বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী নভেল করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। কমেছে আমদানি-রফতানি। থমকে আছে ব্যবসা-বাণিজ্য। কমে গেছে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি। কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। কর্মচ্যুতি বাড়ায় বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল করতে লাখ কোটি টাকার বেশি বিশেষ ঋণের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। প্যাকেজ বাস্তবায়নে প্রচলিত নীতিমালায় অনেক ছাড় ও শর্ত শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু আগে থেকেই কমতে থাকা বেসরকারি ঋণের গতি লকডাউনে আরো নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগমুখী করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এক্ষেত্রে রাজস্বনীতির সঙ্গে মুদ্রানীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজটি এগিয়ে নিতে হবে। সন্দেহ নেই, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে, এর একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। দ্বিমতের সুযোগ নেই, এখন আমাদের মুদ্রানীতির মূল কাজ হওয়া উচিত কীভাবে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়। এ সংকট থেকে বেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। এজন্য কয়েকটি খাতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম হলো কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ছোট ছোট ব্যবসা ও আমাদের দেশীয় উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান। যাদের বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। এতে আমাদের উৎপাদন বাড়বে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে রফতানি বহুমুখীকরণে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অগ্রাধিকার খাতগুলোর মধ্যে কৃষি খাতকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। ‘কৃষি খাতে ঋণ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যেন তারা ঋণ দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া যারা বেকার হয়ে যাচ্ছে, গরিব-সাধারণ মানুষ রয়েছে, তাদের সহযোগিতার উদ্যোগ নিতে হবে যেন তারা আত্মকর্মসংস্থানে যেতে পারে। ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে সরাসরি এগিয়ে আসবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত একটা বিশেষ তহবিল গঠন করে এদের সহযোগিতা করা। শুধু লক্ষ্যমাত্রানির্ভর মুদ্রানীতিতে না থেকে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকে নির্ধারিত লক্ষ্য দিয়ে দেবে এবং তারা তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে কিনা, তা তদারক করবে।

অর্থনৈতিক মন্দার ফলে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়ে, সেটি হলো বেকার সমস্যা। ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময়ও দেখা গেছে, সে সময় বেকার সমস্যা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এতে মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাহিদা জোগান কমে যায়। মানুষের আয় কমলে তার দৈনন্দিন ভোগ চাহিদা কমে যায়, সঞ্চয়ও কমে যায়। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এ ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করার সব অস্ত্র সরকারের হাতেই থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এবং পৃথিবীতে যেসব দেশে অর্থনৈতিক মন্দা হয়েছে, সেসব দেশের সরকার কিন্তু মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি এ দুটোর সংশোধন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়েছে। রাজস্বনীতির মধ্যে রয়েছে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধিকরণ ও ট্যাক্সেশন পুনর্বিন্যাস। এক্ষেত্রে সরকারকে একদিকে যেমন তার ব্যয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে কর ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। আর মুদ্রানীতি পরিবর্তন করে সুদহার কমাতে হয় এবং অর্থ সরবরাহ এমনভাবে বাড়াতে হয়, যাতে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস না পায়।

করোনাকালীন অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ নতুন মুদ্রানীতির মূল ফোকাস হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উভয় চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিতে হবে। মন্দার যে প্রভাব দেশের রফতানি ও রেমিট্যান্সের ওপর পড়ছে এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা মোকাবেলা করার পদক্ষেপ থাকতে হবে। এজন্য সম্প্রসারণমুখী মুদ্রানীতি দিতে হবে, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। করোনাকালে নতুন মুদ্রানীতি সম্প্রসারণমুখী হওয়া প্রয়োজন, যাতে টাকার অভাবে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আটকে না থাকে। এজন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাত্রা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়া সরকার ঘোষিত প্রণোদনামূলক যেসব প্যাকেজ আছে, সেগুলো থেকে ঋণ বিতরণ হচ্ছে কিনা, সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে মনিটরিং অব্যাহত রাখতে হবে। বাজারে কম সুদে টাকার জোগান বাড়ানো হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে ঋণের সুদহার যেমন কমবে, তেমনি ব্যাংক থেকে টাকা নেয়ার অন্যান্য খরচও হ্রাস পাবে। ফলে উদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী কম খরচে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন, যার প্রভাবে উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে এবং এটি তাদের প্রতিযোগিতায় ফেরাতে সহায়তা করবে। আগামী মুদ্রানীতিকে সম্প্রসারণশীল হতে হবে। বাজারে সহজে যাতে টাকার জোগান বাড়ে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। মুদ্রানীতির অনেক লক্ষ্য থাকলেও অগ্রাধিকারভিত্তিক সঠিক লক্ষ্য সামনে রেখে এর বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক।

ক্রমবর্ধমান আর্থিক ব্যবস্থার জটিল আবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কাজ করতে হচ্ছে বিধায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটও অনেক বিস্তৃত হয়েছে। তবে মুদ্রানীতির অন্য লক্ষ্যগুলো থেকে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকল্পে এর উপযুক্ত হাতিয়ারও পর্যাপ্ত নয়। নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের সুন্দর সমন্বয়ের সঙ্গে যথোপযুক্ত মনিটরিং আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য আবশ্যক। যথোপযুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে এবং আর্থিক অবকাঠামোর বিস্তৃতির ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা ও ঝুকিপূর্ণ গ্রুপের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছানোর ব্যাপারে আর্থিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এখন বাড়তি গুরুত্ব বহন করে বৈকি।