গ্রীক উপাখ্যানে দেবতাদের সৃষ্ট প্রথম মানবী প্যানডোরা তার প্রাপ্ত উপহার সমুহের একটির ঝাপি খুললে ভেতর থেকে জগতের যাবতীয় অশুভ এবং অমঙ্গল বের হয়ে আসে। আমাদের সদ্য বাস্তবায়িতবেতন কমিশন পরবর্তীপরিস্থিতি প্যানডোরার দুর্ভোগের কথাই মনে করিয়ে দেয়।রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, সচিব বনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; আমলা(প্রশাসন) বনাম আমলা(প্রকৃচি); আমলা বনাম কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাকুরে; সরকারী চাকুরে বনাম বেসরকারী চাকুরে, সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। প্রথম দিকে সন্তোষ প্রকাশ করলেও এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন, ‘বেশী দিয়ে ফেলেছি'।

আসলে বাহবার আকাঙ্খা থেকেই সমস্যার সুত্রপাত।আমাদের সরকারী খাতের বেতন ভাতা পুনঃ নির্ধারণের আবশ্যকতা সম্পর্কে কোন দ্বিমত নেই।কিন্তু পর্যাপ্ত সম্পদের সংস্থান, সঠিকভাবে প্রাপ্যতা(eligibility) বিচার, বেসরকারী খাতের উপর এর প্রভাব বিবেচনা না করে বেতন ভাতা বৃদ্ধিকে উপহার হিসাবে বিবেচনা করায় এ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। বেতন কমিশন বাস্তবায়নের জন্য সম্পদের সংস্থানের বিষয়টি ও সঠিকভাবে অনুমিত হয়েছে বলে মনে হয়না। তাই বেতন কমিশনেররিপোর্ট প্রকাশ পর এর বাস্তবায়নে প্রায় এক বছরের মত সময় লেগেছে।তারপরেও সমস্যার সুরাহা হয়নি। 

বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ হলো সম্পদের সংস্থান।উদাহরণ স্বরূপ সচিব বনাম বিশ্ববিদ্যালয়েরঅধ্যাপক ইস্যুটিকে মর্যাদার লড়াইয়ের রূপ দেয়া হয়েছে। আসলে কি ব্যাপারটা তাই? সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা ১২২জন।অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সংখ্যা ৮২০জন।আবার সর্বোচ্চ বেতনক্রমের সরকারী কর্মকর্তা ৫৯ বয়স পর্যন্ত ১ গ্রেডের বেতন পাবেন অন্যদিকে একজন অধ্যাপককে ৬৫ বছর পর্যন্ত এ বেতন দিতে হবে।তাই দুই ক্ষেত্রে আর্থিক সংশ্লেষ ও ভিন্ন।এক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ সংস্থানের বিষয়টি ও ভাবতে হবে? তাছাড়াও এমন একটা ধারণা দেয়া হচ্ছে যে সপ্তম বেতন কমিশনে সব অধ্যাপক ১ম গ্রেডে বেতন পেতেন।এ ধারণাটিও সঠিক নয়। সপ্তম বেতন কমিশনে কেবলমাত্র সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকরা ১ম গ্রেডে, সিনিয়র অধ্যাপকরা ২য় গ্রেডে এবং অধ্যাপকরা তৃতীয় গ্রেডে বেতন পেতেন। বলা হয়ে থাকে, যুদ্ধের প্রথম নির্মম বলি হচ্ছে সত্য। এক্ষেত্রেও কি তেমন একটা কিছু ঘটছে? আবার,আগের সপ্তম বেতন কমিশনের মতো সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপকদের ১ম গ্রেডে বেতন দিতে বাধা কোথায় তাও সরকার স্পষ্ট করে কিছু বলছে না।  আরেকটা কথা, সন্মানিত অধ্যাপকরা বেতন স্কেল নিয়ে সরকারের সাথে দর কষাকষি করুন, তাতে কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়।কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম কেন বন্ধ থাকবে? ছাত্র ছাত্রীরা কেন পণের গুটি হবে?

সবাই আবার তাদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কমিশন ও কাঠামো চান। এর মোদ্দা কথা হলো অন্যদের তুলনায় তাদের বেশী বেতন ও ভাতা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর কর্মকর্তা কর্মচারীরা সহ অনেকেই এ দাবী করছেন।কিন্তু বাড়তি বেতন ভাতা দিতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কিভাবে হবে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। এসব ডামাডোলে যাদের বেতন ভাতা আসলেই পিছিয়ে আছে, যেমন স্কুল শিক্ষকরা, তারা পিছিয়েই থাকছে। ইতোপূর্বে বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবী তুললে তাদের লাঠিপেটা এবং মরিচের গুড়া হজম করতে হয়েছিল। সরব ও সুবিধাভোগী সম্প্রদায়ের দাবীদাওয়া নিয়ে যত কথা হচ্ছে প্রকৃত অবহেলিতদের তার সিকি ও আলোচনা নেই।

সম্পদের সংস্থানের পর দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো প্রাপ্যতা নির্ধারণ।কত বছর ন্যুনতম চাকুরীর মেয়াদ হলে একজন ১ নম্বর গ্রেডে বেতন পাবেন? একজন তিরিশ বছর চাকুরী করে প্রথম গ্রেডে যাবেন। আবার অন্য কেউ ১০-১৫ বছর চাকুরী করে প্রথম গ্রেডে বেতন পাবেন এটা কি সংগত হবে? সর্বোচ্চ১ নম্বর গ্রেডে বেতন পেতে হলে আর কি কি যোগ্যতা থাকতে হবে? এসব কিছুই বলা হয়নি। প্রাপ্যতা নির্ধারণ না করে একটি পদের সঙ্গে আরেকটি পদ মিলিয়ে ফেলায় এসব অবাঞ্ছিত বিতর্কের সুত্রপাত হয়েছে।


সম্পদের সংস্থান বিষয়ে ফিরে আসি।অনুমান করা হয়েছিল, নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করতে বর্তমান অর্থবছরে ১৬০০ কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ২৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধ্বির যে আশাবাদ নিয়ে এ অনুমান করা হয়েছিল তা ইতোমধ্যেই ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংগৃহীত করাদি থেকে আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৮০০০ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে।অথচ এটি রাজস্ব আদায়ের প্রধান উৎস।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা মোটেই আলোচনায় আসেনি তা হলে বেসরকারী খাতের উপর নতুন বেতন স্কেলের প্রভাব।সরকারী এবং বেসরকারী উভয় খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা একই বাজারে বাজার করে থাকেন বিধায় একই মুল্যস্ফীতির সন্মুখীন হন।স্বাভাবিকভাবেই সরকারী খাতের বেতন ভাতাদি বৃদ্ধির ফলেবেসরকারী খাতেও বেতনভাতা বৃদ্ধির দাবী উঠবে। প্রশ্ন হলো, বেসরকারী খাত কিভাবে এ অর্থ সংস্থান করবে? সরকার তো রাজস্ব আয়, ব্যাংক ঋণ থেকে, এমনকি মুদ্রা ছেপে এর জন্য অর্থসংস্থান করতে পারবে।বেসরকারী খাতের তো সে সুযোগ নেই। এমনিতেই বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে ব্যবসার ব্যয় তুলনামুলক ভাবে অন্যান্য দেশসমুহের চেয়ে বেশী।এটা আরো বেড়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা মুলক অবস্থান আরো দুর্বল হতে পারে।বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের অব্যাহত দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারে জ্বালানী তেলের দাম কমালেও বেসরকারী খাত বেতন বৃদ্ধির ধাক্কা কিছুটা সামলে নিতে পারতো। 

যেহেতু বেসরকারী খাতে এমন কোন নাটকীয় উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ঘটেনি, তাই যা হবার কথা তাই হচ্ছে। সংবাদে আমরা দেখেছি, বেসরকারী স্কুলের শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য ছাত্র বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং অভিভাবকরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে বেতন কমিশনের সরকারী খাতে বেতন বৃদ্ধির ঢেউ বেসরকারী খাতে লেগেছে এবং এর মুল্য দিতে হবে সাধারন জনগণকে।চক্রাকারে এসব পদক্ষেপ মুল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলবে। 

আগেই বলেছি, সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু কি ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অন্যান্য দেশে এটা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে মুল্যস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করে।জাতীয় বেতন কমিশনের রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে এ বিষয়ে আরো সুনির্দিষ্ট আলোচনা করা যেত।

জাতীয় বেতন কমিশনের প্রধান বলেছিলেন বেতন ভাতা বৃদ্ধির ফলে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতি কমবে। এ আশাবাদের প্রতিফলন কোথাও দেখা গেছে বলে এখনও শোনা যায়নি।সংবাদপত্র সমুহ পড়লে বরং মনে হয় প্রশাসন, পুলিশ, আয়কর, কাস্টমস, ভ্যাট, রাজউক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর ন্যায় সরকারী দপ্তরসমুহে ঘুষ দুর্নীতি, হয়রানি অব্যাহত আছে, এমনকি বেড়েছে বলেও ধারনা হয়।আশা করেছিলাম যে, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা উপভোগের শর্ত হিসাবে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে দুর্নীতি মুক্ত থাকার ব্যক্তিগত অঙ্গীকার গ্রহন করা হবে এবং সরকারী দফতর সমুহে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। এর কোনটাই ঘটেনি। এটা করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় ছিলো। উল্লেখ্য যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারী প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেডে চাকুরী গ্রহনের শর্ত হিসাবে কর্মকর্তা কর্মচারীদের দুর্নীতি মুক্ত থাকার অঙ্গীকার গ্রহনের ব্যবস্থা চালু করেছিলাম।এ ব্যবস্থাটি এখনও বহাল আছে।

বলা হয়ে থাকে বিস্তারিতের মধ্যেই শয়তান লুকিয়ে থাকে। আসলে বাহবার নীতির অগ্রাধিকার ও বাহবা আদায়ের প্রতিযোগিতার কারণে আজ আর কেউ বিস্তারিত শুনতে, জানতে ও বুঝতে আগ্রহী নন। অথচ সমস্যার সুত্রপাত হয় এখান থেকেই। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাশ টেনে ধরার আর কেউ নেই। সবাই এখন জি হুজুর আর আর বাহবা কুড়ানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত।

লেখক: সাবেক সচিব এবং অধ্যাপক