সড়ক ব্যবস্থার যথাযথ কার্যকারিতার ক্ষেত্রে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুনির্দিষ্ট গতিসীমায় নির্মিত কোনো সড়কে এর চেয়ে অধিক গতিতে যানবাহন চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং ভয়াবহতা বেশি থাকে। এজন্য যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে সড়কে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী ব্যবহূত এ ধরনের ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সড়কে গতিরোধক (স্পিড ব্রেকার) স্থাপন। এটি যানবাহনের গতি কমিয়ে আনতে চালককে বাধ্য করে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে এবং যাত্রীদের মূল্যবান জীবন বাঁচে। বৈশ্বিক চর্চার অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও সড়ক-মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় গতিরোধক রয়েছে। অথচ দুঃখজনকভাবে দেশে অনেক গতিরোধকই জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে জীবন সংহারের কারণ হচ্ছে। এটি সড়ক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বৈকি। এর জুতসই সমাধান দরকার।
বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় গত দুই দশকে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটলেও বিভিন্ন অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশাগত ত্রুটি ও পরিকল্পনাহীনতা একটি আশঙ্কাজনক উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। দেশের সড়ক-মহাসড়কে নির্মিত গতিরোধকগুলোর ক্ষেত্রেও বেশ অপরিকল্পনার ছাপ দৃশ্যমান। মানুষের চলাচল সহজ ও দুর্ঘটনা এড়াতে সাধারণত স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল বা হাটবাজারের সামনে সঠিক প্রকৌশলগত নকশার ভিত্তিতে গতিরোধক স্থাপনই বৈশ্বিক রীতি হলেও বাংলাদেশে এর উল্টো। গতিরোধক নির্মাণ এখানে বাস্তবায়িক প্রয়োজনের তুলনায় ঘটনার আকস্মিকতা দ্বারা প্রভাবিত। দেখা যায়, কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে তাত্ক্ষণিক সমাধান হিসেবে স্থানীয়রা গতিরোধক দেয়ার দাবি তোলে এবং কোনো ধরনের দূরদর্শী পরিকল্পনা ছাড়াই তা অল্প দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়। তদুপরি বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী মহল থেকেও গতিরোধক স্থাপনের চাপ আসে। মূলত এসব অপরিকল্পিত গতিরোধকই দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। বড় বিষয় হলো, কোনো কিছু শুধু নির্মাণ করলেই হয় না, তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের বরাবরই অভ্যাসগত প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্য বিরাজমান। গতিরোধকগুলোর ক্ষেত্রেও এটি প্রতীয়মান। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এসেছে, সড়ক-মহাসড়কের অনেক গতিরোধকে সাদা রঙের রোড মার্কিং নেই, নেই কোনো সতর্কীকরণ চিহ্ন। অনেক গতিরোধকের সামনে আবার সাইনবোর্ডও নেই। সংগত কারণেই এসব গতিরোধক অনেক ক্ষেত্রে চালকের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে এবং ঘটছে দুর্ঘটনা। বলা চলে, এসব গতিরোধকে সুফলের চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে। সুতরাং অপরিকল্পিত গতিরোধকগুলো অপসারণ জরুরি।
নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিনিয়ত প্রাণ ঝরছে সড়কে। আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষ। অনেক আগেই পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বেড়ে চলা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গতিরোধকগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অনেক গতিরোধক অপসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপরিকল্পিত গতিরোধক রয়ে গেছে। সেগুলো চিহ্নিত করে অপসারণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ঘটনা-পরবর্তী তাত্ক্ষণিক দাবি নয়, অপরিহার্য প্রয়োজনের নিক্তিতে জনপারাপারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গতিরোধক অবশ্যই থাকবে। সেগুলো চালকদের কাছে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলতে ব্যবস্থা নিতে হবে। সতর্কীকরণ সংকেতগুলো আরো স্পষ্ট করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। এদিকটায় বিশেষ দৃষ্টি দেয়া চাই। গতিরোধকের কার্যকারিতা নিশ্চিতে নকশা ও প্রকৌশলগত সঠিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বসানো না হলে তা দুর্ঘটনা ঘটায়। অনেকাংশে হচ্ছেও তাই। গতিরোধক স্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও অভিজ্ঞদের সম্পৃক্ত না করে অনেক সময় ঠিকাদারদের খেয়ালখুশি মতো তৈরি করা হয়। ফলে এর নকশাগত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায় বিধায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। সুতরাং গতিরোধকের পরিকল্পনাগত যথার্থতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দক্ষ প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ত করা চাই।
গতিরোধকে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রবণতা উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি অন্যতম সমস্যা। এ ধরনের দেশগুলোয় বিপুলসংখ্যক মানুষই মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল এবং বিভিন্ন ধরনের অযান্ত্রিক যান ব্যবহার করে। অনেক সময় গতিরোধকের অবস্থান বুঝতে না পেরে এ ধরনের বাহনের চালক ও যাত্রীরা দুর্ঘটনার শিকার হয়। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ আরো অনেক দেশের ক্ষেত্রে সত্য। তাই গতিরোধককেন্দ্রিক দুর্ঘটনা কমাতে চালকসহ জনসাধারণের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা বাড়িয়ে সর্বসাধারণকে সতর্ক ও সচেতন করে তুলতে হবে। মাঝে এ ধরনের কিছু কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছিল। সেগুলো স্তিমিত হয়ে গেছে। এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
গতিসংক্রান্ত দুর্ঘটনা কমানো যেখানে গতিরোধকগুলো স্থাপনের উদ্দেশ্য, সেখানে সেগুলোই হচ্ছে অনেক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর কারণ। তাই অনেক দেশই এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণে বিভিন্ন অভিনবমূলক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো স্পিড ব্রেকার আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (এসডব্লিউএএস)। এটি মূলত একটি স্মার্টফোনভিত্তিক ব্যবস্থা। গাড়ি যখন কোনো গতিরোধকের কাছাকাছি এগোতে থাকে, তখন সেলফোনের একটি অ্যাপের মাধ্যমে চালকদের এটি সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা হয়। এতে চালকরা গাড়ির গতি কমানোর সুযোগ পান এবং দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান। এ ব্যবস্থা ভারতে প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন প্রায় সব চালকেরই স্মার্টফোন রয়েছে। এখানেও তা প্রবর্তন করা সম্ভব। বাইরের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে দুর্ঘটনা কমাতে এ ধরনের উদ্ভাবনমূলক উপায় সন্ধানও জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতামতের সন্নিবেশ ঘটিয়ে টেকসই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










