রাস্তায় বেরোলেই বিশেষ করে বর্ষাকালে শহরের রাস্তাগুলোয় আটকে থাকা নোংরা পানি ও ময়লায় উপচে পড়া ড্রেনের আবর্জনা ঠেলে সরাতে আমরা অনেককেই দেখি। কত না সহজে তারা এসব করে, এমনকি পথচারীরাও কাপড় তুলে স্যান্ডেল পরে তার ভেতর দিয়ে হেঁটে চলে যায়। যেন উপভোগই করছে! আমাদের কতটুকু রুচি বা বিবেক তাড়িত হয় এসব দেখে? আমরা বরং বাংলার কাদা মাটি জল নিয়ে পরিষ্কার কাগজে কবিতা লিখে সময় ব্যয় করি, অথচ রুচিসম্মত উপায়ে ময়লা কাদা দূরীকরণের চাহিদা প্রকাশ করি না এবং দেখেও না দেখার ভান করি।

বড় বড় সুদৃশ্য বিল্ডিংয়ের ভেতরটা যেমন অব্যবস্থাপনার কারণে শর্ট সার্কিট বা গ্যাসের আগুনে নিমেষেই পুড়ে যায়, সেরূপ সুদৃশ্য টয়লেটের বর্জ্য সুন্দরভাবে ফ্লাশ হয়ে গেলেও আমরা তার পরিণতি দেখি রাস্তায় উপুড় করা কালো থিকথিকে স্লাজের দশায়। এই স্লাজ আটকে গেলে কিছু বিশেষ সমাজের লোক ম্যানহোলের ভেতর ঢুকে ডুব সাঁতার দিয়ে ক্লগ পরিষ্কার করে ও আমাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সুবিধা করে দেয়। 

গ্লোবাল ভিলেজ বা বৈশ্বিক গ্রামে বাংলাদেশ যেন একটা বস্তি। ফুটো থালা নিয়ে বসেই আমাদের বড়াই কত! যত মেধা দেশ গড়তে পারত, সাহস করে রাজনীতি করে দেশের অবস্থা পরিবর্তন করতে পারত, তারা সব বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। সেদেশের সিস্টেমে মানুষের মতো জীবন কাটাচ্ছে। প্রকৃতিতে শুয়োরও পরিষ্কার কাদায় গড়াগড়ি খায়। আমরা কি ওইসব প্রাণীরও অধম! আমাদের সংস্কৃতি তাদের মাংস খেতে নিষেধ করে, আর আমরা কত সহজে জানালা দিয়ে ময়লা পাশের বাড়ির উঠোনে ফেলে দিই। এসব অভ্যাস মোটেই সভ্য নয়। লুটপাট সংস্কৃতির এই দেশে যেখানে নৈতিক দূষণে সকল কারবার আক্রান্ত, তখন সংসার চালানোর মত করেই কোনরকমে সরকার এদেশ চালাতে থাকে। প্রজেক্টগুলো থাকে অবহেলায়, আর লুটপাট হয় অর্থ। আমরা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় কতটুকু মনোযোগ দিই। সেটাকে মানবীয় করতে, উন্নত করতে। আমরা কথায় কথায় সিঙ্গাপুর হয়ে যাই, থাইল্যান্ড হয়ে যাই, হয়ে যাই রোল মডেল। কিন্তু কার্যত আমরা আমরাই।      

পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কাজ কে সহজ করুন। টয়লেট প্যানের মধ্যে চুলের অংশ বা ময়লা ফেলবেন না। রান্নাঘরের ময়লা, যার মধ্যে জৈব পচনশীল বস্তু থাকে তার মধ্যে প্লাস্টিক, কাচ বা পিন ফেলবেন না। সভ্য সমাজের মতো বাস করুন। আমার আপনার সামান্য পরিশ্রম, যে সর্টিংয়ের জন্য আলাদা আলাদা কন্টেইনার সরকারের তরফ থেকে বসানোর ব্যাবস্থা করার দরকার, সেটুকু করুন। এর জন্য দাবি তুলুন। সকল সভ্য দেশে এ সিস্টেম আছে। রাস্তায় থুথু কফ না ফেলার অভ্যাস করুন। পাবলিক টয়লেট প্রচুর সংখ্যক স্থাপনের দারি তুলুন। 

নতুন পরিবেশ আইন প্রণয়ন দরকার। তার আগে অবশ্যই সিটি প্ল্যানিং, ওয়াটার ক্লগিং ও লগিং দূর করার জন্য যা যা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োজন তা বাস্তবায়ন করা দরকার। 

আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে ওইসব পরিচ্ছন্ন কর্মীদের এ যাবত অবদানের জন্য বিশেষ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। যথেষ্ট টাকা পয়সা এবং তাদের সম্মানজনক পেশা পরিবর্তনে সুযোগ সৃষ্টি করা। নইলে তিন পুরুষ বসে বসে ভাতা পাক কোনো সমস্যা হবে না, সরকারের তরফ থেকে এরকম উদ্যোগ নেয়া দরকার।

