বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, করোনা মোকাবেলায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বৃদ্ধিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। তার পরও বাংলাদেশে এ ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। উদ্বেগজনক একটি খবর, বিশেষত যখন খবর মিলছে যে দেশে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। কারণ মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে তাদের শরীরে এটি আর কাজ করছে না। বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। কিছু নির্দেশনা থাকলেও বিক্রেতা বা ক্রেতা কেউই মানছেন না। ফলে নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্কে সাধারণ রোগের ক্ষেত্রেও বিনা প্রেসক্রিপশনে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বাড়ছে। অনেকে কোর্স সম্পূর্ণ না করে প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প ডোজ গ্রহণ করছেন। আর এসব কারণে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট বা ওষুধের অকার্যকারিতাও বাড়ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ীই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও সেবন করতে হবে। যদিও রাজধানীর নামিদামি দু-একটি ফার্মেসি ছাড়া বাকি সব জায়গায় প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক।
এ মহূর্তে হাসপাতালের চেয়ে বাড়িতে করোনা রোগীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি। কিন্তু কারা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেবে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কীভাবে করাবে, রোগ নিরাময় হচ্ছে কিনা কীভাবে বুঝবে, প্রয়োজনে কখন ও কীভাবে হাসপাতালে যাবে—এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ দোটানার মধ্যে রয়েছে। কারণ হাসপাতালের প্রস্তুতি, রোগী ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসক-নার্স ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা শোনা গেলেও বাড়িতে থাকা রোগীর বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য কেউ দিচ্ছে না। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সরকার বাড়িতে রোগীর সেবা দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বিভিন্ন হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরে গিয়ে সেবা না পেয়ে অনেকে ফার্মেসিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে কিছু অসাধু ওষুধ বিক্রেতা দ্রুত সুস্থতার আশ্বাসে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ওষুধ দিচ্ছে।
একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতে প্রয়োজন ১৫ বছর, অথচ এর বিপরীতে ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্স হতে দরকার এর এক-দশমাংশেরও কম সময়। সম্ভাব্য এই বিপর্যয় রোধে কী করণীয় তা সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন, কিন্তু কেউ তা গ্রাহ্য করেন না। এমনকি কোনো কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও ঢালাওভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের অভিযোগ শোনা যায়, যা একেবারে ভিত্তিহীন বলা যাবে না। সময় এসেছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কঠোরভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের। এক্ষেত্রে প্রথমেই চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, বিশ্বের অনেক দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হচ্ছে এবং তা গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও দেখা দিয়েছে। এ সংস্থা বলছে, (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: সিনথেসিস অব রেকোমেনডেশনস বাই এক্সপার্ট পলিসি গ্রুপ) অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ সমস্যা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে; প্রতিরোধের তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে এবং উন্নয়নশীল দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা হ্রাস করার কাজে সম্পদ বাড়াতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, পশুখাদ্য, মাছ ও কৃষিতে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিতে, যা দেশে ব্যবহূত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় অর্ধেক। ফলে খুব সহজেই কৃষিখাদ্যের মধ্য দিয়ে এ অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে ঢুকছে। এতে একদিকে যেমন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তেমনি শরীরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে সামান্য জীবাণুু সংক্রমণও এখন ব্যবহারকারীর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য যে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে, তা উদ্বেগজনক। অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ দেখতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, ঔষধ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ধীরে ধীরে কমে আসবে।










