কভিড-১৯ মহামারীতে পর্যুদস্ত গোটা বিশ্ব। এতে জনস্বাস্থ্যসহ প্রতিটি খাতই নজিরবিহীন ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রথম ধাপের সংক্রমণ শেষে কিছু দেশে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ। আসন্ন শীতে বাংলাদেশেও বড় মাত্রায় দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা অজানা। আশা করা হচ্ছে, একটি সফল টিকা উদ্ভাবন ও এর নিরাপদ প্রয়োগই এ পরিস্থিতির পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারে। জানা গেছে, ২০০টিরও বেশি শুরু হওয়া টিকা কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে আছে। রাশিয়া আবার এক ধাপ এগিয়ে। তড়িঘড়ি করে মানবদেহে টিকার প্রয়োগ শুরু করেছে তারা। যদিও এত অল্প সময়ে করোনার মতো জটিল ভাইরাসের টিকার সফলতা দাবি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চীনের সিনোভ্যাক্স, অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের টিকার নাম উঠে এসেছে। কিন্তু সেগুলো কবে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যত বেশি সফল টিকা অনুমোদিত হবে, আমাদের জন্য তা তত মঙ্গলজনক। স্বভাবত অন্য দেশের মতো বাংলাদেশও টিকা পেতে তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষী। এবার টিকা নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিও আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এটি মাথায় রেখে আমাদের সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

একটি বৈশ্বিক রীতি হলো, প্রথম ব্যবহারযোগ্য টিকা সাধারণত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমেই বিতরণ করা হয়। একটি নির্দিষ্ট মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিনা মূল্যে নির্দিষ্টসংখ্যক টিকা দিয়ে থাকে। কভিড-১৯ টিকার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ অবস্থায় কভিড-১৯ টিকার গবেষণা কার্যক্রমে সন্তোষজনক ফলাফল বিবেচনায় উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে এরই মধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছে অনেক দেশ, যাতে টিকা উৎপাদনের প্রথম দিকেই তারা তা পায়। কিছু দেশ আবার উৎপাদনকারী দেশের বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে, করছে। আমাদেরও এ ধরনের তত্পরতায় শামিল হতে হবে, না হলে টিকাপ্রাপ্তিতে আমরা পিছিয়ে পড়ব বৈকি। যেখানেই সফল ও নিরাপদ টিকার অনুমোদন হোক, সবার কাছ থেকে যাতে চাহিদামতো টিকা পাওয়া যায়, সেই পথ খোলা রেখে কৌশল ঠিক করতে হবে। সেজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টিকাকেন্দ্রিক কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়াতে হবে।

সর্বাধিক মাত্রায় সংক্রমিত এলাকাগুলোসহ কোথাও লকডাউন ঠিকভাবে কার্যকর না হওয়া, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলাসহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিষয়টিতে সাধারণ শিথিলতাসহ কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় টিকাই এখন সর্বশেষ ভরসা। তাই বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য টিকার ব্যবস্থা করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে হবে। এ পথে চীনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনা কোম্পানিকে অনুমতি দেয়ার ফলে বাংলাদেশ সিনোভ্যাক্সের এক লাখ টিকা ও টিকাসামগ্রী বিনা মূল্যে পাবে। এছাড়া ওই কোম্পানির কাছ থেকে টিকা কেনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। এখন প্রয়োজন চীনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা। ভারতের বায়োটেকও আমাদের এখানে ট্রায়ালে আগ্রহ দেখিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তাদের এ আগ্রহকে কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশে যত বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হবে, আমাদের মানুষের শরীরে টিকার প্রতিক্রিয়া ততই সুস্পষ্ট হবে। আমাদের জলবায়ুতে উপযোগী ও কার্যকর টিকা পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। কাজেই এ ধরনের কার্যক্রমে আমাদের আরো বেশি আগ্রহ দেখাতে হবে।

টিকা পাওয়ার দৌড়ে প্রতিটি দেশই নিজের মতো করে চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে এখনো আশাব্যঞ্জকভাবে সচেষ্ট নয়। সর্বাগ্রে প্রয়োজন আমাদের কত মানুষের জন্য টিকা প্রয়োজন, কতটি উৎস থেকে তা আসবে, টিকা পাওয়ায় কারা অগ্রাধিকার পাবে, সেসব বিষয় নিশ্চিতে একটি সামগ্রিক রূপরেখা তৈরি করা। পাশাপাশি জরুরি টিকার অর্থায়ন নিশ্চিত করা। টিকা কেনার জন্য সরকারের ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানা গেছে। কিন্তু এ অর্থ পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। সেজন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহের কাজ এখনই শুরু করা উচিত। নিশ্চয়ই বাইরের উৎস থেকে সবার জন্য টিকা কিনতে গেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চাপ পড়বে। সেক্ষেত্রে টিকাপ্রাপ্তির যুদ্ধে সরকারের সঙ্গে বড় করপোরেটদেরও যুক্ত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে এক্ষেত্রে একটি স্বতন্ত্র তহবিল গঠন সহায়ক হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, টিকার প্রায়োগিক কৌশল এখনই নির্ধারণ রাখতে হবে। ১৭ কোটি মানুষের টিকাদান একসঙ্গে পাওয়া যেমন দুরূহ, তেমনি তাদের টিকাদান নিশ্চিতও কম ঝক্কির নয়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আমাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে। এটিকে আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। তাদের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। টিকাদানের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক বিদ্যমান। সেখানে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে লাগাতে হবে। তদুপরি ঐতিহ্যিকভাবে এনজিওগুলোর মাঠ পর্যায় পর্যন্ত কর্মী রয়েছে। তাদের একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আছে। যথাযথ প্রশিক্ষিত করে তাদের যুক্ত করা গেলে টিকাদানের কাজটি কঠিন হবে না। প্রাপ্তি ও প্রয়োগসহ আসন্ন টিকাযুদ্ধের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বতো প্রস্তুতি নেবে বলে প্রত্যাশা।