দাবি করা হয়, কভিড-১৯ সাত লাখের বেশি মানুষের জীবন ছিনিয়ে নিয়েছে, এতে ১৯ মিলিয়নেরও বেশি লোক সংক্রমিত হয়েছে এবং এ সংকট ধনী-দরিদ্র উভয় ধরনের অর্থনীতিগুলোকে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে চলমান মহামারীতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নজিরবিহীন মন্দার মুখোমুখি হলেও দেশগুলোর মধ্যে নীতি সাড়ার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পার্থক্য রয়েছে। বিশেষত ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার বৈসাদৃশ্য বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। 

উভয় অঞ্চলই সন্দেহাতীতভাবে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন প্রাক্কলন করেছে যে ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতি  (যা ২০১৯ সালে ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল) এ বছর ৮ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। আসিয়ান+৩ ভুক্ত দেশগুলোর (ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থ্যাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম প্লাস চীন, হংকং, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে চলতি বছর শূন্য শতাংশে নিমজ্জিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানে নজিরবিহীন মুদ্রাগত ও আর্থিক প্রণোদনার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে উভয় অঞ্চলের নীতিনির্ধারকরা আগ্রাসীভাবে সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন-বিন্যাস, নাজুকতার কারণে দেশ ও অঞ্চলভেদে প্রণোদনার আকার, সারাৎসার ও বণ্টনও খুব ভিন্ন হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলে সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতির জন্য বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশ ছাড়াতে পারবে না এ ধরনের নীতি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। অবশ্যই যেহেতু দেশগুলোর রাজস্ব ও আর্থিক পরিসরে তাত্পর্যজনক পার্থক্য আছে, কাজেই ওইসব দেশের প্রতিটিতে প্রণোদনার আকারেও ব্যাপকভাবে ভিন্নতা দেখা গেছে। ইতালি যেখানে জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, সেখানে আয়ারল্যান্ডের মতো অন্য দেশগুলোয় তা কয়েক শতাংশীয় পয়েন্ট মাত্র।

আসিয়ান+৩ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রণোদনার আকারের মাত্রা সংকীর্ণতর, তবে পার্থক্য খুব বেশি নয়। জাপানের প্রণোদনা সবচেয়ে বড়। এটি জিডিপির ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে অন্য দেশগুলোয় তা জিডিপির ১০ শতাংশের কাছাকাছি। সব মিলিয়ে অপ্রত্যক্ষ আর্থিক পদক্ষেপসহ (যেমন ডেট মরাটরিয়াম) ইউরো অঞ্চলে প্রণোদনার পরিমাণ দাঁড়ায় জিডিপির ২৯ শতাংশ এবং আসিয়ান+৩ অঞ্চলে তা জিডিপির ১৩ শতাংশ। 

সংকট উত্তরণে প্রণোদনার আকারে উভয় অঞ্চলের পার্থক্য অংশত ব্যাখ্যা করা যেতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহূত গ্যারান্টির পরিধির ভিত্তিতে। ইউরো অঞ্চলে জিডিপির ৫ দশমিক ৩ শতাংশের সমপরিমাণ নেয়া বিবেচনামূলক বাজেটারি পদক্ষেপ প্রায় জিডিপির ২১ শতাংশের তারল্য সুবিধা দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে পাবলিক গ্যারান্টি স্কিম, যা অর্থনীতিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তারল্য প্রবাহিত করে।

এশিয়ান+৩ অঞ্চলের অর্থনীতিগুলোও প্রায় একই মাত্রার (গড়ে জিডিপির ৫ দশমিক ১ শতাংশ) বিবেচনামূলক আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সেটি কেবল জিডিপির ৫ শতাংশ সমপরিমাণ লিকুইডিটি-সাপোর্ট স্কিম (সাময়িক ঋণ সহায়তা ও মরাটরিয়ামসহ) দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। করের পরিধি ও সোস্যাল কন্ট্রিবিউশন ডেফারেলও ইউরো অঞ্চল এবং আসিয়ান+৩ অঞ্চলের মধ্যে তুলনাযোগ্য।

উভয় অঞ্চল পরিবারগুলোর আয় জোগানেও পদক্ষেপ নিয়েছে, যদিও এখানেও কাঠামোগত পার্থক্য বৈসাদৃশ্যমূলক অ্যাপ্রোচ নেয়ায় ভূমিকা রেখেছে। 

ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো স্বল্প সময়ের ওয়ার্ক কমপেনসেশনের মাধ্যমে জব-রিটেনশন স্কিমগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা জুগিয়েছে। এটি অংশত ওই অঞ্চলের জোরালো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি প্রতিফলন। অন্যদিকে আসিয়ান+৩ দেশের অনেকগুলোয় (যেখানে বৃহত্তর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, অধিক নমনীয় শ্রমবাজার এবং দুর্বলতর সামাজিক নিরাপত্তা জাল রয়েছে) প্রত্যক্ষ আয়-পৃষ্ঠপোষকতা কার্যকর প্রমাণ হয়েছে।   

