করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা ও ক্ষতিগ্রস্ত খাত পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া মাত্রই সরকার কয়েক দফায় বিভিন্ন খাতের জন্য আলাদা আলাদা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। ফলে উৎপাদনমুখী খাত কিছুটা হলেও চাঙ্গা রাখা গেছে। কর্মসংস্থান সংকোচনের হারও নিয়ন্ত্রণে রেখেছে প্রণোদনা প্যাকেজ। কৃষি থেকে শিল্প-সেবা খাত, এমনকি প্রবাস থেকে ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্যও সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল প্রথম দফায়। এসবই ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে প্যাকেজের বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে। প্রণোদনা বাস্তবায়নের বড় দায়িত্ব ছিল ব্যাংকের ওপর। এক্ষেত্রে বড় শিল্প-ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা সুফল পেলেও তদারকির দুর্বলতাসহ কিছু বিধিমালার ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পক্ষ প্রণোদনার সুযোগ নিতে পারেনি, যা দুঃখজনক।
গণমাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহৎ শিল্প, রফতানিমুখী শিল্প এগুলোর জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন ৮০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য যেসব প্রণোদনা, তার বাস্তবায়নের গতি খুবই ধীর; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনার মাত্র ৩০ শতাংশের মতো বাস্তবায়ন হয়েছে। স্বাভাবিক বিবেচনায় প্রতীয়মান হয় যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহযোগিতা বেশি দরকার। প্রণোদনা প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাঁচিয়ে রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রণোদনা বাস্তবায়ন হতে হবে। কারণ এ খাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ সম্পৃক্ত। তাছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য বাঁচানোও অর্থনীতির জন্য জরুরি। একই সঙ্গে কৃষির প্রণোদনা বাস্তবায়নেও তদারকি বাড়াতে হবে। তাদের জন্য হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে ব্যাংকের বড়দের প্রতি পক্ষপাতও। সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের খুব কমই ঋণ পেয়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার পরও ব্যাংকগুলো থেকে তারা কোনো সাড়া পাননি। কৃষিঋণ পেতেও কৃষকরা একই রকম ভোগান্তিতে আছেন। করোনাকালে গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু সরকারের প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষক, প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। তাদের হাতে টাকা পৌঁছানো না গেলে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। এজন্য কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন করতে আমাদের তরুণ সমাজকে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি দক্ষ জনবল হিসেবে তৈরি করতে সরকারকে আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। আমরা আশা করব, অর্থ মন্ত্রণালয় কেবল নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবে না, সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো যাতে দ্রুত ঋণ বিতরণ করে, সেটিও তারা নিশ্চিত করবে।
নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের কাঠামোয় কিছুটা পরিবর্তন আনা দরকার। তাছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারাও যেন ঋণের সুবিধা পেতে পারেন, সে ধরনের প্যাকেজের আওতা বাড়াতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজের ভালো উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে তা পুনরুদ্ধারে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হলে কিছু বিষয়ে নজর দেয়া দরকার। এই প্রণোদনার মাধ্যমে যদি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোগ এবং অতি ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহায়তা করতে হয়, তাহলে নানা রকম বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, যারা সরাসরি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও দরিদ্রদের নিয়ে কাজ করে, তাদের জন্য প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তাছাড়া ব্যাংকগুলোর প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে ব্যবসার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার উপায় সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারে এমন ব্যবস্থা। সর্বোপরি অর্থনীতিতে পণ্যের চাহিদা না থাকলে শুধু জোগান বাড়ানোর প্রণোদনা দিয়ে সুফল মিলবে না। তাই দেশীয় বাজারকে চাঙ্গা রাখতে হলে বিভিন্ন রকম কর্মসূচির আওতায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, শহরাঞ্চলে খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং পাশাপাশি সচ্ছল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে দেশী পণ্য ক্রয় করতে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য তাদের নানা রকম পণ্য ক্রয় অব্যাহত রাখতে হবে।
এখন পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার সুবিধা পেয়েছে, তারা হলো কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। প্রণোদনার ক্ষেত্রে এটা কাম্য নয়। দ্বিতীয়বার যদি প্রণোদনা দেয়া হয় তাহলে এমনভাবে মানদণ্ড ঠিক করতে হবে, যাতে সত্যি সত্যি যারা ক্ষতিগ্রস্ত, যারা চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা নেই, এমন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রথম প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি ছিল, নতুন প্যাকেজ বাস্তবায়নে যেন সেগুলো না থাকে, সেজন্য তদারকি আরো বাড়াতে হবে। আর্থিক প্রণোদনা প্রদানে ঝুঁকিতে থাকা খাত ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন প্রাধান্য পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য দেশে যেভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতকেই প্রাধান্য দিয়ে উৎপাদক-ভোক্তা সবার হাতে নগদ অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেভাবে এখানেও উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন অনেকে। আর সেটা করতে পারলেই প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে।










