সভ্যতার আদি থেকেই মানবজাতির জন্য কৃষি একটি অপরির্হায এবং অত্যাবশ্যকীয় খাত। যুগের বিবর্তনে এবং প্রযুক্তির ছোয়ায় মানুষের লাইফ স্টাইল যতই উন্নত এবং আধুনিক হউক না কেন , কৃষির প্রয়োজনীয়তা অপরিবর্তনীয় । কৃষির ওপর মানুষের নির্ভরতা ছিল ,আছে এবং থাকবে।কারন হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রথমত এবং প্রধানত যে বিষয়টির প্রয়োজন তা হচ্ছে খাদ্য । সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য প্রতিটি মানুষকেই প্রতিদিন নিয়মিত ভাবে খাবার গ্রহন করতে হয় । আর কৃষিই এই খাদ্য উৎপাদন করে । সুতরাং মানুষের জীবন প্রত্যক্ষভাবেই কৃষির ওপর নির্ভরশীল । মানব জাতির অস্তিত্ত্বের স্বার্থেই তাই খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে । আর খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই কৃষির প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে ।

অন্ন , বস্ত্র , বাসস্থান , শিক্ষা এবং চিকিৎসা মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয় । কিন্তু সবার আগে অন্ন । অন্ন ছাড়া জীবন একদিন ও চলে না । যতদিন জীবন আছে ততদিন অন্ন গ্রহন করতেই হবে এবং তা শরীরের চাহিদা মত । আর যেই খাত এই অন্ন উৎপাদন করে সেই খাতকে আমরা কৃষি খাত বলি । সুতরাং কৃষি খাতকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষির উন্নয়নে সবাইকে কাজ করতে হবে । দেশের প্রতি ইঞ্চি জমিকে কৃষি কাজের আওতায় আনতে হবে এবং প্রতি ইঞ্চি জমিতে চাষ করতে হবে । কৃষি মানে কেবল ধান ,গম কিংবা ভুট্টার চাষ নয় । খাদ্যজাত প্রতিটি পণ্যই  কৃষির অন্তর্ভুক্ত ।আলু , পিয়াজ , রসুন , মরিচ , আদা , হলুদ , লবন এবং  যাবতীয় মসলা দ্রব্যের সবই কৃষি পণ্য । নানা রকম তরকারি , ডাল , শাক সবজি , ফল মুল , আম , কাঁঠাল , লিচু , আনারস সবই কৃষি পণ্য । গরু , মহিষ, ছাগল ,ভেড়া , হাঁস, মুরগি,মাছ সবই কৃষিজাত  প্রানী এবং এদের থেকে প্রাপ্ত মাছ,মাংস, ডিম ,দুধ সবই কৃষি পণ্য। সুতরাং সকল ধরনের  কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে এবং চাহিদার সাথে উৎপাদনের ব্যালেন্স করতে হবে ।কিন্তু সকল জমির উর্বরতা এবং উৎপাদন গুনাগুন এক নয়  , অর্থাৎ সব জমি সব ফসলের জন্য উপযুক্ত নয় ।এক এক জমি এক এক ফসলের জন্য উপযুক্ত । তাই যেই জমি যেই ফসলের জন্য উপযুক্ত সেই জমিতে সেই ফসলের চাষ করতে হবে । যে জমিতে  ধান ভালো হয় সেই জমিতে  ধান, যেই জমিতে গম ভালো হয় সেই জমিতে গম আর  যেই জমিতে তরকারি ভালো হয় , সেই জমিতে তরকারির চাষ করতে হবে । যেই জমিতে আম ভালো হয় , সেই জমিতে আমের চাষ করতে হবে । যেই জমিতে লবন উৎপাদিত হয় , সেই জমিতে লবন উৎপাদন করতে হবে । যেখানে গরু , ছাগল , মহিষ সহ বিভিন্ন গবাদিপশু লালন পালনের সুযোগ রয়েছে , সেই এলাকায় এসব গবাদি পশু লালন পালন করতে হবে । যে জমিতে হাসঁ মুরগি লালন পালনের সুযোগ রয়েছে , সেই জমিতে হাঁস মুরগির লালন পালন করতে হবে । আর পুকুর , জলাশয় , হাওড়, লেকসহ যেসব জায়গায় মাছ চাষের সুযোগ রয়েছে , সে সব এলাকায় বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ করতে হবে । পাহাড়ি ভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে ।আর বসত ভিটায় বাড়ির আশে পাশে যে সব খালি জায়গা রয়েছে সে সব জায়গায় বিভিন্ন জাতের ফল মুল , তরকারি , শাক সবজির চাষ করতে হবে ।প্রয়োজনে একটি গাছের চারা হলে ও রোপন করতে হবে । মোট কথা দেশে বিদ্যমান ভূমির প্রতিটি ইঞ্চিকে কাজে লাগাতে হবে এবং এসব ভূমিকে কৃষি কাজের আওতায় আনতে হবে । 

কৃষি সেক্টরের  তদারকি , উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় গাইডলাইন প্রদানের জন্য দেশে কৃষি মন্ত্রণালয় , প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য মন্ত্রণালয় রয়েছে । কৃষি খাতের উন্নয়নের স্বার্থে এসব মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে । কৃষির উন্নয়নে এসব খাতে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ দিতে হবে ,তাদেরকে দেশে বিদেশে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষন দিতে হবে এবং গবেষনার সুযোগ বাড়াতে হবে ।একই সাথে কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে ।কৃষককে ভালো এবং উন্নত মানের বীজ সরবরাহ করতে হবে , কারন ভালো এবং উন্নত বীজ ছাড়া কখনো ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না । একই সাথে কৃষিজাত পণ্য এবং প্রানীকে রোগ ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় এবং উৎকৃষ্টমানের ঔষধ এবং কীটনাশক সরবরাহ করতে হবে । একজন কৃষক প্রয়োজনীয় মুহুর্তে যেন সব ধরনের সহযোগিতা পায় , সে জন্য প্রত্যেক উপজেলায় কৃষি  সেন্টার চালু করা হউক । প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে এর শাখা থাকতে হবে ,যাতে করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের কৃষকরা এই সেন্টার থেকে সার্বক্ষনিক সবধরনের সহযোগিতা পায় ।  এছাড়া কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ এবং বিপননের জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে । কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্য সহজে বিক্রি করতে পারে, তিনি যেন পণ্যের ন্যায্য মুল্য পায় এবং আর্থিক ভাবে যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সে জন্য সরকারকে বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ করতে হবে । এছাড়া কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা  করতে হবে, যাতে করে একজন কৃষক অধিকতর দক্ষ হয়ে ওঠে । একজন দক্ষ কৃষকের  পক্ষেই কেবল বেশি পণ্য উৎপাদন সম্ভব ।

