্রা শুরুর ৩০ বা ৩৫ বছরের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। পদ্ধতি হিসেবে দেশের আয়তন ও সম্পদ বিবেচনায় মোট অর্থাৎ কাম্য জনসংখ্যা কত হওয়া উচিত তা দ্রুত নির্ধারণ ও অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে বিদ্যমান জনসংখ্যাকে দক্ষ ও উন্নত মানবশক্তিতে রূপান্তর এবং দূর্নীতিপ্রতিরোধে শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এসব পদক্ষেপের সাফল্যের ফলস্বরূপ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়ে যায়। 

বর্ণিত দেশসমূহে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে অনেক উপাদান (Factors) ভূমিকা রেখেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো সফল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাশাপাশি উন্নয়নের জন্য সহায়ক সংস্কৃতি (conducive culture)। উন্নয়নসহায়ক সংস্কৃতির কারণে সেখানকার জনগণ বহু প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে উন্নয়ন উপযোগী মানবসম্পদ গঠনে সরকারের ব্যাপক উদ্যোগের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই সংস্কৃতির কারণেই দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র ২০-২৫ বছরের ব্যবধানে শূন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার (zero population growth rate) অর্জিত হয়েছে। এবং বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সাথে সাথে বিজ্ঞানমনস্ক জাতিতে রূপান্তরিত হতে পেরেছে।

অন্যদিকে কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মত সাংস্কৃতিক সহায়তা না পাওয়ার কারণে মালয়েশিয়া তুলনামূলকভাবে তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি বলে মনে করা হয়।

আমাদের সংস্কৃতি ভালো না খারাপ, উচ্চ মানের না নিম্ন মানের সে বিতর্কে যাবো না। তবে এটা যে যথেষ্ট উন্নয়ন সহায়ক নয় তাতে কোন সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না। তুলনামূলক পর্যালোচনা তো এটাই নির্দেশ করে। যেমন- অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৬০ এর দশকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু করে মাত্র ২০/২৫ বছরের ব্যবধানে দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে শূন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার (zero population growth) অর্জনসহ জনসংখ্যার পরিমাণ ২ কোটি ৫ লাখ থেকে দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫ কোটিতে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ। শুধু তাই ই নয় আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা প্রবর্তন ও বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জনসংখ্যাকেউন্নয়ন উপযোগী মানবসম্পদে রূপান্তরের কাজটিও সহজ হয়ে যায়সেখানকারউন্নয়নসহায়ক সংস্কৃতির কারণেই এতে কোন সন্দেহ নেই।

বিপরীতে একই লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৬০ সালের ৪.৮ কোটি থেকে দ্বিগুণ ৯/১০ কোটিতে আবদ্ধ করার কথা। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬/১৭ কোটি এবং এখনো প্রতি বছর ২০ লাখ করে বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৪১ সাল নাগাদ আরও ৪/৫ কোটি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি দেশে প্রচলিত বিভিন্ন ধারার শিক্ষা কতটুকুউন্নয়নসহায়ক সে প্রশ্ন কি অবান্তর? ফলে ক্রমবৃদ্ধিপ্রাপ্তজনসংখ্যাকে সীমিত সম্পদ দ্বারা যথাযথ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে উন্নয়ন উপযোগী দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কাজটিও অধিকতর চ্যালেজ্ঞ তৈরি করে চলেছে। অথচ একটা রাষ্ট্রের উন্নয়ন স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষ ও উচ্চ উৎপাদনশীল মানবসম্পদের কোন বিকল্প এখন পর্যন্ত নেই। এখনতো আবার চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথাও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

উপরের আলোচনা থেকে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে সংস্কৃতিগতভাবে আমরা সত্যিই এ রকম একটি উন্নত রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতি গড়তে চাই কিনা। অধিকাংশ মানুষ যদি একটি  উন্নত অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে আর তা অর্জন করতে একাত্মতা পোষণ করে তাহলে এতদিনেও এটা অধরা থাকার কোন কারণ থাকতে পারে না। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণ পরস্পরের সহযোগী হিসেবে এগিয়েয়ায়।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির যেসব উপাদান কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে বাধা হিসেবে কাজ করছে তা চিহ্নিত করে দেশকে এগিয়ে নিতে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না?



অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

e-mail: mdkowsar4764@yahoo.com