চলতি বছরের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক আদেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যহার ৯৭৫ টাকা নির্ধারিত হয়। সে আদেশ সংশোধনের জন্য ১৮টি লাইসেন্সি ১৮টি প্রস্তাব দাখিল করে। লাইসেন্সির সংখ্যা ২১টি। ওই সব প্রস্তাবের ওপর বিইআরসি ১৩ সেপ্টেম্বর গণশুনানি করে। তাতে লাইসেন্সিদের মনোনীত সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সংশোধন প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করেন এবং জেরা পর্বেও অংশ নেন। বিইআরসির চেয়ারম্যান শুনানির সূচনা বক্তব্যে মূল্যহার পরিবর্তন প্রস্তাব মূল্যায়ন মানদণ্ড সম্পর্কে বলেন, মূল্যহার পরিবর্তন প্রস্তাব বিষয়ে শুনানি গ্রহণ একটি আইনি প্রক্রিয়া ও কিউসি জুডিশিয়াল সিস্টেম। কমিশন অনুসরণীয় মেথডোলজি ও স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবগুলোর যথার্থতা, ন্যায্যতা ও যৌক্তকতা বিশ্লেষণ করে। এক্ষেত্রে প্রস্তাবের বা আবেদনের যথার্থতা, ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্ব আবেদনকারীদের। অন্য কোনো পক্ষ যদি ভিন্নতর কোনো দাবি উপস্থাপন করে, সেক্ষেত্রে এ বিষয়ে প্রমাণের দায়িত্ব ভিন্নতর দাবি উপস্থাপনকারীর। এক্ষেত্রে প্রস্তাবকারীরা নিজ নিজ প্রতিটি প্রস্তাব বা দাবি দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণসহ শুনানিতে উপস্থাপন করবেন, যাতে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে প্রতিভাত হয়। অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ ও দালিলিক প্রমাণবিহীন উপস্থাপন একটি সর্বজনগ্রাহ্য ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনোভাবেই সহায়ক নয়। তাই কমিশন আশা করে শুনানিতে পক্ষগুলো যুক্তিযুক্ত তথ্য, উপাত্ত ও প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি পেশ করবেন, যা বস্তুনিষ্ঠ ও জ্ঞাত এবং দালিলিক প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত এবং যা কমিশনের ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সহায়ক হবে।
শুনানিতে পক্ষদের উপস্থাপিত বক্তব্য ও তথ্যপ্রমাণে জানা যায়:
১. মূল্যহার সংশোধন প্রস্তাবগুলো ২৯ মে থেকে ১ জুনের মধ্যে বিইআরসিতে দাখিল করা হয়। ২. আইনি বিবেচনায় ওই আদেশ সংশোধন প্রস্তাব আমল অযোগ্য। বিইআরসি এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে তা আমলে নিয়ে গণশুনানি করায় ভোক্তারা সংক্ষুব্ধ। ফলে ফলপ্রদ প্রতিকারের আশায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) উচ্চ আদালতে রিট মামলা করে। মামলাটি এখন বিচারাধীন। এসব বিষয় লাইসেন্সিরা যথাযথভাবে অবহিত নয়। ৩. ওই মূল্যহারসহ পরবর্তী সময়ে বিইআরসির আদেশে এলপিজির মূল্যহার ছয়বার পরিবর্তন করা হয়। ষষ্ঠবারের নির্ধারিত মূল্যহার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য ১০৩৩ টাকা। তবে কোনো মূল্যহারই কার্যকর হয়নি। ফলে ভোক্তারা অধিকারবঞ্চিত। ৪. লাইসেন্সিদের বিরুদ্ধে ক্যাব কর্তৃক আনীত বিইআরসির আদেশ না মানার অভিযোগ বিইআরসি ও উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। সে অভিযোগ নিষ্পত্তি না করে আদেশ সংশোধন করে লাইসেন্সিদের আদেশ না মানার অভিযোগের দায় থেকে যদি বিইআরসি মুক্তি দেয়, তাহলে বিইআরসির নিরপেক্ষতা খর্ব হবে। এর প্রতিকার ওই আদেশ সংশোধন তথা মূল্যহার পরিবর্তনে নয়। ৫. মূল্যহার