জ্বালানি খাত একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট নিরসনে উন্নত দেশগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি মজুদ করে তুললেও আমদানিনির্ভর হওয়ার ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সংকট মোকাবেলা বেশ কঠিন। তবে সার্বিকভাবে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ২০৪১ সালে মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের যে মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে সেটি বাস্তবসম্মত হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার অসংগতিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালের মধ্যে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট ১০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল সরকারের। সেখানে এখন পর্যন্ত অর্জন ৪ শতাংশের নিচে। এমন বাস্তবতায় আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রেখে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। মূলত এ কারণেই ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যকে সিপিডি বাস্তবসম্মত বলে মনে করছে না।

জ্বালানি বিভাগের সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনার (আইইপিএমপি) খসড়ায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং দিকনির্দেশনা রয়েছে। খসড়ায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলা হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখার কথা বলা হয়নি, বরং ভোক্তার ওপর উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের ব্যয়ের চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আমরা এমনিতেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় জ্বালানি খাতে পিছিয়ে আছি। সরকার বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা বারবার বদল করেছে। আইইপিএমপিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়নি, তবে অবহেলিত হয়েছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যেভাবে চিন্তা করা দরকার সেটা পর্যাপ্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বস্তুত খসড়াটি এখন পর্যন্ত যেভাবে রয়েছে প্রকারান্তরে তা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসকে (এলএনজি) উৎসাহিত করছে। ক্ষেত্রবিশেষে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও উৎসাহিত করছে বলেও আভাস মিলছে।

বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় সরকার প্রথমে গ্যাস থেকে কয়লায়, এখন কয়লা থেকে সরে এলএনজি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার কথা ভাবছে। এক্ষেত্রে ২০৪০ সালের মধ্যে অন্যান্য বড় লক্ষ্যমাত্রার মতোই দেশের মোট জ্বালানির ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রাকে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভাবাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে জ্বালানির ধরনও বদলে যাচ্ছে। তাই প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আটকে থাকার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি চাহিদা নিরূপণ জরুরি। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের আস্থা তৈরি করা দরকার।

বারবার সংশোধন না করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদে দুই বছর ও দীর্ঘমেয়াদে ১০ বছরের পরিকল্পনা রাখার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে ঘাটতি কমে আসবে। চাহিদা ও সরবরাহ নজরদারির জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

দেশে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করেই এখন জ্বালানি চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ফলে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত চাপে আছে। ভর্তুকি বাড়িয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সংকট উত্তরণে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর কথাও বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে রফতানিমুখী শিল্পের দিন দিন প্রসার ঘটছে। এ শিল্পকে প্রতিযোগী সক্ষম করে তুলতে হলে উৎপাদন ব্যয় সীমিত রাখতে হবে। তার জন্য অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক দামে নিরবচ্ছিন্ন মানসম্পন্ন জ্বালানি জোগানো প্রয়োজন, যা আমদানিনির্ভরতার মাধ্যমে সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনৈতিক স্বার্থেই রাষ্ট্রীয় নীতি-কৌশলে নিজস্ব জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া জরুরি।

স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভর করে দীর্ঘ সময় অর্থনীতির চাকা সচল রাখে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে এসে গ্যাস সংকট জ্বালানি খাতে ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ সময়ে আমদানীকৃত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় নির্ধারণ হয় যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখবে কয়লা, যার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হবে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি শুরু হয়। এর মাধ্যমে গ্যাস সংকট কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এরই মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে দিতে হচ্ছে বিপুল ভর্তুকি। আমদানি করা জ্বালানির একটি বড় অংশ যাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ২০১৬ সালে পাওয়ার প্লান্ট মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ ভাগ আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর হবে। এ রকম পরিকল্পনাগত ভুলের কারণেই বর্তমান খসড়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, কিন্তু সেখানেও সঠিক পরিকল্পনার অভাব দেখা যাচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে লক্ষ্যমাত্রাটি স্লোগানের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। কপ২৬-এর আগে বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল, সেটি আমলে নিয়েই কি খসড়া মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে না বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে হয়েছে, সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিদ্যুৎ খাতে আমাদের এখন পর্যন্ত যে অর্জন, ২০৪০ সালে সে লক্ষ্যমাত্রায় আমরা যেতে পারব কি না সেটি একটি বড় বিষয়। এজন্য প্রযুক্তি ও অর্থায়নেরও প্রয়োজন আছে। সেটা থাকলে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা যাবে। আগের পরিকল্পনাগুলোয় যে হারে যাওয়া হয়েছে সে হারে না, এটাকে আরো উল্লম্ফন দিয়ে যেতে হবে। এর জন্য দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নেয়ার প্রয়োজন পড়বে।

এখানে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে অনেকেরই স্বার্থ রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৌশলগত উপাদানের ক্ষেত্রে বাইরের স্বার্থ পেছনে ফেললে দেশের স্বার্থটা কী হবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া হচ্ছে। খসড়ায় যে ধরনের প্রযুক্তির কথা বলা হচ্ছে, অনেক দেশ এগুলো বাদ দিচ্ছে। কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ, এটা অনেক দেশ এখন আর ব্যবহার করছে না। কারণ এর ফলে প্রচুর অর্থ ও জায়গার প্রয়োজন পড়ে। সেখানে যে বিনিয়োগ হয় সেটা লাভজনক হয় না। এর ফলে উন্নত দেশ এটি বর্জন করেছে, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতেও যা উৎপাদন করা হবে সেটি লাভজনক না হলে সেক্ষেত্রে বিনিয়োগ না করাটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করবে।

এছাড়া সুশাসনের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও গ্রিডে দেয়া যাচ্ছে না। মানুষ সুলভ মূল্যে বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। অন্যদিকে ক্রমান্বয়ে বিরাট অংকের ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। এদিকে সাধারণ মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে। জ্বালানির মূল্য যৌক্তিকীকরণের বিষয়টি সাধারণ মানুষের ওপর এসে পৌঁছায়। যেখানে সুশাসন নিশ্চিত করলে বড় রকমের সাশ্রয়ের পাশাপাশি আধুনিক টেকসই জ্বালানি খাত তৈরি করা যাবে, সেদিকে সরকারের নজর দেয়া উচিত। অন্যদিকে আইইপিএমপি প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ নেয়া হলেও তা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু জ্বালানি সংকট নিরসনে বেশির ভাগ নীতি-কৌশল ও উদ্যোগই এখন আমদানিকেন্দ্রিক, যা অনেক ব্যয়বহুল। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্বারোপ ও সুশাসনের প্রতি সিপিডির পক্ষ থেকে যে তাগিদ দেয়া হয়েছে তা বাস্তবসম্মত। এটা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।