কভিড-১৯ মহামারীর অর্থনৈতিক পরিণাম অপরিমেয় ও সর্বব্যাপ্ত। এর শিকার থেকে দেশের এসএমই খাত তথা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও বাদ নেই। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গৃহীত অঘোষিত লকডাউনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা এ খাত। অনানুষ্ঠানিক খাতটিতে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়োজিত। বলা চলে, দেশে মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় চালক এসএমই। কিন্তু লকডাউনের সময়ে এ খাতের অনেক কর্মীই কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন, তাদের জীবিকা সংকটে পড়েছিল। কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এ প্যাকেজ বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। এখন নতুন স্বাভাবিকতায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলছে। এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। তবে এ মুহূর্তে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে অর্থায়ন চ্যালেঞ্জ। লকডাউনের সময়ে কর্মীদের মজুরি পরিশোধ, ভবন ভাড়াসহ অন্য পরিচালন ব্যয়ের কারণে তারা মূলধন হারিয়েছে। আবার চাহিদাজনিত মন্দায় নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় আয়ও হারিয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাপকতর অর্থ সংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এমন এক বাস্তবতায় তারা প্যাকেজভুক্ত ঋণ সুবিধা পেতে ভীষণভাবে আগ্রহী। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেকটা কমিয়ে দেয়া হলেও তাদের জন্য সুদহার এখনো একটা ফ্যাক্টর, তদুপরি গ্রেস পিরিয়ডসহ অন্য ঋণ শর্তগুলো খুব একটা অনুকূলে নয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ব্যাংকগুলো বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যতটা আগ্রহী, ততটা তাদের বেলায় নয়। এর কারণ হিসেবে তহবিল ব্যয় বেশি হওয়া এবং ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা উঠে এসেছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি বর্তমানে অনেক বেশি দুষ্কর হয়ে উঠছে। অনেকদিন পর্যন্ত খুব কমসংখ্যক এসএমই উদ্যোক্তাই ঋণ পেয়েছেন বলে খবর মিলছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ও নজরদারি জরুরি।

লক্ষণীয়, দেশের সবচেয়ে শ্রমঘন খাত হলো এসএমই। সংকুচিত শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের স্ফীতি ঘটাতে হলে এ খাতকে চাঙ্গা করার বিকল্প নেই। আলোচ্য খাতের অর্থায়ন সংকট দূর করা না গেলে তা কখনই সম্ভব নয়। কাজেই এ সমস্যা সমাধানে ব্যাংকগুলোকে যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি অর্থায়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অন্য বাধাগুলোও নিরসন করতে হবে। ঋণ পাওয়া সহজতর করতে সম্প্রতি সানেম আয়োজিত ওয়েবিনারে বক্তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের শর্ত শিথিল, সুদহার আরো কমানো এবং ব্যাংকের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণের প্রস্তাব দিয়েছেন। আলোচ্য প্রস্তাব বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। সুতরাং বিষয়টি আমলে নিয়ে নীতিনির্ধারণের সক্রিয়তা প্রত্যাশিত।

কভিড-১৯ একটি বৈশ্বিক সংকট। এতে অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এ চ্যালেঞ্জ আরো বেশি; যেহেতু আয়তন অনুপাতে দেশে সার্বিক জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী অনেক বেশি। তদুপরি বাইরে কাজ হারিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকও দেশে ফেরত আসছেন। ফলে বেকারত্বের হার বাড়ছে দেশে। তাই এক্ষেত্রে এসএমই খাতই হলো আমাদের জন্য বড় সহায়। এ খাতে স্বল্পসময়ে বেশি কর্মনিয়োজন নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য এ খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে এসএমই খাতের ঘুরে দাঁড়ানো নিশ্চিত করলে শুধু দেশীয় পরিসরে নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও চোখ রাখতে হবে। অন্য দেশগুলোও আমাদের মতো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের নীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, সেটি পর্যালোচনা করতে হবে। উন্নত দেশগুলো না হলেও আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে চলমান সংকটে এসএমই খাতকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতা আমলে নিতে হবে। ছোট ছোট উদ্যোগ হওয়ায় বড় শিল্পের তুলনায় এসএমইর ঘুরে দাঁড়ানো সহজ। এতে সুফল দ্বিবিধ। এক. অর্থনীতির দ্রুত উত্তরণ ঘটে এবং দুই. কর্মসংস্থান বাড়ে। এটি মাথায় রেখে আলোচ্য খাতকে এগিয়ে নিতে সব ধরনের নীতিসহায়তা সরকার অব্যাহত রাখবে, এটিই প্রত্যাশা।