লাইসেন্সিদের প্রস্তাবমতো নির্ধারিত না হলে তারা মানবেন না, আবার মূল্যহার নির্ধারিত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ভোক্তা আইনের আশ্রয় নেবেন। ৬. আইন মেনে লাইসেন্সিদের অভিপ্রায় অনুযায়ী মূল্যহার নির্ধারণ করা বিইআরসির পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে আইন লঙ্ঘন করে বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি (টিসি) মূল্যহার সংশোধন প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে মূল্যহারভুক্ত চার্জহার পরিবর্তন করে এলপিজির মূল্যহার ১০৩৩ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১০৯৮ টাকা করার প্রস্তাব করেছে এবং লাইসেন্সিদের প্রস্তাবমতো আগস্টের পরিবর্তে সেপ্টেম্বরকে টেস্ট মাস ধরেছে। বিইআরসির মূল্যহার পরিবর্তন প্রস্তাব মূল্যায়ন মানদণ্ড অনুযায়ী বিইআরসির কারিগরি কমিটির ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য এবং কমিশনের ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপন্থী। ফলে গণশুনানিতে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
লাইসেন্সিদের সবার পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মূল্যহার সংশোধন প্রস্তাব গণশুনানিতে প্রথমেই উপস্থাপন করেন এবং সর্বোচ্চ মূল্যহার দাবি করেন। জেরাপর্বে তারাই অংশগ্রহণ করেন। প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে অথবা গণশুনানিতে তারা কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তবে বলেছেন প্রয়োজন হলে তা দেবেন। এক প্রশ্নে বিইআরসির কারিগরি কমিটি বলেছে, যাচিত তথ্যপ্রমাণাদি সবাই দেননি। আবার যারা দিয়েছেন, তারা সব দেননি। ফলে মূল্যহার পরিবর্তন মানদণ্ডে সংশোধন প্রস্তাব ন্যায়সংগত ও যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করতে লাইসেন্সিরা সক্ষম হননি বলে প্রতীয়মান হয়। প্রস্তাবভেদে গণশুনানিতে মূল্যহারভুক্ত নিম্নে বর্ণিত চার্জগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় এবং এত বেশি তারতম্যের ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতার প্রমাণ চাওয়া হয়। কিন্তু তারা তার প্রমাণ দিতে পারেননি। প্রস্তাবিত চার্জহার: ১. মজুদকরণ ও বোতলজাত চার্জহার ১৪৫-৪৯৯ টাকা, গ্রস প্রফিট হার ৭৫-৯৯ টাকা, ঋণের ওপর সুদহার ৯-১২ শতাংশ, ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার চার্জহার যথাক্রমে ৫০ ও ৮০ টাকা, টনপ্রতি জাহাজ ভাড়ার হার ৯৩-১২৬ ডলার এবং ১টি খালি সিলিন্ডার ২৭০০ টাকা, ১০ বছর পর রিপেয়ার ও রিফার্বিশিং ব্যয় কমপক্ষে ২,১৭৫ টাকা। শুনানিতে এসব ব্যয়হার ন্যায্য ও যৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়নি।
এলপিজি ব্যবসায় বিনিয়োগ ব্যয় ৩ বিলিয়ন ডলার বলা হলেও লাইসেন্সিভেদে টনপ্রতি বিনিয়োগ ব্যয় কত, এ তথ্য চেয়ে পাওয়া যায়নি। এ ব্যয় যৌক্তিক কিনা সে প্রমাণও পাওয়া যায়নি। মূল্যহার নির্ধারণ প্রবিধান মতে প্রত্যেক লাইসেন্সিকে এলপিজি পরিবহন এবং মজুদকরণ, বিপণন ও বিতরণকারী লাইসেন্সিদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। শুনানিতে জানা যায়, বিইআরসির রেকর্ডে এমন কোনো লাইসেন্সি নেই। একটি কোম্পানির প্রস্তাবে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার চার্জহার ধরা হয়েছে যথাক্রমে ২৪ ও ২৭ টাকা। ফলে বিতরণ ও রিটেইলার চার্জহার পরিবর্তন প্রস্তাব অন্যায্য ও অযৌক্তিক বলে গণশুনানিতে প্রতিভাত হয়।
