চলতি বছর বোরোর বাম্পার ফলন হলেও কৃষি মন্ত্রণালয় ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। কৃষক, আড়তদার ও চাল মালিকদের কী পরিমাণ চাল আছে, তারও কোনো সঠিক তথ্য নেই। দাম বেঁধে দিয়ে এবং খোলাবাজারে বিক্রি বাড়িয়েও সরকার চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। চালের বাজারে বিরাজমান ঊর্ধ্বমুুখী প্রবণতার মধ্যেই খবর মিলছে আমন উৎপাদন কমতে পারে। ব্রির গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় দেশে আমনের মোট উৎপাদন কমতে পারে সাড়ে ১৫ লাখ টন। সংস্থাটির প্রাক্কলন গভীরভাবে আমলে নিতে হবে। একে তো কভিড-১৯-এর অভিঘাত আছে, তার ওপর দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাত এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই দফা বন্যায় আমন চাষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক জায়গায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে। সরকার কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলেও শতভাগ জমিতে আমন ধান লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে আমনের উৎপাদনে বড় বিপর্যয়ের কারণে চাল উৎপাদন হ্রাস পেতে যাচ্ছে। এছাড়া আগামী বোরো উৎপাদনও কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার চালের সরকারি মজুদও কমার খবর মিলছে। বর্তমানে এটি সাড়ে পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে এসেছে, যা গত বছর একই সময়ে ১০ লাখ টনের বেশি ছিল। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আপত্কালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া যেমন কঠিন হবে, বাজার অস্থিতিশীলতা রোধ করাও সম্ভব হবে না।
দেশে চালের চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন, সেখানে সরকার বছরে কম-বেশি মাত্র ১০-১২ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে, যাকে মোট উৎপাদনের তুলনায় যৎসামান্যই বলা যায়। তার পরও সরকারিভাবে ধান-চাল মজুদের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদিত শস্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, খাদ্যশস্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা, নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তোলা, প্রয়োজনে ত্রাণ বিতরণ, স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে খোলাবাজারে ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ নানা চ্যানেলে চাল সরবরাহের কারণে সরকারিভাবে সন্তোষজনক খাদ্যশস্য মজুদ রাখা প্রয়োজন। যে কারণে সরকার প্রতি বছরই নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে বোরো ও আমন মৌসুমেই কম-বেশি চাল-গম অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে। আর সরকারের গুদামে নিরাপদ খাদ্য মজুদ না থাকলে বাজার স্থিতিশীল রাখাও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কারণে চালের দাম বাড়লে সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণে খোলাবাজারে চাল বিক্রি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ না করে তাহলে চাল, আটার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
চলতি বছর সরকার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ ধান-চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত শতভাগ সফল হতে পারেনি। আর এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দূরদর্শিতার অভাব এবং ধানের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ না করায় ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান পুরোপুরি সফল হয়নি, যার বিরূপ প্রভাব এরই মধ্যে চালের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এখন মোটা চালের বাজারদর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও সরকার এরই মধ্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজিতে কার্ডধারীদের অনুকূলে চাল সরবরাহ করছে, যা চাহিদার তুলনায় কম। শুধু তাই নয়, এ সময়ে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে এ সময়ে কাবিখা, টেস্ট রিলিফের মতো প্রকল্পের আওতায় সরকার খাদ্যশস্য সহায়তা দিয়ে থাকে। এ কার্যক্রম চালানোর জন্যও সরকারের পর্যাপ্ত মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে জনস্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেহেতু এ বছর বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বেই কম-বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগ্রাসন বেশি, সেহেতু খাদ্যনিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে সরকারিভাবে আপত্কালীন খাদ্য মজুদ বাড়ানো উচিত। নইলে খাদ্যশস্যের বাজার সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগের ব্যর্থতা পর্যালোচনা করে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ অভিযান জোরদার করতে হবে। উল্লেখ করা দরকার যে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য সম্পর্কিত নীতি প্রণয়নে যথাযথ তথ্য-উপাত্তও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি মজুদের পরিমাণ জানা গেলেও বেসরকারি খাতে চালের মজুদ কত আছে, তার পরিসংখ্যান জানা নেই। এ-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ প্রথমে করতে হবে। সঠিক তথ্যের মাধ্যমে ঘাটতি নির্ণয়পূর্বক প্রয়োজনে চাল আমদানি করতে হবে। সরকার অবশ্য তিন লাখ টন চাল আমদানির বিষয়ে এরই মধ্যে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে মজুদ পরিস্থিতির উন্নতি করা যাবে কিনা এবং বাজারে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে ঠিক কী পরিমাণ চাল আমদানি করা প্রয়োজন তা নিরূপণ করা জরুরি। আমদানি বিষয়ে নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
করোনায় বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ার আভাস আগেই দিয়েছিল এফএও। তার বাস্তব রূপ এখন দৃশ্যমান। চীন, ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান প্রভৃতি রফতানিকারক দেশ নিজস্ব মজুদ বাড়াতে চাল রফতানি সীমিত করেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে চাল আমদানি বাজার আরো সংকুচিত হতে পারে। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়িয়ে দ্রুততার সঙ্গে কোন কোন দেশ থেকে চাল আমদানি করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। আর কাজটি করতে হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। অনেক সময় মজুদ সন্তোষজনক থাকলেও বাজার কারসাজি ঘটে। মূলত বাজারকে অস্থির করে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার জন্য একশ্রেণীর ব্যবসায়ী এমনটি করেন। কাজেই নিয়মিত বাজার নজরদারিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালের দামের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রেক্ষাপটে খাদ্যমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থা এই হুঁশিয়ারি আমলে নেয়ার লক্ষণ নেই। চালের দাম বাড়ার জন্য মিল মালিক ও আড়তদাররা একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। প্রকৃত দায় কার, তা নির্ণয় করার দায়িত্ব সরকারের। সেজন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক তদারকি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক্ষেত্রে বিশেষ সক্রিয়তা দরকার। শুধু তদারকি থাকলে হবে না, বাজারে তার জোগানও নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাজার ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় চালের মজুদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার অস্থিরতা রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