অধিকন্তু, করায়ন, বেকারত্ব ভাতা ও সামাজিক সুবিধার সম্প্রসারণের মতো অটোমেটিক স্ট্যাবিলাইজারগুলো ইউরো অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে, যেখানে সেগুলোর পরিমাণ প্রায় জিডিপির ৫ শতাংশ। আবার অধিকাংশ আসিয়ান+৩ অর্থনীতিগুলোয় এ ধরনের স্ট্যাবিলাইজারগুলোর পরিমাণ হবে জিডিপির মোট ১ দশমিক ১ শতাংশ।

আরেকটি  উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক। আসিয়ান+৩ অঞ্চলের মতো ইউরোপে বিদ্যমান কাঠামোগুলো আঞ্চলিক পর্যায়ে পরিপূরক নীতি উদ্যোগের সুযোগ দেয়। এমনকি ইইউ চালুর আগে থেকেই ওই অঞ্চলে নজিরবিহীন ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর (৮৮৬ বিলিয়ন ডলার) সমপরিমাণ রিকভারি ফান্ড রয়েছে। এছাড়া অর্থমন্ত্রীরা মোট ৫৪০ বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ তিনটি কর্মসূচির ব্যাপারে সম্মত হয়েছিলেন।

প্রথমত, ইউরোপীয় কমিশনের সাপোর্ট টু মিটিগেট আনএমপ্লয়মেন্ট রিস্কস ইন অ্যান ইমার্জেন্সি (এসইউআরই) কর্মসূচি সদস্য দেশগুলোকে অনুকূল শর্তের অধীনে ১০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি ঋণ জোগাতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ২০০ বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ তহবিল সঞ্চালনের মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাহায্য করতে সদা প্রস্তুত। শেষত, দি ইউরোপিয়ান স্ট্যাবিলিটি ম্যাকানিজম’স প্যানডেমিক ক্রাইসিস সাপোর্ট ক্রেডিট লাইন কভিড-১৯ সংকটের সময়ে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ব্যয়ে ২৪০ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত জোগাবে।

অবশ্যই ইউরো অঞ্চলের একীভূত কাঠামোও ঝুঁকি সৃষ্টি করে, বিশেষত যদি কভিড-১৯ সংকট সদস্য অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ডাইভারজেন্স অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে শক্তি জোগায়। রিকভারি ফান্ডসহ কিছু ইউরো অঞ্চলব্যাপী উদ্যোগ এ ঝুঁকি প্রশমনের উদ্দেশ্যেই নেয়া হয়েছে।

মুদ্রানীতিভিত্তিক অ্যাপ্রোচের ক্ষেত্রেও উভয় অঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার কমানো এবং তারল্য প্রবাহিত করায় মনোযোগ দিয়েছে। আসিয়ান+৩ অর্থনীতিগুলো প্রধান পদক্ষেপগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক ঋণদান কর্মকাণ্ডে নির্বাচনের সরকারি গ্যারান্টি প্রদান, সাময়িক অর্থায়ন লাইন নিশ্চিত এবং করপোরেট-বন্ড কেনা অন্তর্ভুক্ত করেছে। অধিকন্তু, বিধিমূলক পরিত্রাণ-নিবৃত্তি ঋণগ্রহীতাদের কিছুটা স্বস্তি জোগাতে সুসংহত ব্যাংকিং খাতকে উৎসাহ দেয়।

অন্যদিকে উন্নত অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার কমানোর কমই পরিসর ছিল। ফলে তারা ব্যাপকভাবে কোয়ান্টেটিভ ইজিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ১২০ বিলিয়ন ইউরোর সম্পদ-কেনা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে এবং সাময়িকভাবে ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ একটি নতুন প্যানডেমিক ইমারজেন্সি পারচেজ প্রোগ্রাম চালু করেছে, যা পরবর্তী সময়ে ৬০০ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে।

কভিড-১৯ মহামারী কাঠামোগত পার্থক্য, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পথ এবং সরকার ও আর্থিক ব্যবস্থাগুলো ক্রাইসিস রেসপন্স অবয়ব দিতে কতটা বাফার তৈরি করেছে, তাতে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদি ইমারজেন্সি অ্যাকশন এর শুরু মাত্র। 

এটা বলা অসম্ভব যে কভিড-১৯ সংকট কীভাবে নিরসন হবে। সংক্রমণের নতুন তরঙ্গগুলো নতুন করে লকডাউন আরোপের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ব্যাহত করতে পারে এবং আর্থিক চাপ তীব্রতর করতে পারে। সেক্ষেত্রে বাড়তি প্রণোদনার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। 

এমনকি তুলনামূলকভাবে দ্রুত ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এলেও এ সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের পথ দীর্ঘ হবে। ইউরোপ ও এশিয়ায় অভিন্নভাবে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই জরুরি পদক্ষেপগুলোকে কীভাবে আরো টেকসই নীতিতে রূপান্তর করা যায়, সেটি বিবেচনা শুরু করতে হবে। তাদের অ্যাপ্রোচগুলো একই না-ও হতে পারে, তবে লক্ষ্যগুলো একই হবে। আর তা হলো নিজস্ব অর্থনীতিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাগুলোর সুরক্ষা প্রদান। 

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

হো ই খর: আসিয়ান+৩ ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ

রল্ফ স্ট্রচ: ইউরোপিয়ান স্ট্যাবিলিটি ম্যাকানিজমের মুখ্য অর্থনীতিবিদ

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির