কোন দেশের পুষ্টি নিরাপত্তার অন্যতম অনুসঙ্গ প্রোটিন সরবরাহ। বাংলাদেশের শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস, শিশুর জন্মকালীন ওজন, গড় আয়ু বৃদ্ধি, মেধা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, রফতানি আয়বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় হ্রাস, রফতানি বৃদ্ধি বেকারত্ব দূরিকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত।  আমরা সবাই কম বেশী একটা তথ্যের সাথে পরিচিত যে, বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ প্রোটিন সরবরাহের ৬০ শতাংশ বা ৮০ শতাংশ আসে মৎস্যখাত এটা মৎস্য অধিদপ্তরের দাবি, অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দাবি ৮০ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাত হতে আসে।


এ জাতীয় কোন বিষয়ে মান নির্ধারণে প্রথমে সংশ্লিষ্ট উপাদানসমূহের আদর্শ মান নির্ধারণ করে তারপর তুল্যমান হিসাব করতে হয়। কিন্তু এ সংক্রান্ত  তথ্যের সত্যতা নির্নয়ে কখনও কোন আদর্শ মান বা পরিসংখ্যান কিংবা যুক্তির আশ্রয় নেওয়া হয় না বরং বারবার চেষ্টা করা হয় যে কোনভাবে নিজের  তথ্যকে সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার। বরং কৌশলে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে দিয়ে নিজেদের পক্ষের তথ্য বলিয়ে উক্ত তথ্যকে প্রতিষ্টিত করার চেষ্টা চলমান। কোন প্রাণিজ উৎস থেকে কত শতাংশ আমিষ পাওয়া যায় এটি নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং আমেরিকান কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যসূত্র পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সহ পুরো বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় যা নিম্নরূপ-

 

টেবিল ১: দুধ, ডিম, মাছ, মাংসে প্রোটিনের শতকরা হার

রেফারেন্স/ পণ্য/ শতকরা প্রোটিন হার

FAO

গড়

USDA

গড়

ডিম

12%

12%

5-7gm/egg

6gm/egg

দুধ

3.2%

3.2%

3.3%

3.3%

মাংস

গরু

22.3%

22.5%

28-32%

30%

26.75%

মুরগী

22.8%

22-25%

23.5%

মাছ

15-20%

17.5%

16.47%- 18.85%

17.6%

        1.  Link-http://www.fao.org/ag/againfo/themes/en/meat/backgr_composition.html, (milk, meat, egg)

         2.  Link- http://www.fao.org/3/x5916e01.html (Fish)

3. Nutritive Value of Foods ,United States Department of Agriculture (USDA), Agricultural Research Service,Home and Garden Bulletin Number 72,

 

 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০১৮-১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত তথ্যকে উপস্থাপন করলে আমরা পাই, মৎস্য উৎপাদন- ৪৩ দশমিক ৮১ লাখ মেট্রিক টন, মাংস উৎপাদন- ৭৫ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন, দুধ উৎপাদন- ৯৯ দশমিক ২৩ লাখ মেট্রিক টন, ডিম উৎপাদন- ১৭১১ কোটি। মৎস্য খাত থেকে প্রাপ্ত আমিষ এফএও -গড়-১৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ইউএসডিএ-গড়-১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। মাছে প্রোটিনের হার গড়ে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরে  ৪৩ দশমিক ৮১ লাখ মেট্রিক টন মাছ হতে আমিষ পাচ্ছি -৭ দশমিক ৬৭ লাখ মেট্রিক টন। মাংসে প্রোটিনের এফএও গড় ২২.৫%, অনুসারে ৭৫.১৪ লক্ষ মেট্রিক টন মাংস হতে আমিষ পাচ্ছি  ১৬.৯  লঃমেঃ টন। ইউএসডিএ গড় ২৬.৭৫% অনুসারে ৭৫.১৪ লক্ষ মেট্রিক টন মাংস হতে আমিষ পাচ্ছি  ২০.১ লঃমেঃ টন

দুধ থেকে প্রাপ্ত আমিষ এফএও সূত্রে ৩.২%, ইউএসডিএ সূত্রে ৩.৩% গড়ে ৩.২% ধরে ৯৯.২৩ লক্ষ মেট্রিক টন দুধ হতে আমিষ পাচ্ছি ৩.২৭ লক্ষ মেট্রিক টন। ডিম থেকে প্রাপ্ত আমিষ এফএও গড়-১২%, প্রতি ডিমের ওজন ৪৫-৭০গ্রাম, গড়ে-৫০গ্রাম ধরে প্রতি ডিম হতে পাই ৬গ্রাম প্রোটিন, ইউএসডিএ সূত্রে-৫-৭ গ্রাম/ডিম গড়ে ৬ গ্রাম ধরে ১৭১১ কোটি ডিম হতে আমিষ পাচ্ছি ১০.২৭ লক্ষ মেট্রিক টন।

 

 

টেবল ২: পণ্যভেদে শতকরা প্রোটিনের হার


 

 

  রেফারেন্স/           পরিমাণ

মাংস (লঃমেঃ টন) (%)

 

ডিম (লঃমেঃ টন) (%)

দুধ (লঃমেঃটন) (%)

 

প্রাণিসম্পদ হতে প্রাপ্ত প্রোটিন

লঃমেঃটন (%)

 

মৎস্য হতে প্রাপ্ত

(লঃমেঃ টন) (%)

 

মোট প্রাণিজ আমিষ

লঃমেঃটন

 সাধারণ পরিমাণ

৭৫.১৪

১৭১১ (কোটি ডিম)

৮.৬ লঃমেঃটন

৯৯.২৩

১৮২.৯৭

৪৩.৮১

২২৬.৭৮

নিট প্রোটিন-FAO

১৬.৯

১০.২৭

৩.২৭

৩০.৪৪

৭.৬৭

৩৮.১১

%

৪৪.৪

২৬.৯

৮.৬

৭৯.৯

২০.১

১০০

নিট প্রোটিন-USDA

২০.১

১০.২৭

৩.২৭

৩৩.৬৪

৭.৬৭

৪১.৩১

%

৪৮.৬

২৪.৯

৭.৯

৮১.৪

১৮.৬

১০০

 

 

প্রাণিসম্পদ খাত থেকে প্রাপ্ত  মোট আমিষ  এফএও স্ট্যান্ডার্ড এ ৩০.৪৪ লঃমেঃ টন, ইউএসডিএ স্ট্যান্ডার্ড এ  ৩৩.৬৪ লঃমেঃ টন, মৎস্য খাত থেকে প্রাপ্ত আমিষ এফএও ও ইউএসডিএ স্ট্যান্ডার্ড এ ৭.৬৭ লঃমেঃ টন। এফএও স্ট্যান্ডার্ড এ মোট প্রাণিজ আমিষে মৎস্য খাতের অবদান (২০.১%) ২০ শতাংশ ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান (৭৯.৯%) ৮০ । ইউএসডিএ স্ট্যান্ডার্ড এ মোট প্রাণিজ আমিষে মৎস্য খাতের অবদান (১৮.৬%) ১৯ শতাংশ ও ইউএসডিএ স্ট্যান্ডার্ড এ মোট প্রাণিজ আমিষে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান (৮১.৪%) ৮১ শতাংশ।

এখানে দেখা যাচ্ছে আর্ন্তজাতিক মানদন্ডে যে কেউ যে কোনটি গ্রহণ করলে মৎস্য কিংবা প্রাণিসম্পদের উৎস সমূহ থেকে প্রাপ্ত আমিষের শতকরা হিসাবে ১-২% কম বেশী হতে পারেন কিন্তু তাতেও মোট অবদান খুব বেশি পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।


বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের বিদায়ী প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু মহোদয় উপস্থাপিত তথ্য অনুসারে জানা যায়, দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের ২৪% আসে মৎস্য খাত থেকে এবং ৭৬% আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। যা উপরোক্ত হিসাবকেই সত্যায়িত করে মাত্র। অনেক সময় জনগণের পাশাপাশি জাতীয় সংবাদ মাধ্যমসমূহকেও বিভ্রান্তিতে ফেলানো হয় কেননা আমরা দেখি কিছু কিছু জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে খবর আসে ৬০% প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করছে মৎস্য খাত!


এখনই উপযুক্ত সময় এই বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান করার, যার যতটুকু অবদান ততটুকুন প্রচার করার মাঝেই সম্মান। কিন্তু উচ্চপদস্থ কারো মুখে মিথ্যা তথ্য যেমন একটি অধিদপ্তরের অর্জনকে ছোট করে, তেমনি সেই অধিদপ্তরের নৈতিক ভিত্তিকেও ঠুনকো প্রমাণ করতে যথেষ্ট। যার যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু মর্যাদা প্রদান করা সময়ের দাবি, ভুল তথ্য যেমন জনগণকে বিভ্রান্ত করে তেমনি পলিসি মেকিং এ ভুল পথ দেখায়। তাই জাতীয় স্বার্থেই আমাদের উচিত সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের। আশা করা যায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও সচিব মহোদয় ভ্রাতৃপ্রতিম দুটি অধিদপ্তরকে নিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে জাতিকে সঠিক তথ্য জানার সুযোগ করে দিবেন।

 

লেখক: ভেটেরিনারি সার্জন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর