জাতীয় সংসদে সম্প্রতি ২০২০-২১ অর্থ-বছরের বাজেট পাস হয়েছে। প্রতি বছরের মত এবারো বাজেটে তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হিসাবে ‘তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাজেটে নির্ধারিত তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও আরোপিত কর পর্যালোচনা করলে অতি সহজেই অনুমান করা যায়, এই মূল্য ও কর দিয়ে এই দুটি লক্ষ্যের একটিও অর্জন সমম্ভব নয়। বরং এর মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী আরো একটি ‘তামাক কোম্পানির লাভের বাজেট’ হাজির করেছেন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে বিশ্বের যেসব দেশে তামাকজাত দ্রব্য সস্তা, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। প্রতিবছর বাজেটে এসব দ্রব্যের দাম বাড়ানো হলেও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই বৃদ্ধি তামাক নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো অবদান রাখছে না বরং সেটা তামাক কোম্পনিকে আরো লাভবান করেছে। জটিল ও স্তর বিশিষ্ট কর কাঠামো এবং ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থার কারণে এটি ঘটছে।

বর্তমান পদ্ধতিতে তামাকের দাম বৃদ্ধি ও করারোপে তামাক কোম্পানির লাভ!

বর্তমান পদ্ধতিতে তামাকজাত দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির লাভের অংশ তামাক কোম্পানির ঘরে ওঠে। যেমন, এবার বাজেটে প্রিমিয়াম স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ১২৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২৮ টাকা করে সম্পূরক শুল্ক অপরিবর্তিত (৬৫%) রাখা হয়েছে। ফলে বর্ধিত ৫ টাকার ৬৫% সম্পুরক শুল্ক, ১৫% ভ্যাট ও ১% স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ হিসাবে (মোট ৮৬%) সরকার পেলেও তামাক কোম্পানি এর ১৪% অতিরিক্ত মুনাফা হিসাবে পেয়ে যাচ্ছে।

তামাক কোম্পানির প্রদত্ত হিসাব মতে এই স্তরের ৫১০ কোটি স্টিক সিগারেট বছরে বিক্রি হয়। এই প্রক্রিয়ায় দাম বৃদ্ধির ফলে শুধুমাত্র এই একটি স্তর থেকে তামাক কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা থাকবে পায় ৩৬ কোটি টাকা। অতিরিক্ত কোন অর্থ কোন শ্রম অথবা অরিরিক্ত অন্য কোন বিনিয়োগ ছাড়াই তোমাক কোম্পানি শুধুমাত্র একটি স্তরের সিগারেট থেকেই এমন অতিরিক্ত মুনাফা পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় বহুজাতিক তামাক কোম্পানির নিজস্ব তথ্যে দেখা যায় ২০১৮ সালে তাদের উৎপাদন ৩ শতাংশ কমে গেলেও তাদের নিট মুনাফা বেড়েছে ২৮ শতাংশ। যা অন্য পণ্য উৎপাদনকারী কোন কোম্পানির পক্ষে সম্ভবপর নয়।

বাংলাদেশে তামাকপণ্যের ওপর মূল্যের শতাংশ হারে (ad-valorem) সম্পূরক শুল্ক ধার্য করার ফলে তামাকের মত ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি এভাবে লাভবান হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই মূল্যের শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট সম্পুরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। এতে এখন যে টাকা তামাক কোম্পানি অতিরিক্ত মুনাফা হিসাবে পেয়ে যাচ্ছে তাও সরকারের ঘরে জমা হবে।

তামাকজাত দ্রব্যের করারোপে জন-বান্ধব প্রস্তাব যেমন হতে পারতো

প্রতি বছর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণ বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ ও করারোপের জন্য একটি সুপারিশ তৈরী করেন। আধুনকি অর্থনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এই সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। এই সুপারিশ প্রণয়নে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নসহ সার্বিক জনস্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এ বছরও একইভাবে তেমন একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করে সরকারের কাছে প্রেরণ করেছে দেশের তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো।