এদের সামাজিক অস্তিত্ব সমাজের জন্য অভিশাপ। এদের অচিরেই আপন কাজ ত্যাগ করে যেকোনো পেশায় ফিরে যেতে পারার মানবিক সুযোগ যেন অন্তত পরবর্তী বংশধরেরা পায় ও পরিচ্ছন্নতা কর্ম যাতে স্বয়ং ‘পরিচ্ছন্ন’ ও সিস্টেমের মধ্যে হয় সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের। ভদ্রলোকের ছেলে মেয়েরাও যাতে অফটাইমে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে ও পরিচ্ছন্নকর্মী যেন কোনো সমাজ নির্দিষ্ট না হয়, আমাদের সেভাবেই আরবান প্ল্যানিং করতে হবে। আমরা যদি এই পরিবর্তন আনতে পারি কিছু জাতিভেদের সমাজ আমাদের বা পরবর্তীতে তাদের যত ছোটলোক বলে হেয় চোখে দেখার প্রবণতা দেখাক না কেন, আমরা যেন বলতে পারি, আমরা সভ্য। এ কাজ এ দেশে অসম্ভব মনে হতে পারে, কিন্তু সভ্যতার দাম এখানেই। আমাদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।  

আমাদেরই দেশে সাঁওতালদের পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস লক্ষ্যণীয়। তারা চমৎকারভাবে তাদের দাওয়া পরিষ্কার ও শিল্পমণ্ডিত করে সাজায় ও তারা খুবিই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এদেশের ধুলো কাদার টেক্সচারই এমন যে থিকথিকে কাদা তৈরি করে; কি গ্রামে কি শহরে। বহুকাল আগে গৌড় নগরী ছিল মাটির তৈরি দুর্গ ও পরিষ্কারভাবে নিকনো একটি পরিচ্ছন্ন শহর। ধারণা করা হয় সাঁওতালরাই গড়েছিল ওই শহর। দূষণের কারণেই পরবর্তীতে প্লেগে শহরটি উজাড় হয়ে যায়।   

আমাদের দেশের কাদা কীভাবে ম্যানেজ করা যায় ও যেখানে সেখানে ভরাট করে গায়ে গায়ে বিল্ডিং না তুলে যাতে আরবান প্ল্যানিং ঠিকমত হয় সেজন্য সরকারের তরফ থেকে মেগা প্ল্যান জরুরি। মেট্রোরেল বা আকাশ রেলের চোখ ধাঁধানো উন্নতির চাইতে এগুলো অনেক বেশি জরুরি। জরুরি বদ্বীপ অঞ্চলের ভৌগলিক ট্রেন্ডটা বোঝা। কীর্তিনাশা পদ্মার জল যেমন কোনদিনও সুদৃশ্য নীল হবে না পলির কারণে, যেমন তা স্থাপনা ভাঙ্গবে ও নতুন ভূমি গড়বে, সে কথা মাথায় রেখেই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিল্ডআপ করতে হবে। শুনতে অসাধ্য হলেও, আমরা এতো অভিশপ্ত নই যে, চিরকাল কবিতার কাগজ নিয়েই ‘সবুজ করুণ ডাঙা’র গান গাইতে হবে। আমাদের দেখতে হবে কোথায় আমাদের আশীর্বাদ। অবশ্যই বাংলার তিন ফসলী জমিতে ও এর উর্বরতায়। সাইক্লোনপ্রবণ এ জলবায়ুতে বা বন্যাপ্রবণ এ দেশে অনেক কিছুই অনিশ্চিত। কিন্তু আমরা পানির উপর ভাসমান একটি দেশ। অনেক দেশেই মিষ্টি পানির অভাব। আমরা সে দুর্ভোগ থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু নেহাত অভ্যাসের বসে আমাদের পরিবেশের এ বেহাল অবস্থা। নদী শাসন সম্ভব। আমাদের এ ব্যাপারে অনেক গবেষণা ও ইউনিক প্ল্যানিং প্রয়োজন ও এক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার প্রয়োগ দেখাতে হবে।  

অতএব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমাদের নিজস্ব কায়দায় উদ্ভাবনী হতে হবে। আসুন এ দেশ কে আমরা ঢেলে সাজাই, শিক্ষা দিয়ে দার্শনিকের প্রজ্ঞাচক্ষু দিয়ে। আমরা অবশ্যই সফল হবো। কিন্তু তার আগে এ ব্যাপারে আমাদের সিরিয়াস হতে হবে।

 চারু ফেরদৌসী নাঈমা

পরিচালক, দূষণ মুক্ত প্রযুক্তি জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট