কথাশিল্পী ও শিক্ষক শওকত আলী (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬-২৫ জানুয়ারি ২০১৮) বা আমাদের শওকত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার অনেক আগেই তাঁর লেখালেখির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সে পরিচয় ছিল একজন শক্তিশালী লেখকের সৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগের আনন্দঘেরা। শওকত ভাইয়ের লেখা পড়ার সুযোগ হয় প্রথম সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। সম্ভবত প্রথম দেখাও হয় সেখানেই।

১৯৭৩ থেকে আমার সাপ্তাহিক বিচিত্রার সঙ্গে সম্পর্ক। বিচিত্রা তখন দিনে দিনে রাজনীতি, অর্থনীতি শিল্প-সাহিত্যজগতে একটি প্রবল দাপট নিয়ে হাজির হচ্ছিল। শাহাদত চৌধুরীর নেতৃত্বে এ পত্রিকা ক্রমে বহু তরুণ-প্রবীণ লেখকের মঞ্চ হয়ে দাঁড়ায়; শুধু লেখালেখি নয়, আড্ডায়ও। বিচিত্রায় এমনিতে গল্প বা উপন্যাস প্রকাশের কোনো নিয়ম ছিল না। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলোই তখন ছিল লেখকদের একমাত্র ভরসা। সেখানে গল্প ছাড়াও মাঝেমধ্যে ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হতো। দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা তখন ছিল অনেক কম, তার ওপর সাহিত্য পাতা আর কতটা জায়গা দিতে পারত? তাই সৃজনশীল লেখকদের প্রস্তুতির তুলনায় প্রকাশের সুযোগ ছিল খুব সীমিত। কলকাতায় দেশ ও আনন্দবাজারের পূজা সংখ্যা যেভাবে অনেক নতুন উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশের নিয়মিত একটি ক্ষেত্র ছিল, বাংলাদেশে সে রকম কোনো পত্রিকা ছিল না। এক পর্যায়ে, সম্ভবত সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, বিচিত্রা বাংলাদেশে প্রথম ঈদ সংখ্যা চালু করে; যেখানে এখানকার লেখকদের গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। একসঙ্গে এক মলাটের মধ্যে সীমিত দামে এতগুলো ভালো গল্প ও উপন্যাস পাওয়া পাঠকদের জন্য তখন ছিল একটি বড় প্রাপ্তি।  

স্বাধীনতা উত্তর নতুন উদ্দীপনা-স্বপ্ন-প্রত্যাশাকালে সৃজনশীলতার জগতেও শক্তিশালী পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশনা জগতের ক্ষুদ্র সীমা, এ বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা বা উদ্যোগহীনতার কারণে লেখা প্রকাশের সুযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছিল না। অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছিলেন। বিচিত্রা ঈদ সংখ্যা প্রকাশনা শুরু হওয়ার পর বছর বছর নতুন নতুন উপন্যাস প্রকাশের সহজ রাস্তা তৈরি হয়। পাঠকদের জন্যও অনেক কম পয়সায় একসঙ্গে নতুন অনেক গল্প ও উপন্যাস পড়ার সুযোগ আসে।

এ ঈদ সংখ্যাগুলোতেই শওকত ভাইয়ের একাধিক উপন্যাস ও গল্প প্রকাশিত হয়। শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, রাজিয়া খান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, রিজিয়া রহমানসহ আরো অনেকের গল্প ও উপন্যাস আমি প্রথম বিচিত্রা ঈদ সংখ্যাতেই পড়ি। আরো বহু পাঠকের জন্যই এই একই পরিস্থিতি ছিল। বই কিনে পড়ার মতো অবস্থা তখন আরো কম ছিল।

আশির দশকে আরো সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। ঈদ সংখ্যার প্রতি পাঠকের আগ্রহ বুঝে একে একে অনেকেই ঈদ সংখ্যা বের করারও উদ্যোগ গ্রহণ করে। এখন প্রতি বছর ঈদসহ নানা উপলক্ষ ধরে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। লেখকদের ‘অপ্রকাশের ভার’ এখন কিছু হয়তো কমেছে।

শওকত ভাইয়ের বই আকারে যে উপন্যাস প্রথম পড়ার সুযোগ হয়, তার নাম প্রদোষে প্রাকৃতজন। এ বইয়ের ভাষা, চরিত্রবিন্যাস, ইতিহাসের কালকে আয়ত্ত করা, বলার ঢং সবকিছুতে মোহিত হয়েছিলাম। অনেককে তখন বলেছি বইটি পড়তে। তখনো শওকত ভাইয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি।

পরে জেনেছি শওকত আলীর জীবন খুব মসৃণ ছিল না। তার জীবনে সবচেয়ে বড় তোলপাড় সৃষ্টির ঘটনা ছিল ভারতভাগ। জন্ম বর্তমান ভারতের অন্তর্ভুক্ত দিনাজপুরে। বাবা ছিলেন ডাক্তার, তবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মা ছিলেন শিক্ষক। স্কুলে পড়াকালেই মা মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে ভারতভাগও হয়ে যায়। এ ভাগের আগে-পরে দুই পারে মানুষের মহাবিপর্যয়ের তিনি সাক্ষী এবং শিকারও বটে। সে সময় ওই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে তাদের টিকে থাকা সম্ভব না হওয়ায় শওকত আলীর পরিবার পাকিস্তানে চলে আসে। প্রথম দিকে কিছু সময় সাংবাদিকতা করেছেন, পরে শিক্ষকতাতেই স্থিত হয়েছেন। এটাই ছিল তাঁর জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত। তাঁর মতো সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল, অবিরাম জ্ঞানের জগতে বিচরণে আগ্রহী মানুষের জন্য শিক্ষকতাই সঠিক পেশা।

নিজের শৈশব-কৈশোর যে ভূমিতে শিকড়, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তা ত্যাগ করে অন্য জায়গায় স্থায়ী হওয়া যে খুব কঠিন, আজীবন যন্ত্রণার বিষয়, তা এ রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না গেলে উপলব্ধি করা কঠিন। টানাপড়েন, উন্মূল হওয়ার যাতনার মধ্যেই থাকতে হয় এই মানুষদের। শওকত আলীরও তা-ই হয়েছিল। তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস, গল্প, গদ্যে এসব বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে। 

আশির দশক ছিল শওকত ভাইয়ের সবচেয়ে সক্রিয় সময় কিংবা বলা যায়, এর আগের কয়েক দশক নিজের চিন্তাজগতে, ভাবনায়, বুননে যা কিছু সঞ্চিত হয়েছিল, তার সৃজনশীল প্রকাশ সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল আশির দশকে। এ দশকেই তার আরো যেসব উপন্যাস পড়ি, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দক্ষিণায়নের দিন (১৯৮৫), কুলায় কালস্রোত (১৯৮৬), পূর্বরাত্রি পূর্বদিন (১৯৮৬), ওয়ারিশ (১৯৮৯), উত্তরের খেপ (১৯৯১)।

আর এই আশির দশকেই শওকত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা, কথা ও নিয়মিত কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়। এ দশকে কয়েক দফায় আমি বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। এ সংগঠনকে লেখক-শিল্পীদের একটি স্বাধীন সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টায় ক্রমে এতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী প্রধান লেখকরা। তার ফলে আমার সুযোগ হয় এ কিংবদন্তি ব্যক্তিদের চিন্তা ও কাজের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয়ের। তাঁদের সঙ্গে বহু সভা, আলোচনা, সফর আর আড্ডা আমার উজ্জ্বল স্মৃতির অংশ। শওকত ভাই কথা কম বলতেন কিন্তু যখন বলতেন তখন তাঁর মধ্যে পেতাম এক গভীর ইতিহাস অনুসন্ধানী সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ চিন্তাশীল মানুষের ছবি।

নব্বইয়ের দশকে আমাদের যোগাযোগ আরো সংহত হয়। বিশেষত ইলিয়াস ভাইকে কেন্দ্র করে আমাদের অনেক উদ্যোগে, আলোচনায় শওকত ভাই ছিলেন উৎসাহী অংশীদার। এ দশকেই ১৯৯৭ সালের শুরুতে ইলিয়াস ভাইয়ের মৃত্যু আমাদের সবার জন্য ছিল অনেক বড় আঘাত। এরপর শওকত ভাই আরো সামনে এসেছিলেন, অনেক কাজে হাল ধরেছিলেন। ইলিয়াস ভাইয়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাহিত্য পত্রিকা তৃণমূল। তাঁর অকালমৃত্যুর পর এ পত্রিকার ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা’ সম্পাদনার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়। এ সংখ্যায় শওকত ভাই ‘ইলিয়াসের মিথ’ নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলেন, তা সাহিত্য ও জগৎ নিয়ে তাঁর সমৃদ্ধ চিন্তাভাবনা বুঝতে অনেক সহায়ক হবে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা সম্পর্কে শওকত ভাইয়ের এ বিশ্লেষণে, অন্যান্য আলোচনায়ও, ইলিয়াসের শক্তিমত্তার বিভিন্ন দিক বিশেষত গল্প-উপন্যাসে মিথ ব্যবহারের দক্ষতা নিয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে মৃত্যুর আগের এক দশকে শওকত ভাই শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। নিঃসঙ্গতাও তাঁকে কাবু করেছিল অনেকখানি। তার পরও তিনি লিখছিলেন, বলছিলেন দায়িত্ব নিয়ে। সর্বশেষ তাঁর উপন্যাস পড়েছি নাঢ়াই (২০০৩) এবং মাদারডাঙ্গার কথা (২০১১)। জনপদ ও মানুষ নিয়ে এগুলো তাঁর খুবই শক্তিশালী সৃষ্টি।

মানুষের জীবন, মনোজগৎ, তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস ধরার জন্য শুধু বর্তমান যথেষ্ট নয়, অতীতকেও জানতে হয়; শুধু প্রকাশ্য বিশ্বাস-অবিশ্বাস নয়, মনের ভেতরের অপ্রকাশিত জগতের দোলাচলও বুঝতে হয়। বাংলাদেশের গ্রাম এখন আর আগের গ্রাম নেই, গ্রামের মানুষের অনেকেই এখন শহরে, রাজধানী ঢাকায় এমনকি একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এখন কাজের খোঁজে, আয়ের খোঁজে কঠিন জীবনযাপন করছে ভিনদেশে। কিন্তু মানুষ যেখানেই যাক না কেন, শিকড় তাকে ছাড়ে না। শিকড়ের কাছে যদি ফিরতে না-ও পারে মানুষ, তবুও তার মনোজগতে শিকড়ের নানা ডালপালা চিরসতেজ থাকে। এখানেই বাস করে মিথ। শৈশব-কৈশোরে যার মধ্য দিয়ে মানুষ বড় হয়, তা-ই তাকে সচেতনে কিংবা অবচেতনে প্রভাবিত করে। শওকত ভাই মানুষকে তার সমগ্রের ভেতর ধরতে চেয়েছিলেন, সেজন্য তার অজানা জগৎও সন্ধানের চেষ্টা করেছেন লেখার মধ্য দিয়ে।

শওকত ভাইকে কখনো উচ্চকিত দেখিনি। তিনি দায়িত্ব নিয়ে ভার দিয়ে কথা বলতেন, বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর সৃষ্টিও ছিল তা-ই।

 

আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও ‘সর্বজনকথা’র সম্পাদক