কৃষিতে
বর্তমান সময়ের আমাদের দেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা-পরবর্তী কৃষিতে চ্যালেঞ্জ আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনা-পরবর্তী দেশের কৃষি অর্থনীতিতে কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই এ প্রবন্ধে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। বর্তমান মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান না হলে কোনো পণ্যই আর কেউ বড় পরিসরে উৎপাদন করেন না। তাহলে লাভ ছাড়া কৃষিপণ্যই-বা কেন উৎপাদন করবেন? একসময় নিজের ভরণ-পোষণের জন্য মানুষ কৃষিকাজ করত। উদ্বৃত্ত যা থাকত, তা বাজারে বিক্রি করে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করত। আমরা তাকে খোরপোষ কৃষি বলতাম। কৃষিতে নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অবস্থার অনেকটা উন্নয়ন হয়েছে। এখন এ দেশের কৃষিকে আমরা আধা বাণিজ্যিক কৃষি বলতে পারি। করোনা-উত্তর কৃষিকে পূর্ণ বাণিজ্যিক রূপ দিতে চাইলে এর চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া প্রয়োজন।
আমি আগের প্রবন্ধে বলেছি, কৃষি একটা জটিল বিজ্ঞান এবং এর বাণিজ্যিক রূপও অনেক জটিল। আমাদের দেশের কৃষি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের ৮০ শতাংশ জনগণ এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বলে থাকি। যেহেতু জমির তুলনায় এ দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি, জনপ্রতি জমির পরিমাণ বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক কম, তাই কৃষিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক রূপ দেয়া অত্যন্ত দুরূহ। তার পরও কৃষিকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়া সম্ভব না হলে করোনা-পরবর্তী সময়ে এ পেশাকে বাঁচিয়ে রাখা কষ্টকর হবে।
যেসব দেশে কৃষি বাণিজ্যিক রূপ লাভ করেছে, সেখানে জমির আকার অনেক বড়, কৃষির সব ধরনের অপারেশনে যন্ত্রের ব্যবহার হয়, প্রাইভেট সেক্টরের প্রাধান্য বিদ্যমান, ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী, বাজার ব্যবস্থা উন্নত, এক্সপোর্ট সিস্টেম শক্তিশালী
এবং কৃষিতে বিনিয়োগও অনেক বেশি। পক্ষান্তরে আমাদের দেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে জমি আকারে অনেক ছোট। বেশকিছু অপারেশন যন্ত্রের মাধ্যমে হলেও অনেক কাজই ম্যানুয়ালি করতে হয়। ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ এখনো শক্তিশালী নয়। বাজার ব্যবস্থাও দুর্বল এবং রফতানিও অনেক কম। সেই সঙ্গে বিনিয়োগও কম। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতি সহায়তার কারণে প্রাইভেট সেক্টর দিনে দিনে বিকশিত হচ্ছে। যদিও কৃষিতে আরো বেশি উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিগত সময়ে জমির আকার বড় করার জন্য সমবায় পদ্ধতি গ্রহণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু তা এখনো কার্যকরী হয়নি। আসলে সমবায় ব্যবস্থার ওপর জনগণ এখনো খুব বেশি আস্থা রাখতে পারেনি, বিশেষ করে বড় বড় উদ্যোগের ক্ষেত্রে। এর নানা কারণও রয়েছে, বিশেষ করে এ ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব। তবে সমবায় ব্যবস্থা ছাড়া ছোট ছোট জমি বড় আকারে করার আর কোনো উপায় এখনো আমরা খুঁজে পাইনি। বিকল্প কিছু পেলে তা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের কৃষক ভাইয়েরা বা উৎপাদনকারীরা তাদের কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে হিমশিম খায় এবং বাজারে পণ্যের দাম পায় না। পক্ষান্তরে আমরা যারা ভোক্তাসাধারণ শহরে বসবাস করি, তারাও কম দামে পণ্য ক্রয় করতে পারি না। দাম অনেক বেশি হয়। অধিকাংশ শেয়ার মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়। তবে একথাও সত্য, মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া প্লটের জিনিস কীভাবে প্লেটে আসবে? আমাদের এ কৃষি ব্যবস্থায় এর উত্তর এখনো জানা নেই। তবে কম খরচে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। তাহলেই কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হবে।
বর্তমান মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ফর্মুলা কৃষিপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। যেসব কৃষিপণ্যের চাহিদা আছে, আমরা সাধারণত সেসব পণ্যই উৎপাদন করে থাকি। ক্ষেত্রবিশেষে আবার চাহিদা তৈরি করতে হয়। যেমন এ দেশে বিনা পয়সায় ‘চা’ খাইয়ে চায়ের চাহিদা তৈরি করা হয়েছিল। ড্রাগন ফল একসময় এ দেশের মানুষ চিনত না, কিন্তু এখন এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই চাহিদা ও সরবরাহ বর্তমানে একে অন্যের পরিপূরক। যেমন শাকসবজি আমরা নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় কম খাই বলেই শাকসবজি আমাদের দেশে অনেক সময়ে উদ্বৃত্ত মনে হয়। কিন্তু শাকসবজি আমরা অনুমোদিত মাত্রায় গ্রহণ করলে আমাদের আরো শাকসবজির প্রয়োজন হবে। অথচ ভরা মৌসুমে টমেটো, বাঁধাকপি-ফুলকপি ক্ষেতেই নষ্ট হয়। কিন্তু শহরে বসে আমরা অনেক দাম দিয়েও তা পাই না। তাই কৃষিপণ্যের ট্রান্সপোর্ট খরচ যেকোনো মূল্যে কমিয়ে আনতে হবে। সরকার এ বছর রেলের মাধ্যমে আম ঢাকায় এনে ব্যবসায়ীদের সহায়তা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। অন্যান্য ফল ও শাকসবজির জন্য এমন উদ্যোগই প্রয়োজন। কম খরচে পণ্য পরিবহন সম্ভব হলেই কেবল এটি লাভজনক হবে। তাছাড়া কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন ও উৎপাদন-পরবর্তী খরচ যেকোনো মূল্যে কমিয়ে আনতে হবে। অধিকন্তু, কৃষিপণ্য প্রসেসিং করেও লাভজনক করা যায়। গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে যে জ্যাম, জেলি, আচার ছাড়াও হাফ প্রসেসড সবজি ও কাঁচা কাঁঠাল এবং আদা, রসুন ও কাঁচামরিচ গুঁড়ো করে বাজারজাত করা সম্ভব। তাছাড়া আমদানিনির্ভর ডাল ফসল, তেল ফসল ও মসলা ফসল বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে উচ্চফলনশীল জাতের ফসল চাষের মাধ্যমে এগুলোর আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে কৃষি ঢেলে সাজাতে হবে।
যে কথাটি বলছিলাম, চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থার প্রচলন করা যেতে পারে। এখানে যেমন বাজারের অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন, সেই সঙ্গে এর ব্যবস্থাপনারও উন্নয়ন প্রয়োজন। এজন্য আমাদের দেশের উপযোগী যেমন একটি আধুনিক মার্কেট রিসার্সের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এর বাস্তব প্রয়োগ। অধিকন্তু, কৃষক সমবায়গুলোর সহজ মার্কেট অ্যাকসেসও একান্ত প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আধুনিকায়ন।
চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। কৃষক ভাইয়েরা ধানের দাম পান না বলে প্রায়ই অভিযোগ করেন। অভিযোগটি খুবই সত্য। ধান বা চাল উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্য বিবেচনা করলে একে লাভজনক বলা যায় না। তবু কৃষক ভাইয়েরা ধান উৎপাদন করেন। কারণ ধান সহজেই উৎপাদন করতে পারেন, উৎপাদন প্রযুক্তি তাদের জানা আছে, অধিকাংশ জমি ধান চাষের উপযোগী এবং ধান উৎপাদনের পর দীর্ঘদিন গোলাজাত করে রাখা যায়। তাই অনেকেই ধান উৎপাদন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ধান উৎপাদনের পাশাপাশি উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদন করে অনেকেই লাভবান হয়েছেন। অন্যরাও তা করতে পারেন। আর ভাত যেহেতু আমাদের প্রধান খাদ্য, তাই ধান উৎপাদন আমাদের করতেই হবে। ধানের কৃষক পর্যায়ের দাম পাওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছে এবং চাল করে গুদামজাত করছে। এটা একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তাছাড়া ধান কিনে কৃষকের গোলায় রেখেও প্রয়োজনের সময় সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে ক্রয় করা ধান যদি সে সময় কেউ দিতে না চায়, তবে একটা সুনির্দিষ্ট হারে (অবশ্যই নিম্ন হারে) সুদসহ ধানের দাম মিটিয়ে দিয়ে সে ধান তার নিজের করে নিতে পারবে—এমন বিধান করা যায় কিনা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা ভেবে দেখতে পারে।
বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল মোট কৃষিজমির এক-দশমাংশ, যা এখনো underutilized অবস্থায় আছে। এখানে উদ্যান ফসলের বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় কফি, কাজুবাদামসহ উদ্যান ফসলের বাণিজ্যিক চাষের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে এবং ব্যাপক গবেষণার জন্য গবেষণা প্রকল্পও গ্রহণ করছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এক্ষেত্রে জেনুইন প্রাইভেট সেক্টরে যারা অতীতে বিভিন্ন কাজে সফলকাম হয়েছেন, তাদেরকেও সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তাছাড়া এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক কৃষির জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, উৎপাদন ও উৎপাদন-পরবর্তী প্রসেসিং, বাজারজাত যেন কোনোভাবেই বাধার সৃষ্টি না হয়, তাও ভেবে দেখতে হবে এবং সময়মতো তার সমাধান করতে হবে। তাহলেই এ উদ্যোগগুলো সফলকাম হবে। তাছাড়া সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃষ্টিবহুল পাহাড়ি অঞ্চলে কোকোও চাষ করা যায় কিনা, তাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
কৃষিতে বাণিজ্যিক রূপ দিতে চাইলে রফতানির জন্য অধিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করতে হবে এবং রফতানির ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজের জন্য বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলো রফতানির বাজার সার্চ করে পণ্য রফতানিতে সহায়তা করতে পারে। এজন্য প্রয়োজনে এসব মিশনে কৃষি বিজ্ঞানীদেরও নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। আমরা এটাকে অ্যাগ্রো ডিপ্লোমেসি বলতে পারি। যে কথাটি বলছিলাম, কৃষিপণ্য অবশ্যই আইএসও মানসম্পন্ন হতে হবে এবং বছরের অধিকাংশ সময় ধরে যেন রফতানি করা যায়, তেমন পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। খুব বেশি সিজনাল পণ্য রফতানি করে রফতানি বাজার ধরে রাখা কষ্টসাধ্য। আমাদের বর্তমান রফতানির অধিকাংশ হয়ে থাকে ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের এথনিক মার্কেটের জন্য। তাই মেইনস্ট্রিম মার্কেটের উপযোগী করে পণ্য উৎপাদন করতে হবে, যাতে রফতানির পরিমাণ বাড়ানো যায়। এমন কিছু কৃষিপণ্য হতে পারে সাগর কলা, আনারস, মাচায় তরমুজ চাষ, কাঁচামরিচ, পেয়ারা ইত্যাদি; যেগুলো সারা বছর উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করা যায়। আলু এ দেশে সিজনাল হলেও বছরের কয়েক মাস আলু রফতানি করা যেতে পারে। তাছাড়া প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চালও উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। রফতানির কথা মাথায় রেখেই এসব পণ্য উৎপাদন করতে হবে এবং কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব। এজন্য গ্রিনহাউজ-ল্যাবসহ কিছু প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস/অবকাঠামোর ব্যবস্থাও করতে হবে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কৃষি বাণিজ্যিকীকরণে এক কথায় কোনো প্রেসক্রিপশন নেই। উপরোক্ত আলোচনায় যেসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তার বিষয়ে সুদৃষ্টি দেয়া হলে করোনা-উত্তর কৃষিতে বাণিজ্যিকীকরণ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। তবে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ে একটা কমিশন গঠন করা যায় কিনা, তাও ভেবে দেখা যেতে পারে।
ড. আবুল
কালাম আযাদ:
সাবেক
মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা
কাউন্সিল