কৃষি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে আমরা কৃষক বলি । আর একজন কৃষকই হচ্ছে সত্যিকারের উন্নয়নের কারিগর । তিনি বৃষ্টিতে ভিজেন , রোদে শুকায় এবং শীতে কাপে । সর্বদাই তিনি মাঠে কাজ করেন । তার কঠোর এবং অমানবিক পরিশ্রমে ফসল ফলে । তাদের উৎপাদিত ফসলেই সবার মুখে আহার জোটে । শহরের অভিজাত এলাকার অট্রালিকায় আরাম আয়াশে বসবাসকারী মানুষেরা যে খাবার খেয়ে উদর পুর্তি করে এবং রসনা বিলাস করে তা কিন্তু এদেশের গ্রামের দরিদ্র কৃষক শ্রমিকের ঘাম জড়ানো পরিশ্রমেই অর্জিত । সুতরাং এসব কৃষকদেরকে সম্মান জানাতে হবে এবং তাদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে । একজন কৃষক যেন কৃষিকাজের জন্য সহজে ঋন পায় , সে জন্য ব্যাংকগুলোকে কৃষি তহবিল নামে বিশেষ ফান্ড গঠন করতে হবে । বাংলাদেশ ব্যাংককে এ জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে । এদেশে বড় বড় শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋন পায় । এসব বড় বড় ঋন গ্রহিতাদের অনেকেই আবার সেই ঋন ঠিক মত পরিশোধ করে না , ফলে তা মন্দ ঋনে পরিনত হয় । আর এই মন্দ ঋন ব্যাংকিং খাতকে স্থবির করে এবং অর্থনীতিকে গতিহীন করে । বর্তমানে দেশে মন্দ ঋনের পরিমান এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি । অথচ একজন কৃষক কয়েক লাখ টাকা ঋন ও পায় না । আবার ঋন পেতে জামানত লাগে । অথচ এই কৃষকরাই দেশের অর্থনীতির মুল চালিকা শক্তি এবং তারাই উৎপাদন করে বেচেঁ থাকার মুল উপাদান খাদ্য । তাই দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋনের ব্যবস্থা করা হউক । পাশাপাশি একজন কৃষক যেন বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বির্পযয়সহ অন্যান্য কারনে সৃষ্ঠ ক্ষতি কাঠিয়ে ওঠতে পারে , সে জন্য কৃষি বীমা চালু করা হউক । এক লক্ষ টাকা দামের একটি মোটর সাইকেলে বীমা বাধ্যতামুলক । অথচ এক লক্ষ টাকা দামের একটি গরুর বীমা নেই । একটি মটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করলে সেই মটর সাইকেল পুরোপুরি ধ্বংস হয় না , তার একটি মুল্য থাকে এবং ক্ষতিগ্রস্থ অংশের জন্য বীমা কোম্পানী থেকে ক্ষতিপুরন পায় । অথচ এক লক্ষ টাকা দামের গরুটি যখন মারা গেলে , তার কোন মুল্য থাকে না । একইভাবে বন্যায় যখন সব মাছ ভাসিয়ে নিয়ে যায় তখন একজন কৃষক সর্বশান্ত হয়ে যায় । এক্ষেত্রে কৃষক কোন ক্ষতিপুরন পায় না , ফলে তিনি আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং তিনি আর ঘুরে দাড়াতে পারে না । কিন্তু তিনি যদি এক্ষেত্রে সরকার বা কোন বীমা কোম্পানীর পক্ষ থেকে মৃত গরুটির জন্য ক্ষতিপুরন পেত ,অথবা বন্যায় ভাসিয়ে যাওয়া মাছগুলোর জন্য ক্ষতিপুরন পেত -তাহলে তিনি আবার ঘুরে দাড়াতে পারত । ফলে কৃষিখাত উন্নত এবং গতিশীল হত , আর  দেশ এগিয়ে যেত । তাই কৃষি খাতে কৃষি বীমা চালুর জন্য সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি । 

কৃষি কাজের জন্য একজন ব্যক্তিকে সব সময় কৃষি কাজে নিয়োজিত হতে হবে ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয় । অথবা কৃষকেরাই যে কেবল কৃষিকাজ করবে , তা ও কিন্তু নয় । যে কোন ব্যক্তি কিন্তু কৃষিকাজ করতে পারে । এক্ষেত্রে পুরুষ নারী সবাই কিন্তু কৃষি কাজ করতে পারে । একজন ব্যক্তি ছাত্র, চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী , যাই হোক না কেন পড়াশোনা, চাকরি এবং ব্যবসায় সময় দেয়ার পরে ও কিন্তু তার হাতে কিছু সময় থাকে । 

একজন ব্যক্তি যে পেশায়ই নিয়োজিত থাকুক না কেন , তার হাতে কিছু না কিছু সময় থাকে । তাছাড়া সাপ্তাহিক এবং অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে প্রত্যেকের হাতে অনেক সময় থাকে । আপনারা  প্রত্যেকেই এই সময়টুকু কাজে লাগান এবং তা কৃষি কাজে ব্যয় করুন । বসত ভিটার খালি জায়গা টুকুতে সবজি চাষ করুন , তরিকারি চাষ করুন  এবং বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগান । আপনার যদি নিজস্ব একটি বিল্ডিং থাকে , তাহলে সেই বিল্ডিং এর ছাদে বাগান করুন । আপনার প্রতিদিনের অবসর সময়টুকু  এখাতে ব্যয় করুন । এতে আপনার সময় ও ভালো কাটবে এবং কিছু ফসল ও উৎপন্ন হবে । গ্রামে গ্রামে সমবায় সমিতি গঠন করে বৃহত আকারের গরু, মহিষ, ছাগল, মুরগি এবং মৎস্য খামার গড়ে তুলুন। এতে দুধ ,ডিম এবং মাছ,মাংসের উৎপাদন বাড়বে ।এভাবে সবার প্রচেষ্ঠায় দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে । সুতরাং আসুন আমরা সবাই কৃষি কাজে নিজেদেরকে সাধ্যমত নিয়োজিত করি , কৃষির প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দিই এবং এর মাধ্যমে আমাদের সবার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করি । এজন্য ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন । 

লেখক : প্রকৌশলী এবং উন্নয়ন গবেষক

ইমেইল : omar_ctg123@yahoo.com