প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো
রেমিট্যান্স আমাদের
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আর্থিক সচ্ছলতার
আশায় প্রতি
বছর বহুসংখ্যক
শ্রমিক বিদেশে
যান। পরিবার
থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে দূর পরবাসে অমানবিক
পরিশ্রম করে যে অর্থ
তারা উপার্জন
করেন, সেখানেও
ন্যায্য মজুরি
থেকে তাদের
বঞ্চিত করা হয়। রেমিট্যান্সের আলো ঝলমলে পরিসংখ্যানের নিচে চাপা পড়ে যায় শোষিত
শ্রমিকের বোবাকান্না। সংসারে সুদিন আসবে—এমন প্রত্যাশায় বিদেশে প্রাপ্য মজুরি
থেকে বঞ্চিত
হয়ে মানবেতর
জীবনযাপন করে পরবর্তী সময়ে
শূন্য হাতে
দেশে ফিরেছেন
এমন উদাহরণ
মোটেও কম নয়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, করোনা মহামারীর সময় অনেক শ্রমিকই বেতন না পেয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে কারো ভাগ্যে অর্ধেক মজুরি জুটেছে। চিকিৎসাসেবা, আবাসন সুবিধা, খাবারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে। নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন কেউ কেউ। যে বেতন বা সুবিধার কথা বলে নেয়া হয়েছিল, সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে কিছুই না দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। এছাড়া নানাভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের মজুরি চুরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে কাঠামোগত মজুরি চুরিও রয়েছে। অর্থাৎ শ্রমিককে যে শর্তে নেয়া হচ্ছে, সেগুলো মানা হচ্ছে না। যে চাকরির কথা বলে শ্রমিক নেয়া হয়েছে, অনেক সময় সে চাকরিতে না দিয়ে অন্য কাজ করানো হয়। আবার যে বেতনের কথা বলা হয়, সেটিও দেয়া হয় না। মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী শ্রমিকের জন্য মোটামুটি এটাই বাস্তবতা। বিদ্যমান কাঠামোতেই এটা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে শ্রমগ্রহীতা দেশে শ্রম আইন আছে কিন্তু তার সুবিধা অভিবাসী শ্রমিকরা নানা কারণে পাচ্ছেন না। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পুরো ব্যবস্থায় সমস্যা থাকায় পরিত্রাণেরও কোনো উপায় নেই, যে কারণে এটিকে কাঠামোগত মজুরি চুরি বলা হয়ে থাকে। এছাড়া মজুরি চুরির ঘটনা শুধু কয়েকটি সূচকে সীমাবদ্ধ নয়। বীমা, চিকিৎসা পরীক্ষা, পরিবহন খরচ, দক্ষতা প্রশিক্ষণের অজুহাতেও শ্রমিকের মজুরি কর্তন যেন সাধারণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের উচ্চমজুরি দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে নিয়ে চুক্তিপত্রের দ্বিতীয় সেটে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। বেশির ভাগ শ্রমিকই এসব চুক্তির ভাষা বুঝতে না পারায় নতুন সেই চুক্তি শ্রমিকদের আগের চুক্তির চেয়ে কম বেতন দেয়াকে বৈধতা দেয়। শ্রমিকদের জরিমানা আরোপের আড়ালেও মজুরি কর্তন করা হয়। এর সবকিছুই মজুরি চুরির অংশ। অভিবাসী শ্রমিকরা মৃত্যুর পরও তাদের মজুরি ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
এছাড়া
শ্রমিকদের যে শুধু বেতন
নিয়েই সমস্যা
হচ্ছে এমনটি
নয়, অভিবাসী
শ্রমিকদের ওপর
ভয়াবহ নির্যাতনের কথাও শোনা যায়।
বর্তমানে প্রতিদিন
গড়ে বিদেশ
থেকে ৮-১০টি মরদেহ
আসে। গত ১১ বছরে
দেশে ৩৪ হাজার প্রবাসীর
মরদেহ এসেছে,
কিন্তু এসব
মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয় না।
কীভাবে এসব
শ্রমিক মারা
যাচ্ছেন, তা আমাদের প্রবাসী
কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জানতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে শ্রমগ্রহীতা দেশ ও দাতা উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত না করা হলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশে শ্রমিক না পাঠানোর মতো সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়ার পর নেপাল ও ফিলিপাইন বিদেশে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের গৃহকর্মীরাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন। যার কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। এ কারণে আমাদের দেশ থেকেও গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করা উচিত। রাষ্ট্রকেই এক্ষেত্রে নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।
দেখা যায়, অভিবাসীরা যেসব দেশে কাজ করতে যান, সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশনকে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকায় পাওয়া যায় না। তারা শুধু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকেন, এর বাইরে প্রবাসীদের সহায়তার ক্ষেত্রে তাদের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আবার যেসব এজেন্সি জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে প্রভাবশালী চক্রের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে
অভিযুক্ত দেশের
নিয়োগকর্তারা বেশ ভালো করেই
জানেন যে শ্রমবাজারের ওপর তাদের কতটা
প্রতাপ রয়েছে।
তারা আরও জানেন ভবিষ্যতে
তাদের অভিবাসী
শ্রমিকের প্রয়োজন
হলে সে দেশের সরকার
শ্রমিক আনার
অনুমতি দেবে;
এ ব্যাপারে
কোনো সমস্যা
হবে না। সেই সঙ্গে
উভয় দেশের
নিয়োগকারীরা নতুনভাবে
উচ্চমূল্যে শ্রমিকদের
কাছে ভিসা
বিক্রি করে বাড়তি আয় করবে। শ্রমিকদের
উৎস দেশগুলোর
সরকার চাইবে
যেকোনোভাবেই হোক একজন অতিরিক্ত
শ্রমিক প্রবাসে
যাক এবং উপার্জন করে অর্থ পাঠাক।
সেই অর্থের
পরিমাণ যত কমই হোক না কেন তা জাতীয়
উন্নয়নে এক বড় মাপকাঠি
রেমিট্যান্সের জন্য
তো গুরুত্বপূর্ণ! এভাবে শুধু রেমিট্যান্স আহরণের প্রতি মনোযোগী
হওয়ায় কার্যত
শ্রমিকদের অধিকার
নিয়ে মনোনিবেশ
করার সময়ই
যেন হয় না প্রবাসী
কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের।
এটা
সত্য, রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে দক্ষ শ্রমশক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি
প্রয়োজন নতুন
নতুন শ্রমবাজার সন্ধান, কিন্তু তার
চেয়ে বেশি
প্রয়োজন শ্রমিকরা
তাদের প্রাপ্য
অধিকার বুঝে
পাচ্ছেন কিনা
সেটি নিশ্চিত
করা। এর ব্যত্যয় ঘটলে
শ্রমিকরা শুধু
দেশের রিজার্ভ
বৃদ্ধিতেই ভূমিকা
রেখে যাবেন,
কিন্তু প্রবাস
জীবন শেষে
তাদের সঞ্চয়ে
কিছুই থাকবে
না, বরং
প্রাপ্য মজুরিটুকুও না পেয়ে দেশে
ফিরে আসতে
হবে।
প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতে শ্রম গ্রহীতা দেশগুলোর সঙ্গে গৃহীত সমঝোতা ও চুক্তির প্রতিফলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মূলত বিদেশ বিভুঁইয়ে একজন শ্রমিক খুব অসহায় থাকেন, সে অবস্থায় নিয়োগদাতা কোম্পানি তাদের প্রতি অবিচার করলে ক্ষেত্রবিশেষে কিছুই করার থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি পাশে না দাঁড়ায় তাহলে আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনরা নিদারুণ বঞ্চনার শিকার হবেন। আর এ বঞ্চনার প্রতিকার রাষ্ট্রকেই করতে হবে। রাষ্ট্র তার রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাশে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়াবে এটিই আমাদের প্রত্যাশা। কেননা আধুনিক সভ্যতার এ যুগেও অভিবাসী শ্রমিক বঞ্চনার যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সে দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকরা যেন উপযুক্ত মজুরি পান সেজন্য শ্রম গ্রহীতা রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন এবং যেসব ক্ষেত্রে চুক্তি হয়েছে সেক্ষেত্রে চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।










