বর্ষার শুরুতে দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি এরই মধ্যে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপত্সীমার কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনার পানিও। ফলে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর জেলার একাংশের নদীতীরবর্তী এলাকায় পানি ঢুকে পড়ছে। এতে নদীভাঙনের পাশাপাশি ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একইভাবে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়ও প্লাবন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে কয়েক দিন ধরে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ায় জেলাটির নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে আলোচ্য জেলা শহরের  কিছু এলাকার চলাচলের সড়ক এবং কিছু নিচু ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গেছে বলে খবর মিলছে। বলতে গেলে দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতিতে উল্লিখিত জেলাগুলোর লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ছে; বাড়ছে জনসাধারণের দুর্ভোগ। কাজেই দ্রুত বন্যা মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ দরকার।

কয়েক মাসজুড়ে চলছে করোনাসৃষ্ট মানবিক সংকট, তার মধ্যেই দেশ আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এবং এ দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন। সব ধরনের দুর্যোগেই যারা সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়ে, তাদের মধ্যে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় খাদ্য ও নিরাপদ পানির সংকট। ঘরে ঘরে খাদ্য সংকটে পড়ে মানুষ। আর বন্যাকবলিত এলাকার পানীয় জলের প্রধান উৎস অগভীর নলকূপগুলোর বেশির ভাগই তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানিপ্রাপ্তি দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে নিরাপদ পানির অভাব থেকে পানিবাহিত নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এসব বিষয় মাথায় রেখে দ্রুত ও পরিকল্পিত উপায়ে উপদ্রুত এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে ত্রাণ তত্পরতা বাড়াতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট, শিশুদের জন্য পুষ্টিকর শুকনা খাবার, ওরস্যালাইন ইত্যাদি প্রাণরক্ষা-সহায়ক উপাদানের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণ ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কেননা ত্রাণ বরাদ্দ ও তা বিতরণের ক্ষেত্রে দ্রুততা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর অনেক দুর্গত মানুষের জীবন-মরণ নির্ভর করে। শুধু সরকারি ত্রাণ তত্পরতা নয়, বেসরকারি উদ্যোগও প্রয়োজন। সমাজের ধনাঢ্য ও সচ্ছল ব্যক্তিদেরও ত্রাণ তত্পরতায় এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি, পানিতে তলিয়ে যাওয়া পরিবারগুলোকে আপাতত আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল-কলেজসহ উঁচু ভবনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মানুষের দুর্ভোগের প্রশমন ঘটে।

বিশেষত উত্তরাঞ্চলে এখন আউশ মৌসুম চলছে। এবার রেকর্ড আউশ আবাদের খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সন্দেহ নেই, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমিও তলিয়ে যাবে। অনেক কৃষকের পরিশ্রম মাটি হবে। সুতরাং অবস্থার উন্নতি ঘটলে যাতে কৃষক আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সেজন্য বীজ-সারসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা আবার চাষাবাদ শুরু করতে পারেন। করোনা সংকটে এমনিতেই আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেক্ষেত্রে আউশ আবাদ মার খেলে দেশে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তাই কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দেয়ার দিকটি বিশেষভাবে সরকারের খেয়াল রাখতে হবে বৈকি।  

আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয় সম্পর্কে আমাদের আরো গভীর ভাবনাচিন্তা দরকার। সেটি হলো, দেশের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস এবং তার ফলে প্লাবনভূমির ব্যাপক বিস্তার। বিভিন্ন গবেষণার তথ্যে উঠে এসেছে, বেশ কয়েক বছর ধরে কম পানিতেই বেশি বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এর কারণ ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা নদ-নদীর তলদেশ উঁচু হয়েছে, নাব্যতা কমেছে, এসব নদীর শাখানদীগুলোর সে াতস্বিনীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য লোপ পেয়েছে, এগুলো অনেকটা প্লাবনভূমিতে পরিণত হয়েছে। ছোট শাখা নদীগুলোর অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশের জন্য এটি সুদূরপ্রসারী উদ্বেগের বিষয়। নদী খননের মাধ্যমে উজানবাহিত পলি নিয়মিতভাবে ও দ্রুত অপসারণ করা না হলে ভবিষ্যতে দেশের বন্যার প্রকোপ ক্রমেই বাড়তে থাকবে। তাই অবিলম্বে এ বিষয়ে সক্রিয় হওয়া উচিত। তাত্ক্ষণিক দুর্যোগ মোকাবেলার তত্পরতার ভিড়ে দীর্ঘমেয়াদি এ দিকটি আমাদের ভুললে চলবে না; বরং এখানেই বন্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানটি নিহিত।