পরিচিত এক তরুণের কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করছি। দরিদ্র পরিবার। বাবা শ্রমজীবী। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ছেলেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। কিন্তু পরিবারের পক্ষে লেখাপড়ার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। সে তখন একটি ব্যাংক থেকে শিক্ষা ঋণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। পড়াশোনা কয়েক বছর আগে শেষ হয়েছে। সে এখন মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনে আইটি ফার্মে চাকরি করে। আমি মাঝেমধ্যে তার কথা ভাবি আর অবাক হই। কারণ আমার পরিচিত আরেক তরুণের কথা আমি জানি। যে এমবিবিএসে সুযোগ থাকার পরও টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারেনি। পরে সে বিবিএ পড়েছে। এখন সে একটি ব্যাংকে চাকরি করে।

মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, সহায়সম্বলহীন অনেক পরিবারের শিক্ষার্থী ভালো ফল করেছে। ভবিষ্যতে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তারা বা তাদের অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আবার অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান পেয়েও টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারে না। সেসব খবর কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নজরে পড়লে তিনি তাৎক্ষণিক কিছু টাকা দিয়ে সহায়তা করেন। কিন্তু ওইসব শিক্ষার্থীর পরবর্তী সময়ে কী ঘটে তা আমরা জানতে পারি না। যদি তারা কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নেন বা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুদান পান, তাহলে সমস্যায় পড়ার কথা নয়। তবে এর অন্যথা হলে তাদের ভাগ্যে কী ঘটে তা নিয়ে আমরা আর খোঁজও রাখি না।

এসব কথা বলার কারণ, গত ২৮ মার্চ বণিক বার্তায় ব্যাংক খাতের সিএসআর (করপোরেট সোস্যাল রেসপন্সিবিলিটি) নিয়ে প্রকাশিত একটি খবর। এতে বলা হয়, সিএসআর ব্যয়ের ৩০ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার কথা থাকলেও গত বছর এ খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ অর্থ। স্বাস্থ্যে ৩১ দশমিক ২৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় হলেও পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে মাত্র ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। অন্যান্য খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ব্যয়ের কথা থাকলেও এ খাতে গেছে ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্থ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকগুলো দেশের শীতার্ত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল’-এ ৬৯ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি উপখাতে ব্যয় করেছে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জাতির জনক বিএসএমআর মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্ট আয়োজনে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ, শেখ কামাল দ্বিতীয় বাংলাদেশ ইয়ুথ গেমস উদযাপনে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এবং ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ম্যারাথন-২০২৪ টুর্নামেন্ট’ উদযাপনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনুকূলে এ অর্থ অনুদান হিসেবে দেয়া হয়েছে।

সিএসআর হলো ব্যবসায় শিষ্টাচার, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এক ধরনের দায়বদ্ধতা। এ দায়িত্ব পালনকে নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সিএসআর। এর উদ্দেশ্য ব্যবসা থেকে উদ্ভূত পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব দূর করা ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ, অসমতা ও দারিদ্র্য কমানো। বর্তমানে সারা বিশ্বে এ খাতে ব্যয়কে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।

যে চোরাগলির মধ্যে এ দেশের ব্যাংকগুলো খাবি খাচ্ছে, সেখান থেকে তাকালে কল্যাণমূলক ব্যাংকিং বহুদূরের পথ বলে মনে হয়। নীতিনৈতিকতা মেনে ব্যাংকিং করলে এ দেশের বহু সমস্যা তৈরিই হতো না। এটা ঠিক, ব্যাংকগুলোকে বায়ু বা নদী দূষণে দায়ী করলে তা কারো কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি প্রশ্ন তুলি, যে কারখানা নদীতে বর্জ্য ফেলে বা বাতাস দূষিত করে তাদের যদি ব্যাংকগুলো ঋণ না দিত! যে কোম্পানি শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করে না, তাদের সঙ্গে যদি ব্যাংকগুলো লেনদেন না করত! যে করপোরেট প্রতিষ্ঠান পরিবেশের ক্ষতি করে, তাদের যদি ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে না দিত!

সিএসআর ঠিকঠাক মানলে ব্যাংকগুলো এসব বিষয়েও নজর দিতে পারত। কিন্তু এ দেশে অস্তিত্বহীন কোম্পানিও কোটি কোটি টাকা ঋণ নেয়। অনেক পরে এসব জানাজানি হয়। ততদিনে ব্যাংকেরও আসলে করার কিছু থাকে না।

বিশ্বজুড়ে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মোটা দাগে চারটি ক্ষেত্রে সিএসআর মেনে চলে। এগুলো হচ্ছে পরিবেশ, মানবাধিকার, মানবকল্যাণ এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন, ‘‌নীতিনৈতিকতার সঠিক সংজ্ঞা কখনো নির্ণয় করা যাবে না। তবে এ অজুহাতে সুস্পষ্ট অবিচার চলতে দেয়া যায় না।’

এটা ঠিক, ব্যাংক কোনো মানুষ নয়। তার নৈতিকতা থাকার প্রশ্নই আসে না। তবে ব্যাংক যারা পরিচালনা করেন বা এর কর্মকর্তারা চাইলে নৈতিকতা মেনে চলতে পারেন। বাস্তবে যদিও তেমনটা দেখা যায় না। বিশেষ করে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভিত্তিই হচ্ছে নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলা। সেখানেও এ দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোয় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত আকবর আলি খান ‘‌ব্যাংক-ব্যবস্থা ও নৈতিকতাবোধ’ শিরোনামে নিবন্ধে এ দেশের ব্যাংক খাতের নৈতিক ঘাটতির একটি তালিকা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে মুষ্টিমেয় লোকের জন্য অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা প্রদান। দরিদ্রদের জন্য অপ্রতুল ঋণ। অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ। পরিবেশ দূষণে দায়ী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এমন প্রতিষ্ঠানে ঋণদান। দুর্বল, বঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইতিবাচক কর্মসূচির অনুপস্থিতি। ব্যাংকের মালিক ও কর্মকর্তাদের অন্যায় আচরণ।

ব্যাংক খাতে নীতিনৈতিকতা নির্ভর করে পাঁচটি ভিত্তির ওপর। এগুলো হচ্ছে সততা, সম্পূর্ণতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতা। এগুলো মেনে চললে একটি ব্যাংক টেকসই মুনাফা অর্জন করতে পারে। না মেনে চললে ব্যাংক যেকোনো সময় আর্থিক সংকটে পড়ে যেতে পারে। নীতিনৈতিকতা মানার জন্য ব্যাংকগুলো যেমন নিজেরা নীতিমালা তৈরি করে। তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নীতিমালা তৈরি করে দেয়। এছাড়া বৈশ্বিক নানা জোটে যুক্ত হয়ে ব্যাংকগুলো নীতিনৈতিকতার চর্চা করতে পারে। এমন একটি জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ব্যাংকিং অন ভ্যাল্যুস (জিএবিভি)। বিশ্বের ৪৫ দেশের ৭০টির বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ জোটের সদস্য। এর সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে। জিএবিভি মনে করে, ব্যাংক খাতে নৈতিকার অর্থ হচ্ছে ‘মানুষ ‌আগে, মুনাফা পরে।’ এছাড়া ফসিল-ফ্রি ব্যাংকিং অ্যালায়েন্সের কথা বলা যেতে পারে। বিশ্বের শীর্ষ ৬০টি বেসরকারি ব্যাংকের জোট এটি। এর সদস্য ব্যাংকগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করে না।

চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেকটেশনস’ উপন্যাসের একটি চরিত্র পিপ। বালক পিপ একবার বলেছিল, ‘‌শিশুদের ছোট্ট পৃথিবীতে যা সবচেয়ে ভালোভাবে টের পাওয়া যায়, তা হচ্ছে অন্যায়।’ এ কথা কেবল শিশুদের ক্ষেত্রে নয়, দুর্বল এবং দরিদ্রদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।

আমরা আশা করব, এ দেশের ব্যাংকগুলো আরো বেশি নৈতিকতার চর্চা করবে। উন্নয়নের পাশাপাশি বৈষম্য কমাতে চেষ্টা করবে। সিএসআর ব্যয়ে আরো সতর্কতা অবলম্বন করবে। গোষ্ঠীতন্ত্র নয়, তাদের লক্ষ্য হবে জনতুষ্টি।

হানযালা হান: কবি ও জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

বণিক বার্তা