করারোপের ‘অ্যড ভ্যালোরেম’ পদ্ধতি তামাক কোস্পানীকে লাভবান করে তাই এই প্রস্তাবে অন্যতম সুপারিশ ছিলো ‘সকল তামাকজাত দ্রব্যের ওপর করারোপের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে অ্যড ভ্যালোরেম পদ্ধতিতে সম্পুরক শুল্ক আরোপের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে হবে হবে’।

বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের ওপর করারোপে আরো একটি ত্রুটি হলো সিগারেটের বহু মূল্যস্তরবিশিষ্ট করারোপ ব্যবস্থা। বাংলাদেশে সিগারেটকে চারটি মূল্যস্তরে ভাগকরে করারোপ করা হয়। পদ্ধতিটি একই সাথে জটিল এবং ধূমপায়ীদের নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর নয় বরং তা ধূমপান জিইয়ে রাখতে এবং তরুণদের ধূমপান শূরু করতে সহায়ক পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কারণ চারটি মূল্য স্তরের কারণে দাম বাড়লেও ধুমপায়ী ব্যবহার না কমিয়ে অপেক্ষাকৃক কমদামের সিগারেট বেছে নিচ্ছে। আবার সহজলভ্য তাই তরুনরা সহজেই ধূমপান শুরু করতে পারছে। তাই এই প্রস্তাবে সিগারেটের মূল্য স্তর চারটি থেকে কমিয়ে দু’টি করতে সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্য দিকে তামাকজাত দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির হার যদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির হার, মানুষের সামর্থ বৃদ্ধির হার এবং মূদ্রাস্ফীতির হারের চাইতে অধিক না হয় তবে তা তামাক নিয়ন্ত্রণে কোন অবদান রাখতে পারে না। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সিগারেটের দাম বৃদ্ধির হার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। বিগত ১০ বছরে চাল ও ডিমের দামের চেয়ে সিগারেটের দাম সিগারেটের দাম কম বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞগণ ২০২০-২১ অর্থ বছরের জন্য তামাকজাত দ্রব্যের মূ্ল্য নির্ধারণ ও করারোপে নিম্নোক্ত প্রস্তাব করেছিলেন-

·         • সিগারেটের মূল্যস্তর ৪টির পরিবর্তে ২টি নির্ধারণ করে ১০ শলাকা সিগারটের খুচরা মূল্য নিম্নস্তরে ৬৫+ টাকা নির্ধারণ করে ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক এবং উচ্চস্তরে ১২৫+ টাকা নির্ধারণ করে ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১৯ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ

·        •  ফিল্টার ছাড়া ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৪০ টাকা, ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৬.৮৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক এবং ফিল্টারসহ ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৩২ টাকা, ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৫.৪৮ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ

·         • প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৪০ টাকা, ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৫.৭১ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক এবং গুলের খুচরা মূল্য ২৩ টাকা টাকা, ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৩.৪৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ

উপর্যুক্ত হার ও পরিমাণে করারোপের পাশাপাশি সকল তামাকজাত পণ্যে ১৫% ভ্যাট ও ১% স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ করা।

বাজেটে যা আছে

বাজেটে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়নি এবং সিগারেটের মূল্য স্তর আগের মত চারটিই রাখা হয়েছে।

সিগারেটে নিম্নস্তরের খুচরা মূল্য মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৩৯ টাকা নির্ধারণ এবং ৫৫% এর স্থলে ৫৭% সম্পুরক শুল্ক আরোপ; মধ্যম স্তরে গত বছরের মত ৬৩ টাকা এবং ৬৫% সম্পুরক শুল্ক বহাল; উচ্চ স্তরের খুচরা মূল্য মাত্র ৪ টাকা বাড়িয়ে ৯৭ টাকা এবং প্রিমিয়ার স্তরের মূল্য ৫ টাকা বাড়িয়ে ১২৮ টাকা নির্ধারণ করে উভয় ক্ষেত্রেই ৬৫% সম্পুরক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে।