উচ্চ আদালতের আদেশে বিইআরসি গণশুনানির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্যহার ১২ এপ্রিলে প্রবিধানে বর্ণিত পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারণ করে। শুনানিতে বলা হয়, প্রবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় মূল্যহার সংশোধন প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য। বিদ্যমান মূল্যহার ১০৩৩ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকায়। অথচ মূল্যহার সংশোধন প্রস্তাবে তা কম-বেশি ১,৩৮১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রবিধান নিশ্চিত করেছে যে মূল্যহার নির্ধারণ পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত মূল্যহারে ভোক্তারা স্বল্পতম ব্যয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন এলপিজি সেবা পাবে। সংশোধন প্রস্তাবে সর্বোচ্চ মূল্যহার ১,৩৮১ টাকা করার প্রস্তাব প্রবিধানের এ মৌলিক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অটোগ্যাসের মূল্যহার বছরে একবার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুনানিতে অটোগ্যাস বিতরণকারীরা বলেছে, তাদের মধ্যে অটোগ্যাস বিতরণ লাইসেন্সি আছে। শুনানিতে আমদানি ব্যয় হ্রাস-বৃদ্ধিতে লাভ-ক্ষতি সমন্বয়ের পদ্ধতিসহ ৪৫ টাকা মূল্যহার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের এ প্রস্তাব শুনানিতে সমর্থন পায়। টিসি সিলিন্ডার-এলপিজির মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করলেও অটোগ্যাসের মূল্যহার পরিবর্তন না করার প্রস্তাব করেছে। বিইআরসি কর্তৃক অটোগ্যাসের নির্ধারিত বিদ্যমান মূল্যহার ৫০.৫৬ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হয় ৪৮.৭১ টাকা মূল্যহারে। অর্থাৎ বিইআরসি কর্তৃক এ মূল্যহার নির্ধারণ প্রতিযোগিতা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গণশুনানিতে এলপিজি প্রতিনিধিরা বলেছেন, মূল্যহার যথাযথ পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে। লাইসেন্স নেয়া বা নবায়নের জন্য ১৩টি পয়েন্টে তাদের যেতে হয়। তাতে একদিকে সময় ও অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে হয়রানিও বাড়ে। এমন অবস্থা অবসানের জন্য তারা ওয়ান স্টপ সার্ভিস চেয়েছেন। ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্যহার ২০১৬ সালে ছিল ১১০০ টাকা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১১০০-১১৫০ টাকা। মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় হলে মূল্যহার কমেছে বলা যায়। এসব বক্তব্য যৌক্তিক বলে গণশুনানিতে বিবেচিত হয়েছে। তবে মূল্যহার হ্রাসের তথ্য পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, এলপিজি ব্যবসায় কত বেশি মুনাফা হয়।
বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি মূল্যহার সংশোধন প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন গণশুনানিতে উপস্থাপন করে। তাদের প্রস্তাবিত মূল্যহার ১০৯৮ টাকা। এ মূল্যহার মূল্যায়ন ও প্রতিবেদন ভোক্তা প্রতিনিধিরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাহাজ ভাড়া/প্রিমিয়াম-সংক্রান্ত তথ্য ১২টি কোম্পানি বা লাইসেন্সি দিয়েছে। বাকি ছয়টি দেয়নি। অডিট রিপোর্ট দিয়েছে ১৫টি লাইসেন্সি। বাকি তিনটি দেয়নি। মূল্যায়নে জাহাজ ভাড়া টনপ্রতি ৯৫ ডলার ধরা হয়েছে। ভারিত গড়ে এ জাহাজ ভাড়া নির্ধারিত হয়েছে। তাতে সব লাইসেন্সির তথ্য আসেনি। বিইআরসি কমার্শিয়াল ইনভয়েজ পায়নি। পোর্ট অথরিটি কিংবা এনবিআরেও খোঁজ করেনি। মোংলা পোর্ট থেকে সংগ্রহ করা একটি কমার্শিয়াল ইনভয়েজ ভোক্তাদের তরফ থেকে শুনানিতে দেখানো হয়। তাতে দেখা যায়, টনপ্রতি এলপিজির জাহাজ ভাড়া ৬৯ ডলার। তাতে প্রতীয়মান হয়, যেসব লাইসেন্সির জাহাজ ভাড়া কম তারা আবেদন করেননি, করলেও তথ্য দেননি। জাহাজ ভাড়া নির্ধারণে তাদের ব্যয় বিবেচনায় আসেনি। ফলে টিসির প্রস্তাবিত চার্জহার ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়।
সংশোধন প্রস্তাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমানে ২১টি এলপিজি লাইসেন্সি রয়েছে। তাদের মধ্যে আটটি লাইসেন্সি মজুদ ও বোতলজাত চার্জহার প্রস্তাব করেছে ১৬৫ থেকে ৪৯৯ টাকার মধ্যে। চারটির প্রস্তাব ১৪৫-১৬৫ টাকার মধ্যে। ফলে এ চার্জহার ১৫৩-১৯৮ টাকা টিসি কর্তৃক বৃদ্ধির প্রস্তাব ক্যাব গণশুনানিতে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাছাড়া ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার কেউই লাইসেন্সি নয়। তাদের জন্য বিদ্যমান চার্জহার যথাক্রমে ২৪ ও ২৭ টাকা। টিসি তা বৃদ্ধি করে ৩১ ও ৩৪ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। একটি কোম্পানি এলপিজির মূল্যহার ১৩৮১ টাকা করার প্রস্তাব করলেও তাদের প্রস্তাবে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার চার্জহার ধরা হয়েছে যথাক্রমে ২৪ ও ২৭ টাকা। তাই শুনানিতে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার চার্জহার বৃদ্ধির প্রস্তাবও ভোক্তাপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে। পক্ষান্তরে আগস্টের সিপি সমন্বয়ে এলপিজির মূল্যহার ৯৯৮ টাকা করার প্রস্তাব করেছে ক্যাব। শুনানিতে প্রতীয়মান হয়, টিসির প্রস্তাব প্রবিধানমতে স্বল্পতম ব্যয়ে এলপিজি সরবরাহ করার বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন এবং বিইআরসি কর্তৃক ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপন্থী।
১২ এপ্রিল গণশুনানির ভিত্তিতে নির্ধারিত এলপিজির বটলিং ওভারহেড ব্যয় ২২ টাকা, বিক্রয়-বিপণন-প্রশাসনিক ব্যয় ৪৬ টাকা, অবচয় ৪২ টাকা, ঋণের সুদ ২৩ টাকা, মুনাফা ১৫ টাকা। এসব চার্জহারের কোনটি বৃদ্ধির প্রস্তাব টিসি কিংবা লাইসেন্সি কেউই ন্যায্য ও যৌক্তিক বলে তথ্যপ্রমাণ দ্বারা গণশুনানিতে প্রমাণ করতে পারেনি। শুনানিতে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণে দেখা যায়, টনপ্রতি জাহাজ ভাড়া ভারতে ২০ ডলার, বাংলাদেশে সর্বনিম্ন ৬৯ ডলার। জাহাজ ভাড়া টনপ্রতি ৯৫ ডলার ধরার প্রস্তাব প্রবিধানমতে স্বল্পতম ব্যয়ে এলপিজি সরবরাহের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন এবং বিইআরসি কর্তৃক ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপন্থী।
