পারস্পরিক শান্তি ও সৌহার্দেরে বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবারো এল পবিত্র ঈদুল আজহা। আজ সব ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন। ত্যাগই কোরবানির প্রধান মর্মবাণী হলেও আমাদের সবসময় তা স্মরণে থাকে না; এ সময় অনেকের মধ্যে ত্যাগের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোগবিলাস, অপচয়। আধ্যাত্মিকতাকে ছাপিয়ে যায় বস্তুগত আনুষ্ঠানিকতা। কোরবানির মধ্যে যে উৎসর্গের মহিমা রয়েছে, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোজনের উৎসব। ঈদুল আজহায় কোরবানির মধ্য দিয়ে স্রষ্টার প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি সামাজিক কিছু কর্তব্য পালনের তাগিদও বিদ্যমান। দেশে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ দুই বেলা অন্ন জোগাতে পারে না, অপুষ্টিজনিত রোগব্যাধিতে ভোগে অনেক শিশু। তাদের মাথার ওপর আচ্ছাদন নেই বলে তারা রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে। অন্নহীন, বস্ত্রহীন, বাসস্থানহীন এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা ভাবা সামর্থ্যবানদের একান্ত কর্তব্য। আলোচ্য উৎসবে আমরা যেন এটি বিশেষভাবে মনে রাখি।
এবারের কোরবানির ঈদ এমন এক সময়ে পালিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশে কভিড-১৯ মহামারী চলমান। এ রোগের সংক্রমণে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোক। এ রোগের বাহক নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। কিন্তু আমরা দেখছি যে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলছে না, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে জনসমাগমে যাচ্ছে। ফলে সংক্রমণের মাত্রাও বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাবধানতা অবলম্বন করা না হলে ঈদুল আজহার এই মৌসুমে দেশে সংক্রমণের হারে আরো বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে। এতে রোগ নিয়ন্ত্রণ আমাদের জন্য আরো কঠিন হবে বৈকি। তারা এজন্য অনলাইনভিত্তিক পশুর হাটের ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের পরামর্শ মোটামুটি জনপ্রিয়ও হয়েছে। ভিড় এড়াতে অনেকেই বিশেষত শহরাঞ্চলে অনলাইন হাট থেকে কোরবানির পশু কিনেছেন। এটি ইতিবাচক দিক। অনলাইন হাটের উদ্যোক্তারা বাসায় বাসায় ক্রয়কৃত পশু এরই মধ্যে পৌঁছে দিয়েছেন। আগামীকালই সারা দেশে পশু কোরবানি শুরু হবে। পশু জবাই করা একটি দলবদ্ধ কাজ। এক্ষেত্রে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন। চিকিৎসকরা যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্ব যেন বজায় রাখা যায়, তার পরামর্শ দিচ্ছেন। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলছেন। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সব ধরনের স্বাস্থ্য নির্দেশনা পরিপালনে উদ্যোগী হতে হবে।
কোরবানির ঈদে একটি বড় ইস্যু হলো কাঁচা চামড়ার বেচাকেনা। এ উৎসবে জবাইকৃত পশুর চামড়ার ওপর আমাদের চামড়া শিল্পগুলো অনেকখানিই নির্ভরশীল। এরই মধ্যে সরকার কিছুটা কমে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এছাড়া কাঁচা চামড়া যেন অবিক্রীত না থাকে সেজন্য রফতানির সুযোগও করে দেয়া হয়েছে। সেদিক থেকে এ খাতে মৌসুমি লগ্নিকারীদের খুব একটা সমস্যায় পড়তে হবে না। তবে কাঁচা চামড়া ঘিরে সংক্রমণ বৃদ্ধির একটা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এ দিকটি সংশ্লিষ্টদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে বৈকি।
নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি দেশে এখন ডেঙ্গু মৌসুম চলছে। সেক্ষেত্রে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে এবার বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ময়লা-আবর্জনা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনা গেলে এডিস মশার বিস্তার বাড়বে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটবে। এ সমস্যা এড়াতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর নির্ধারিত স্থানগুলোতেই পশু কোরবানি করা উচিত। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত সরিয়ে ফেলার জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে তত্পর থাকতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মানুষ নিজ নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে উদ্যোগী হলে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কাজ অনেকটাই সহজ হতে পারে।
ভীষণ এক ক্রান্তিকালে এবার ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে। সবাই আমরা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার মধ্যে নিজেদের দিন যাপন করছি। তাই প্রত্যেকেরই আরো বাড়তি সচেতনতা ও সাবধানতা দরকার। ঈদুল আজহা সবার জন্য নিরাপদ হোক, পবিত্র উৎসবটির আনন্দ অমলিন থাকুক, এই কামনা করি। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।










