আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান খুব বড় না হলেও আলোচনা রয়েছে এর সম্ভাবনা নিয়ে। সম্ভাবনা অনুযায়ী আমাদের অগ্রগতি ধীর। এর অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা। দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক পণ্য থেকে। এক্ষেত্রে বহুদিন ধরেই পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যকরণের কথা বলা হচ্ছে। রফতানি বহুমুখীকরণের অন্যতম চ্যালেঞ্জ পণ্যের আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স অর্জন। এজন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আমরা যদি স্থানীয়ভাবে কাঁচামালের জোগান দিতে পারি তাহলে উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় হবে। তাছাড়া মান ও খরচ বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক না হলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠবে। রফতানি বহুমুখীকরণকে একক বা বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে শিল্প নীতি, আমদানি নীতি, আর্থিক নীতি ও অন্যান্য নীতির সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। নীতি সহায়তা ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। ভারত সরকার দেশটির শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের সরকারও এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে পারে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প অগ্রসর হয়েছে। তাছাড়া কৃষিপণ্যের উৎপাদন মান বজায় রেখে বিদেশী ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী রফতানি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সুফল আসবে। তবে দেশের রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের জন্য আরো গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন আছে। রফতানি বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন দরকার। রফতানি বৈচিত্র্যকরণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজারের আকার ও বাজারের গতিশীলতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি করতে না পারার কারণ হলো, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি। সরকারি ঠিকাদারি কাজ পেতে ঘুষ, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালনায় ঘুষ, কর দিতে ঘুষ—সব জায়গায় এমন ঘুষের কারবার চলতে থাকলে অবস্থা যে শোচনীয় হবে তা বলা বাহুল্য। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে থাকলে তা একচেটিয়া হয়ে ওঠে এবং এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হয় না। একক ব্যবসায়ীর হাতে ব্যবসা খাত থাকলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ওই ব্যবসায় আসতে পারেন না। ভোক্তাকে বেশি দাম দিয়ে ওই পণ্য বা সেবা কিনতে হয়। বাংলাদেশ যে যে খাতগুলোয় পিছিয়ে রয়েছে, সেগুলোয় কর্তৃপক্ষকে আরো মনোযোগ দিতে হবে। ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হয়েছে। এখন এসবের পিছিয়ে থাকার জন্য যে কারণগুলো রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে যদি এগিয়ে যেতে না পারে তাহলে শুধু স্থানীয় ক্ষেত্রে উন্নয়ন দেখালে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না।
আগামীতে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হচ্ছি। ফলে এখন যেসব শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছি, সেগুলো আর থাকবে না। এ অবস্থায় রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এখন থেকেই কার্যক্রম শুরু করতে হবে। যেসব বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেগুলো থেকে সুফল পেতে সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমাদের রফতানি একটি পণ্য অর্থাৎ গার্মেন্ট পণ্যনির্ভর। ফলে এ খাত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যায়নের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আমাদের বাণিজ্য নীতির পর্যালোচনা প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ নীতির অসামঞ্জস্য ও দুর্বলতার কারণেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পিছিয়ে থাকছে বাংলাদেশ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের দুর্বলতাগুলো অনেক বেশি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আর এটাই অর্থনীতির কাঠামো পরিবর্তনের ভালো সময়। দেশের রফতানিতে বৈচিত্র্য আনার জন্য বর্তমান সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। করোনা প্রভাব-প্রেক্ষাপটে বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল থেকে বদলে সৃজনশীল চিন্তা করার সুযোগ অবশ্যই এখন। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়ার তাত্ক্ষণিক পরিবর্তন কিছুটা অসুবিধাজনক, বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্পে। কিন্তু সেখানেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেসব প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা ধরা পড়ছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজের ধরনে পরিবর্তন এনে দক্ষতার সঙ্গে শ্রমশক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকারের জন্য সবচেয়ে সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে আমাদের অতিরিক্ত রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনগুলোর সহজীকরণ। এটা যদি হয় তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল বা ঘরে থেকেও কাজ করা অনেক সহজ হবে। এতে অনেক সময় ও খরচ বাঁচবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে কথা বলা হয়, সেই ডিজিটাল বাংলাদেশকে আরো বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়নের এটা একটা খুব ভালো সুযোগ ও প্রকৃষ্ট সময়।
বাংলাদেশের বিশ্ববাজারে টিকে থাকার পেছনে শক্তিটা কোথায়, তা দেখতে হবে। আমেরিকায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার না থাকলেও ওভেন পোশাক রফতানি বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, ওভেন খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আছে। বাংলাদেশের দরকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো। এজন্য প্রধানত দুটো কাজ করতে হবে। প্রথম হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থাপনা গতিশীল করা গেলে খরচ অনেক কমে যাবে। সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আরো পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদ উন্নয়ন খুবই জরুরি। তাহলে ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এজন্য শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাতে হবে। এতেও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং যা জরুরিও বটে। ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্যের দিকটি বাংলাদেশের একেবারেই দুর্বল নয়; বরং প্রয়োজনীয় ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো থেকে ইতিবাচক সহায়তা ও সমর্থন পেলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কার্যকর ও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।