ফিল্টার ছাড়া ২৫ শলাকা বিড়ির মূল্য ১৪টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা, ১২ শলাকার মূল্য ৬.৭২ থেকে ৯ টাকা এবং ৪.৪৮ টাকা থেকে ৬ টাকা নির্ধারণ করে ৩০% সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে।

ফিল্টারসহ ২০ শলাকা বিড়ির মূল্য ১৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯ টাকা এবং ১০ শলাকার মূল্য ৮.৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা নির্ধারণ করে ৪০% সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে।

জর্দা প্রতি ১০ গ্রামের খুচরা মূল্য ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা এবং গুল প্রতি ১০ গ্রামের খুচরা মূল্য ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা নির্ধারণ করে উভয় ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৫৫% নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই বাজেট লক্ষ্য পূরণে কতটা অবদান রাখবে!!

বাজেটে নিম্নস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়ায় প্রতি শলাকায় দাম বাড়বে মাত্র ২০ পয়সা বা ৫.৪ শতাংশ অথচ একইসময়ে মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এর চেয়ে অনেক বেশি (১১.৬ শতাংশ)। সিগারেট ধুমপায়ীদের ৭২ শতাংশই নিম্নস্তরের সিগারেটের ভোক্তা। নিম্ন স্তরে এই সামান্য দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যম স্তরের দাম অপরির্তিত রাখায় তাদের ধূমপানের অভ্যাস আরো বাড়বে এবং আয় বৃদ্ধির তুলনায় পণ্যটি সস্তা হয়ে যাওয়ায় তরুণরা ধুমপানে উৎসাহিত হবে।

উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরে যথাক্রমে মাত্র ৪ টাকা ও ৫ টাকা দাম বৃদ্ধি একই ফল আনবে বরং এখানে কর হার বৃদ্ধি না কারায় তামাক কোম্পানির লাভ বেড়ে যাবে এবং সুনির্দিষ্ট কর আরোপ না করায় সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

প্রতি শলাকা বিড়ির দাম বেড়েছে মাত্র ১৬ পয়সা। এই বৃদ্ধি তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে বা রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে কতটা অবদান রাখবে তা সহজেই অনুমেয়। বরং এখানেও কোম্পানির লাভ ২৫ শলাকার প্রতি প্যাকেটে ২ টাকা ১৬ পয়সা বাড়ছে ।

জর্দা ও গুলের মূল্য বৃদ্ধি সন্তোষজনক হলেও সুনির্দিষ্ট কর আরোপ না করায় এখানেও উৎপাদনকারী কোম্পানির লাভ বাড়ছে প্রতি ১০ গ্রাম জর্দায় ১ টাকা ৪০ পয়সা এবং গুলে ৭০ পয়সা।

সার্বিক পর্যলোচনায় দেখা যায় ‘তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমানো এবং রাজত্ব আয় বৃদ্ধির যে লক্ষ্য নিয়ে তামাকজাত দ্রবের মূল্য ও কর নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ হবে না। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে না, সাধারণ মানুষের ধূমপান ছাড়তে বা কমাতে কোন ভূমিকা রাখবে না এবং ধূমপান শুরু করতে পারে এমন তরুণ প্রজন্মকে ধূমপানে নিরুৎসাহিত করা যাবেনা। সর্বোপরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর এটি মারাত্বক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি তামাক কোম্পানিকে নানাভাবে লাভবান করবে যা তাদেরকে ব্যবসা প্রসারে উৎসাহিত করবে। এই বাজেটের মাধ্যমে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আরো একটি ‘তামাক কোম্পানির লাভের বাজেট’ উপহার দিলেন।

জীবন বাঁচাতে ও রাজস্ব আয় বাড়াতে তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপ

বিশেষজ্ঞগণ বলেন, প্রস্তাবিত পরিমাণে তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ ও করারোপ, ‘সুনির্দিষ্ট কর’ আরোপ এবং সিগারেটের মূল্যস্তর চারটির পরিবর্তে দুইটি নির্ধারণ করা হলে ২০ লক্ষ ধুমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দেবে। প্রস্তাবিত হার ও পদ্ধতিতে করারোপের ফলে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে ৬ লক্ষ ধূমপায়ীর জীবন রক্ষা হবে। একইসঙ্গে রাজস্ব আয় প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। প্রথম বছরেই যার হার হবে বিড়ি ও সিগারেট থেকে প্রাপ্ত বর্তমান কর রাজস্বের চেয়ে অন্তত ১৪% বেশি।

করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারীর কারণে দেশ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এই ক্ষতি পোষানোর জন্য সরকারের প্রয়োজন অতিরিক্ত রাজস্ব এই অতিরিক্ত আয় করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি পোষাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

জনস্বাস্থ্য গোল্লায় যাক!

প্রতি বছর তামাকজাত দ্রব্যের ওপর করারোপে সরকারের সিদ্ধান্ত দেখে মনে হয় তারা “জনস্বাস্থ্য গোল্লায় যাক, তামাক কোম্পানি বেঁচে থাক” নীতিতে বিশ্বাসী। তামাক ব্যবহার বিভিন্ন রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি তৈরির একটি প্রধান কারণ তা আমরা সবাই জানি।  

গবেষণায় দেখাযায় বাংলাদেশে প্রায় ৩৫% প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। দেশে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ তামাক ব্যবহার। ২০১৮ সালে তামাক ব্যবহারজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রায় ১,২৬,০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ২০১৭-১৮ সালে তামাক ব্যবহারজনিত রোগের কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং চিকিৎসাজনিত ব্যায় মিলিয়ে মোট অর্থনৈতিক ব্যায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, একই সময়ে তামাক খাত থেকে প্রাপ্ত মোট রাজস্বের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।

বর্তমান অবস্থা চলতে  থাকলে ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহারকারী ও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার ৪ কোটি ১০ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নজিরবিহীন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে। এমন সব সতর্কতা উপেক্ষা করে সরকার তামাক কোম্পানিকে বাঁচিয়ে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। অন্তত এই বাজেট তাই বলে।

আমরা কোনটা বিশ্বাস করবো?

Trajectory Needed

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং সে লক্ষ্য অর্জনে একটি শক্তিশালী তামাক শুল্ক-নীতি গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পদক্ষেপ হিসাবে জাতির কাছে দেয়া তাঁর অঙ্গীকারও বটে।

২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তামাকের ব্যবহার প্রতি বছর গড়ে ১.৫% হারে কমাতে হবে। এই সম্ভাবনা বাড়বে যদি আরো আগেই তামাক ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপকহারে কমিয়ে আনা যায়। এই উদ্দেশ্য পূরণে ২০২১ সালের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রবণতা ২৮.৪% নামিয়ে আনতে হবে। এই লক্ষ্য বিবেচনা করেই এবারের তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও করারোপর সুপারিশ করা হয়েছিলো।


তাছাড়া সরকাএ প্রতিশ্রুত শুল্কনীতি প্রণয়নের কোন লক্ষনও দেখা যাচ্ছে না। তামাক কর বিষয়ে সার্বিক সুরাহার জন্য ‘জাতীয় তামাক কর নীতি’ গ্রহণ অতি আবস্যক হয়ে দেখা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তামাকজাত দ্রব্যের ওপর করারোপে সরকারের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করলে আমরা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। প্রশ্ন জাগে, আসলেই কী সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায় নাকি এটা কথার কথা? 

হামিদুল হিল্লোল, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি)

ham.hillol@gmail.com