বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত কলেবরে বেড়েছে, ডিসপোজেবল বা একবার ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এ বর্জ্যের বেশির ভাগই কম-বেশি সংক্রামক, এগুলোর মাধ্যমে রোগের সংক্রমণ বাড়তে পারে। চিকিৎসা বর্জ্যকে অবশ্যই জনস্বাস্থ্যসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। প্রতি বছর চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বের প্রায় ৫২ লাখ মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি, নানা ধরনের চর্মরোগ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহসহ অনেক রোগ ছড়াতে পারে চিকিৎসা বর্জ্যের অনিরাপদ নিষ্কাশনের জন্য। আর হাসপাতালে ভর্তি অনেক সাধারণ রোগীও এসব রোগে আক্রান্ত হয়। ব্র্যাক জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি পরিচালিত ‘কভিড-১৯ মহামারীকালে কার্যকর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’-বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা বর্জ্যের মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশের সঠিক ব্যবস্থাপনা হয়। বাকি ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ বর্জ্যই সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী, হাসপাতাল নকশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্কাশন ব্যবস্থা। বিশ্বের বেশির ভাগ হাসপাতালেই মেডিকেল ইনসিনেরেটর ও অটোক্লেভ বা দাহন যন্ত্রসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা আছে। আর তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। এভাবে মারাত্মক বর্জ্যকে দূষণমুক্ত করে সাধারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যান্য তরল বর্জ্যের সঙ্গে নিষ্কাশন করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে চিকিৎসা বর্জ্যের নিষ্কাশনের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা মানসম্মত আধুনিক ব্যবস্থা চালু নেই। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অথচ এটি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের উদাসীনতা লক্ষণীয়। ২০০৮ সালে চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্কাশন নিয়ে আইন হলেও তা দুর্বল। আইনে যতটুকু বিধান রয়েছে, তাও হাসপাতালগুলো পরিপালন করছে না নজরদারির অভাবে। ত্রুটিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য হাসপাতালকে বড় ধরনের জরিমানা বা শাস্তি প্রদান করা হয়েছে বলেও শোনা যায় না।
বাংলাদেশে চিকিৎসা বর্জ্যের নিষ্কাশন সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সে ব্যবস্থাটি প্রাচীন এবং আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তার বাস্তবায়নও নেই। আইনটি ন্যূনতম বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকলেও দেশের হাসপাতালগুলোর চারপাশের ডাস্টবিনে পড়ে থাকা ব্যবহূত বর্জ্যের ব্যাগ পড়ে থাকত না, একশ্রেণীর মানুষ ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে আনা সিরিঞ্জ পরে বাজারজাত করত না কিংবা দেশের এক-তৃতীয়াংশ ইনজেকশন গ্রহণকারীকে ব্যবহূত সিরিঞ্জ দিয়ে ইনজেকশন নিয়ে দুরারোগ্য রোগে ভুগতে হতো না। এই অব্যবস্থাপনার কারণেই বর্জ্য সংগ্রহকারীর অধিকাংশই নানা রোগে ভোগেন।
দেশে হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে মূলত হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাও আবার সীমিত পরিসরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম শহরে। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্য নিয়মমাফিক বা পরিবেশসম্মত উপায়ে সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং বা ধ্বংস করা হয় না। আবার মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা আছে। যেখানে কালার কোড অনুযায়ী চিকিৎসা বর্জ্য পৃথকীকরণ, প্যাকেটজাত, পরিবহন, মজুদ ও বিনষ্টকরণের নিয়ম বলা আছে। কিন্তু সেই বিধিমালা কতটা মানা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ২০০৮ সালের চিকিৎসা বর্জ্য নিষ্কাশনসংক্রান্ত আইনটি সংশোধন করা প্রয়োজন। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে মেডিকেল ইনসিনেরেটর ও অটোক্লেভসহ আধুনিক ব্যবস্থা। তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী-কর্মকর্তার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বর্জ্য অব্যবস্থাপনাজনিত জনস্বাস্থ্যের হুমকি মোকবেলায় দরকার এ-সংক্রান্ত আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন। সংশ্লিষ্টদের উচিত বড় হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব নিরাপদ বর্জ্য ধ্বংসের ব্যবস্থা তৈরিতে বাধ্য করা। এ-সংক্রান্ত মনিটরিং জোরদার করা। সর্বোপরি রাজধানী এবং এর বাইরে নগরভিত্তিক বৃহদাকার চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা দরকার অনতিবিলম্বে। বিদ্যমান কাঠামোয় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা উদ্যোগ নেই, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এ সংকট সমাধান সম্ভব।