প্রবিধানের ১৩(৩) বিধানমতে সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ অনধিক ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আদেশ পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব/আবেদন করতে পারে। মূল্যহার সংশোধনের আবেদন এ সময়সীমার মধ্যে করা হয়নি। ১২ এপ্রিলে নির্ধারিত এলপিজির মূল্যহার প্রবিধানের ১৪(২) বিধানমতে কার্যকর ছিল ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। এ মূল্যহার কার্যকর থাকার মেয়াদে ওই সংশোধন প্রস্তাব করা হয়নি। ফলে প্রস্তাব পেশ ও গ্রহণ প্রবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। প্রবিধানে বর্ণিত মূল্যহার নির্ধারণ পদ্ধতির ১.৩ বিধানমতে প্রত্যেক লাইসেন্সিকে এলপিজি পরিবহন ও মজুদকরণ, বিপণন ও বিতরণকারী লাইসেন্সির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। অথচ কোনো চুক্তি নেই।
বিইআরসিতে প্রদত্ত তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, লাইসেন্সিদের এলপিজি সরবরাহ ক্ষমতা বছরে ২.৪৮ মিলিয়ন টন। অথচ ব্যবহূত ক্ষমতা কম-বেশি এক মিলিয়ন টন। অর্থাৎ ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর ৪০.৩২ শতাংশ। ব্যবসা ব্রেক-ইভেনে আসতে হলে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ক্ষমতা ব্যবহার হতে হয়। ক্ষমতা স্বল্প ব্যবহার হওয়ার কারণে যে ক্ষতি তা সমন্বয় এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রত্যাশায় লাইসেন্সিরা স্বল্পতম এলপিজি সরবরাহে অধিক ব্যয় বৃদ্ধি করে। তাতে লাইসেন্সিদের অদক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় এবং দক্ষতা উন্নয়ন হয় না। টিসির মূল্যহার প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিষয়টি উপেক্ষিত। ফলে তা প্রবিধানের মূল বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। তাই মূল্যহারভুক্ত যৌক্তিক চার্জহারগুলো নির্ধারণের লক্ষ্যে স্বল্পতম চার্জহারে এলপিজি সেবা দিতে আগ্রহী দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে দরদাতা বাছাই করে তাদের লাইসেন্স প্রদান এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো এলপি গ্যাসকেও মূসক থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য গণশুনানিতে ক্যাব প্রস্তাব করেছে। সেই সঙ্গে এলপিজিসিএলের স্বল্প মূল্যের এলপিজি মহানগরীর ফুড ভেন্ডার ও বস্তিবাসীর মধ্যে বিতরণের জন্যও ক্যাব প্রস্তাব করেছে।
আলোচ্য প্রসঙ্গে গণশুনানিতে বলা হয়েছে, বিইআরসি আইনমতে এনার্জির মূল্যহার নির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট কোনো নীতিমালা তৈরির এখতিয়ার জ্বালানি বিভাগের নেই। লাইসেন্স প্রদানের একক এখতিয়ার বিইআরসির। অথচ জ্বালানি বিভাগ এলপিজি-সংক্রান্ত কতিপয় নীতিমালা তৈরি করেছে এবং লাইসেন্সও প্রদান করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩ নভেম্বর ২০১৯ তারিখের এক পরিপত্রে এলপিজি ব্যবসায়ী হতে হলে লোয়াবের সদস্য হতে হবে—এমন বিধান জারি করেছে। অর্থাৎ লোয়াব লাইসেন্স প্রদান কর্তৃত্বের অংশীদার। এ উভয় বিষয়ই বিইআরসি আইনের পরিপন্থী। আবার এলপিজিসহ পেট্রোলিয়াম পণ্যগুলোর মূল্যহার নির্ধারণ-সংক্রান্ত তিনটি প্রবিধানের গেজেট প্রকাশ না করে বছরের পর বছর জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক আটকে রাখাও বিইআরসি আইনের পরিপন্থী। কারণ প্রবিধান প্রণয়নের এখতিয়ার বিইআরসির। এসব ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে ক্যাব কর্তৃক বিইআরসির মাধ্যমে জ্বালানি বিভাগ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রদত্ত দুটি পত্র বিইআরসিতে আটকে আছে। এসব ঘটনায় প্রতিভাত হয়, ভোক্তা অধিকার বিপন্ন।
লাইসেন্সি কর্তৃক উপস্থাপিত সংশোধন প্রস্তাব এবং টিসির মূল্যায়ন প্রতিবেদনের একটি তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা ক্যাব শুনানি পরবর্তী প্রতিবেদনে বিইআরসির কাছে পেশ করে। তাতে ১২ এপ্রিল বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত সমন্বয়কৃত মূল্যহার, গণশুনানিতে লোয়াব কর্তৃক উপস্থাপিত সমন্বয়কৃত মূল্যহার, টিসির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত মূল্যহার এবং ক্যাবের প্রস্তাবিত মূল্যহার ভারতের মূল্যহারের সঙ্গে একটি তথ্যভিত্তিক তুলনা ও পর্যালোচনা দেখানো হয়েছে। এ পর্যালোচনা বিশেষভাবে দেখা যায়, প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য জাহাজ ভাড়া ব্যয় ক্যাব দেখিয়েছে ৭০ টাকা (টনপ্রতি ৬৯ মার্কিন ডলার)। বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রয় মূল্যহার বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ১০৩৩ টাকা, কোম্পানিগুলো কর্তৃক প্রস্তাবিত ১৩৮১ টাকা এবং ক্যাবের প্রস্তাব ৯৯৮ টাকা। সেখানে ভারতে ভর্তুকিবিহীন মূল্যহার ৮৭৫ (১২ কেজি হিসেবে)। অথচ বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটির (টিসি) প্রস্তাব ১০৯৮ টাকা। বাজারে পাওয়া যায় ১১০০ টাকায়। এ তথ্যে প্রতিভাত হয়, সংশোধন প্রস্তাব ও টিসির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত মূল্যহার ও মূল্যহারভুক্ত চার্জহারগুলো অন্যায্য, অযৌক্তিক ও সামঞ্জস্যহীন। বিগত ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের বিভিন্ন শহরে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির যেসব মূল্যহার (ভর্তুকি ব্যতীত) বিদ্যমান ছিল, সেসব মূল্যহার ১২ কেজি সিলিন্ডার ও বাংলাদেশী টাকার হিসাবে বর্ণিত ছকে দেখানো হলো। সেখানে এলপিজি সরবরাহ তথা ব্যবহার হয় বছরে ২৭.৫৯ মিলিয়ন টন। এই ক্ষমতা ব্যবহার শতভাগের ওপরে। বাংলাদেশের মতো নয় (ব্যবহূত ক্ষমতা ৪০.৩২ শতাংশ)। তাতেও প্রতিভাত হয়, বাংলাদেশে বিদ্যমান মূল্যহার ১০৩৩ টাকা এবং প্রস্তাবিত মূল্যহার ১০৯৮, ৯৯৮ ও ১৩৮১ টাকা কোনোটিই ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়।
ভারতীয় শহর কলকাতা দিল্লি চেন্নাই বেঙ্গালুরু মুম্বাই
মূল্যহার (টাকা) ৮৭৫ ৮৬০ ৮৬২ ৮৬২ ৮৬০
ছক: ভোক্তা পর্যায়ে ভারতের কয়েকটি শহরের এলপিজির মূল্যহার
গণশুনানির বক্তব্য প্রদান পর্বে ভোক্তা পক্ষ বলেছে: ১. যে পদ্ধতিতে মূল্যহার নির্ধারণ প্রক্রিয়া চলছে তাতে বলা যায়, এমন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া একটি প্রতিযোগিতাবিরোধী পদ্ধতি। এমন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া এলপিজির বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টিতে বড় বাধা হবে এবং সে বাজার সংঘবদ্ধ লাইসেন্সিদের একচেটিয়া আধিপত্য তথা অলিগোপলির শিকার হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উল্লিখিত পরিপত্র এবং জ্বালানি বিভাগ প্রণীত সংশ্লিষ্ট নীতিমালাগুলো এমন অবস্থা সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ২. বিইআরসি আইনের ৩৪(২)(ডি) ধারামতে মূল্যহার নির্ধারণে ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যহার নির্ধারণ করা বিইআরসির দায়িত্ব। ফলে টিসির মূল্যায়ন প্রতিবেদন ওই ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। ৩. লাইসেন্সিদের একজনের প্রস্তাবের টেক্সট ও কনটেক্সটের সঙ্গে অন্যজনের প্রস্তাবের টেক্সট ও কনটেক্সটের অনেক বেশি সাদৃশ্য রয়েছে। তাতে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২-এর ২(কিঊ) উপধারা মতে প্রতিভাত হয়, লাইসেন্সিদের মধ্যে মূল্যহার নিয়ন্ত্রণে যোগশাজস রয়েছে। জোটবদ্ধভাবে শুনানিতে একক প্রস্তাব পেশ এবং একইভাবে জেরা পর্বে অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ। ৪. বিইআরসি আইনের ৩৪(৬) উপধারামতে লাইসেন্সিরা পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যাদিসহ মূল্যহার পরিবর্তন প্রস্তাব বিইআরসির কাছে দাখিল করবে। কিন্তু উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো তথ্যাদির দিক থেকে অসম্পূর্ণ এবং প্রাপ্ত তথ্যদিতেও গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। ফলে টিসির প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন এ উপধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ৫. বিইআরসির নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যহার ১০৩৩ টাকা। এ মূল্যহার লাইসেন্সিরা কার্যকর করেননি। তারা মূল্যহার চান ১৩৮১ টাকা। অথচ বিক্রি করছেন ১১০০ টাকা মূল্যহারে। বিক্রয় মূল্যহার অপেক্ষা ইচ্ছেমাফিক এমন লুণ্ঠনমূলক মূল্যহার দাবি প্রতিযোগিতা আইন ২০১২-এর ১৬ ধারার বিপরীত। ৬. বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যহার কার্যকর না করা বিইআরসি আইনের ৪৩ ধারামতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ ওই মূল্যহার কার্যকর করা ছাড়াই সংশোধন প্রস্তাব মূল্যায়ন হয়েছে এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিদ্যমান মূল্যহার ১০৩৩ টাকা পরিবর্তন করে ১০৯৮ টাকা করার প্রস্তাব করেছে টিসি। ফলে এ প্রস্তাব উভয় আইনের পরিপন্থী। ৭. ফলে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারাবলে স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে বলা হয়, প্রতিযোগিতাবিরোধী অসাধু ব্যবসাবান্ধব সমঝোতা লাইসেন্সিদের মধ্যে গড়ে উঠেছে। টিসির মূল্যায়ন প্রতিবেদন সে সমঝোতার স্মারক।
কিছু সুপারিশ
১. এলপিজি ও অটোগ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের লাইসেন্সিদের চার্জহার ভিন্ন প্রবিধান দ্বারা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হলো। ২. সব পর্যায়ের লাইসেন্সিদের ক্ষেত্রে ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাব করা হলো। ৩. এলপিজি নীতিমালা বাতিল, আটকে রাখা প্রবিধানগুলো গেজেটে প্রকাশ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ৩ নভেম্বর ২০১৯ তারিখের পরিপত্র বাতিলসংক্রান্ত বিইআরসিতে আটকে থাকা ক্যাবের দুটি পত্র জ্বালানি বিভাগ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। ৪. এলপিজিসিএলের স্বল্প মূল্যের এলপিজি মহানগরীর ফুড ভেন্ডার ও বস্তিবাসীদের মধ্যে বিতরণের জন্য পুনঃপ্রস্তাব করা হলো। ৫. এলপিজিসিএলের ক্ষেত্রে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারের চার্জহার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হলো। ৬. গ্যাসের ন্যায় এলপিজিকেও মূসক থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করার প্রস্তাব করা হলো। ৭. লাইসেন্সি ও মূল্যহারভুক্ত চার্জহারগুলো দরপত্র আহ্বান করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হলো।
ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ










